যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা স্মারক সইয়ের মাত্র কয়েকদিনের মাথায় আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্য। যুক্তরাষ্ট্রের সামপ্রতিক হামলার জবাবে কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত আটটি মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইরান। এদিকে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, প্রয়োজনে সামরিক অভিযান সম্পন্ন করা হবে এবং সে পরিস্থিতি তৈরি হলে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের আর অস্তিত্ব থাকবে না’। ফলে নতুন করে বড় ধরনের আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গতকাল রোববার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সামপ্রতিক হামলার জবাবে কুয়েতের আলি আল–সালেম বিমানঘাঁটি এবং বাহরাইনের সালমান বন্দরে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম বহরের ঘাঁটিসহ মোট আটটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অভিযান চালানো হয়েছে। আইআরজিসির দাবি, হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনের বিধ্বংসী জবাব দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের তথ্য অস্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য, কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন স্থাপনাগুলোতে হামলা হয়েছে, তবে প্রাথমিকভাবে কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি এবং উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির তথ্যও পাওয়া যায়নি। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই কুয়েত ও বাহরাইনে হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার পর কুয়েতের সেনাবাহিনী জানায়, তারা শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। অন্যদিকে বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশজুড়ে আকাশ হামলার সতর্ক সংকেত হিসেবে সাইরেন বাজানোর কথা নিশ্চিত করে।
এর আগে গত শনিবার মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, তারা আবারও ইরানের উপকূলীয় এলাকায় হামলা চালিয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) ভাষ্য অনুযায়ী, পানামার পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক ট্যাংকার হরমুজ প্রণালিতে ইরানি ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার পর এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। সেন্টকম এক বিবৃতিতে জানায়, ইরানের সামরিক নজরদারি ব্যবস্থা, যোগাযোগ অবকাঠামো, বিমান প্রতিরক্ষা স্থাপনা, ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং নৌ–মাইন স্থাপনের সক্ষমতাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানকে যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে সম্মান জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা তা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের আগ্রাসনের সরাসরি জবাব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবি জানায়, দক্ষিণাঞ্চলীয় সিরিক এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। আইআরজিসি দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলা যুদ্ধবিরতি চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এর ফলে চলমান সব ধরনের কূটনৈতিক প্রক্রিয়া স্থগিত থাকবে। আইআরজিসি আরও সতর্ক করে বলেছে, আগামী দিনগুলোতে পশ্চিম এশিয়াজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো ‘নারকীয় অভিজ্ঞতার’ মুখোমুখি হতে পারে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ইরানকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। গত শনিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, খুব সম্ভবত তারা (ইরান) কখনোই শিক্ষা নেবে না। তিনি আরও লেখেন, এমন এক সময় আসতে পারে, যখন আমরা আর যুক্তিসঙ্গত আচরণ করতে সক্ষম হব না এবং অত্যন্ত সফলভাবে শুরু করা কাজটি সামরিকভাবে সম্পন্ন করতে বাধ্য হব। যদি তা ঘটে, তবে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের আর কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় আইআরজিসি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘প্রতিশ্রুতি ও চুক্তিভঙ্গকারী পক্ষ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছে, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও চুক্তি লঙ্ঘন করা এই শত্রুপক্ষের সহজাত বৈশিষ্ট্য।
গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফা অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও সামপ্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলা এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি নিয়ে সামপ্রতিক উত্তেজনা আন্তর্জাতিক উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ইরানের দাবি, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারবে না। এ অবস্থানকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, আগামী ৩০ দিন হরমুজ প্রণালি ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ইরাক সফরকালে তিনি বলেন, সব বাধা দূর হওয়ার পরই হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়া হবে। এ বিষয়ে কাজ চলছে। তিনি আরও বলেন, এই দায়িত্ব ইরানের। হরমুজের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় অন্য কোনো দেশ বা পক্ষের ভূমিকা নেই। কোনো একতরফা পদক্ষেপ কিংবা বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে এবং প্রণালি পুরোপুরি খুলে দিতে বিলম্ব ঘটাতে পারে। একইসঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানান আরাঘচি। তবে তিনি স্পষ্ট করে দেন, এ কাঠামোতে বাইরের কোনো শক্তির হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য হবে না।










