পাহাড় বন আর সবুজে ঘেরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ক্যাম্পাস। পাখির কিচিরমিচির আর বন্যপ্রাণীর হাঁকডাকে মুখরিত থাকে এ ক্যাম্পাস। সবমিলিয়ে জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ দেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় বলা যায় এটাকে। করোনায় দীর্ঘদিন ক্যাম্পাস বন্ধ থাকায় সেই জীববৈচিত্র্যে এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। দেখা মিলছে বন্য শুকর, সজারু, বনমোরগ, বানর, মায়াহরিণ সাপসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী। করোনা যেন তাদের স্বস্তির নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। ক্যাম্পাসের সড়ক আর লোকালয়গুলো পরিণত হয়েছে অভয়ারণ্যে। যান্ত্রিকতা প্রাণীকুলের জন্য কতটা হুমকি কিংবা ক্ষতিকর সেটা করোনা বুঝিয়ে দিয়েছে।
আজ বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবস। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ১৯৯৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সভায় ২৯ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিক জৈববৈচিত্র্য দিবস হিসেবে ঘোষনা করা হয়। বিধান অনুযায়ী ৩০টি দেশ কর্তৃক তা অনুমোদিত হওয়ার পর ১৯৯৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর তা কার্যকর হয়। বাংলাদেশ অনুমোদনকারী দেশসমূহের একটি। এরপর থেকে প্রতিবছর এ দিনে বাংলাদেশে দিবসটি পালন হয়ে আসছে। তবে বিভিন্ন জায়গায় ২২ মে জীববৈচিত্র্য দিবস পালন করা হয়ে থাকে।
বন্ধ ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের পদচারণা না থাকলেও শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই এখানে অবস্থান করছেন। এছাড়া স্থানীয়দের বনেবাঁদাড়ে বিচরণ তো আছেই। ফলে বন্যপ্রাণীদের এমন আনাগোনা তারা স্বচক্ষে অবলোকন করেছেন। সাথে অবাক হচ্ছেন। তাদের মতে এমন অনেক প্রানী আছে যেগুলো চবি ক্যাম্পাসে গত দশ বছরেও দেখা মিলেনি। দেখা মিললেও সেটা গভীর অরণ্যে। লোকালয়ে তাদের এমন নেমে আসাকে অনেকটা অস্বাভাবিক বলেই মনে করছেন তারা। স্থানীয়দের মতে, গত প্রায় দশ বছর চবি ক্যাম্পাসে সচরাচর বানরের দেখা মেলেনি। সজারুও খুব কম দেখা গেছে। শুকরের দেখা মিললেও গভীর রাতে। কিন্তু এখন দিনের বেলাও অবলীলায় ঘুরছে শুকর। মায়াহরিণ, শিয়াল আর বনমোরগ তো আছেই।
অনেকে আবার বিস্ময় প্রকাশ করে অনুভূতি জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে পোস্ট করছেন। এমনই গত ৭ ডিসেম্বর আরফান আরিফ নামে একজন জীববিজ্ঞান অনুষদ সংলগ্ন বনমোরগের উড়াউড়ির একটি ছবি দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘প্রকৃতির সান্নিধ্যে চবিয়ানদের যেতে হয় না, ২১০০ একরের প্রকৃতির মাঝেই আমাদের বসবাস।’ রাজিব সাকিল নামে একজন একটি বানরের লাফালাফির ছবি দিয়ে লিখেছেন, ‘অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, আজকে সকালে শহীদ আব্দুর রব হলের ছাদে বানর দেখা গেছে। খুব সম্ভবত সে ভিতরেই কোথাও থাকে কিংবা পিছনের জঙ্গল থেকে আসছে।’ বানর খাবার খাচ্ছে এমন কয়েকটি ছবি দিয়ে ইকরাম তাওহিদ তোহা নামে একজন লিখেছেন, ‘কাঁটাপাহাড়ে বানরের দেখা’। সজারুর ছবি দিয়ে একজন পোস্ট করেছেন, চবি ক্যাম্পাস এখন বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সচরাচর দেখা মিলছে সজারুর।
করোনা তাদের জন্য আশির্বাদ করেছে বলে মনে করছেন প্রাণিবিদ ও পরিবেশবিদরা। তাঁদের মতে প্রাণিকুল সব সময় অবাধ বিচরণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। করোনা সেই সুযোগটাই করে দিয়েছে। পাশাপাশি এ জীববৈচিত্র্যে এ পরিবেশ ধরে রাখতে নানা পদক্ষেপের কথাও জানান তাঁরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আতিকুর রহমান বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় বন্যপ্রাণীর জন্য একটি উপযুক্ত পরিবেশ। এখানে মানুষের হস্তক্ষেপ যত কম থাকবে প্রাকৃতিক পরিবেশ তত বেশি সুরক্ষিত থাকবে। মানুষের যে দখলদারি মনোভাব সেটা যদি কম থাকে তাহলে প্রাণীকুল আমাদের সহাবস্থানে থাকবে। সাথে তাদের চলাচল, খাদ্যগ্রহণ এবং প্রজনন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক মাত্রায় থাকবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দিবসসমূহে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে এ ব্যাপারে সচেতনতা বাড়ানো যাবে বলেও মনে করেন তিনি। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, ‘আমি নিজেও ক্যাম্পাসে থাকি। পাখির কিচিরমিচির আর বনমোরগের ডাকে আমার ঘুম ভাঙে। এ পরিবেশটা ধরে রাখতে হলে আমাদের কিছু জাগয়া প্রাণীকুলের জন্য অভয়ারণ্য ঘোষণা করতে হবে। সেসব জায়গাগুলোতে মানুষের চলাচল সীমিতকরণ করতে হবে। এছাড়া বন উজাড় এবং বৃক্ষনিধন রোধ করতে হবে।’
করোনার কারণে মানুষের অবাধ পদচারণা এবং পাহাড়ে বিচরণ কমেছে। যার কারণে প্রাণীদের মধ্যে স্বস্তি এসেছে। এ পরিবেশ বিদ্যমান রাখতে মানুষের সচেতনতার বিকল্প নেই বলে মনে করেন চবি প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ড. ফরিদ আহসান। তিনি আজাদীকে বলেন, মানুষের উপস্থিতি কম হওয়ায় প্রাণীরা তাদের নিরাপদ মনে করছে। এজন্য লোকালয়ে নেমে আসছে। আমাদের জীববৈচিত্র্যে এমন অবস্থা বিরাজমান রাখতে মানুষকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হবে। তিনি বলেন, আমরা অনেক সময় আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করি, এতেও প্রাণীরা বিরক্ত হয়। আর শীত মৌসুমের পর পাহাড়ে শুকনো পাতাগুলো ঝরে পড়ে। এ পাতাগুলো স্থানীয়রা ঝাড়ু দিয়ে নিচে নামিয়ে আনে। এরপর এগুলো বস্তায় ভরে ছোট ছোট ঝোপঝাড়গুলো কেটে বস্তার মুখে দেয়। এতে প্রাণীর অনেক ক্ষতি হয়। এটা বন্ধ করতে হবে।












