কবি সুবোধ সরকারের সান্নিধ্যে কিছুক্ষণ

ডেইজী মউদুদধ | শুক্রবার , ১৩ অক্টোবর, ২০২৩ at ৬:৩৭ পূর্বাহ্ণ

এক কনস্টেবলের চিঠি, একটি কুকুরের বায়োডাটা, রামবাবু, একজন টেররিস্টের চিঠি, রজনীগন্ধা কফিন, চোখের জল, আমি ফিরোজা , একটি ভারতীয় মেয়ে, শাড়ি, ঘুষ ও কাল্লুর মতো কবিতা লিখে যিনি একজন আপাদমস্তক কবি, তাঁকে সেদিন পেয়ে যাই কত না সহজেই। তিনি আর কেউ নন পশ্চিমবঙ্গের কবি সুবোধ সরকার। চট্টগ্রামে এসেছিলেন একটি আবৃত্তি সংগঠনের আমন্ত্রণে অতিথি হয়ে। নগরীর শিল্পকলা একাডেমিতে তিনদিনব্যাপী আবৃত্তি উৎসবের উদ্বোধনের পরের দিন তিনি দৈনিক আজাদী সম্পাদক একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক এম এ মালেকের আমন্ত্রণে তাঁর কোলাহলস্থ বাসভবনে আসেন। আমি সেসময় সেখানেই ছিলাম। যখনই শুনেছি অতিথি কবির আগমনবার্তা, আর কি বসে থাকা যায় ! আমাকে এই সুযোগ করে দেন, আমার প্রিয় ভাই দৈনিক আজাদীর নির্বাহী সম্পাদক ওয়াহিদ মালেক। উনাদের সুপরিসর বৈঠকখানার লাগোয়া ডাইনিং টেবিলে তিনি তখন আপ্যায়িত হচ্ছিলেন। দেখি টেবিলে আরেকজন চুপ করে বসে আছেন, আমি ঠাহর করতে পারিনি কে উনি, তবে বুঝেছি, তিনি কবিকে সাথে করে নিয়ে এসেছেন। ওয়াহিদ তাঁর স্বভাবসুলভ বিনয়ের সুরে কবিকে বলেন, উনি আমার আপা, সাংবাদিক। আমি বললাম, আমি বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫ তম ব্যাচ, তখনো কিন্তু জিন্নাহ নীরব , ভাবলেশহীন। আর আমি বুঝিইনি সেব্যক্তিই আমাদের জিন্নাহ চৌধুরী, বন্ধু গ্রুপের সদস্য, চবি বাংলা বিভাগের সতীর্থ। এরপরের চিত্র ভিন্ন। আমার মালেক মামা একজন অশিতীপর ব্যক্তিত্ব হয়েও কবিকে যে আন্তরিকতায় সাদরে বরণ করলেন, তা দেখে আমি কেবল বিস্মিত হচ্ছিলাম। কবি সুবোধ সরকারও নিশ্চয়। তিনি গৃহপালিত গরুর খাঁটি দুধ দিয়ে কবিকে চা পান করাবেন। এই চাপর্বের জন্য আবার বৈঠকখানায় বসা এবং সব ঘরে বানানো খাবার দিয়ে আপ্যায়ন পর্ব। কবি তাঁর নিজের হাতের আপ্যায়ন এবং ঘরে বানানো আইটেম দিয়েই রসনা বিলাস করছেন আর কবিতার মতো করেই গল্প বলছিলেন। পাবনায় তাঁর পূর্বপুরুষের বাড়ি দেখার বাসনা প্রকাশ করলেন। এই টেবিলেই কাছে এলেই আমি জিন্নাহকে আবিষ্কার করলাম, একটু অবাকও হলাম। তখন জিন্নাহ বলছিল, আপা আর আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সতীর্থ, তিনি বুঝতে পারছিলেন না, কে বড়, আমি না জিন্নাহ। এরপর অনেক আলাপচারিতা। জিন্নাহ থেকে শুনলাম বিস্তারিত তাঁর আমন্ত্রিত হয়ে আসার সংক্ষিপ্ত কাহিনী। ঘর থেকে বের হয়ে বাগান, সবুজ আর বাহারি ফুলের সমরোহে তিনি মুগ্ধ হচ্ছিলেন। বাগানে ফুটে থাকা চমৎকার সব অর্কিডের ছবি তুললেন। বলেন, এমন নিরিবিলি সুন্দর সবুজ উদ্যান আর পাখালির মেলাতে তো দিনের পর দিন কাটিয়ে দেয়া যায়। কবি বলে কথা। এই বাড়িতে প্রবেশমুখে স্বাগতম কথাটি চাটগাঁইয়া ভাষায় খোদাই করে লেখা “আইয়্যুনযে”রও অর্থ জানতে চাইলেন। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাগান, ফুল, গাছ দেখালেন। বিদায়কালে তিনি আমায় শিল্পকলায় তাঁর অনুষ্ঠান দেখার আমন্ত্রণ জানান।

শিল্পকলায় তাঁকে নিয়ে আলোচকরা মঞ্চে উঠলেন। হবে কবির সাথে কথামালা আর কবিতা পাঠ। চমৎকার অনুষ্ঠান। কবিকে পাশে নিয়ে মধ্যমনি হয়ে বসলেন জিন্নাহ চৌধুরী। মঞ্চে ছিলেন বাংলা একাডেমির পরিচালক শাহাদাত হোসেন নিপু, কবি ও সাংবাদিক ওমর কায়সার, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মালেক মুস্তাকিম, রূপা চক্রবর্তী, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় , ভাগ্যধন বড়ুয়া এবং ওবায়েদ আকাশ। মাথার উপরে উন্মুক্ত খোলা আকাশ, বিশাল মঞ্চে উপবিষ্টদের মাঝে সূর্যের মতো জ্বলজ্বল করছেন কবি সুবোধ সরকার। কথামালার সাথে সাথে কবির সামনে কবির কবিতা পাঠ, আবার সেসব কবিতা নিয়ে আলোচনা, প্রশ্নোত্তর সব মিলিয়ে সুবোধ সরকার আমাদের সামনে ভিন্ন এক আমেজে প্রতিভাত হয়ে উঠেন। আবৃত্তিশিল্পীরা তাঁর কবিতা আবৃত্তি করেন সমস্ত আবেগ উজাড় করে দিয়ে। আলোচকরাও থেমে নেই। কবিতার বিষয়বস্তু আর কবিতায় গল্পের প্রলেপ নিয়েও আলোচনা চলে। তাঁরা বলেন, কবির প্রতিটি কবিতা যেন এক একটা একটা গল্পের মতো। রাজনৈতিক আদর্শ, মানুষের নৈতিক অবক্ষয়, ক্ষয়ে যাওয়া সমাজ ও রাজনীতি, মানবিকতা তাঁর কবিতার পরতেপরতে যেন বিধৃত। তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘কাল্লু’ যখন মিলি চৌধুরী আবৃত্তি করছিলেন, কবি তখন নীরবে চোখের জল মুছছিলেন। আর আমার গায়ে কাটা দিয়ে উঠলো। চোখের সামনে ভেসে উঠলো একজন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী নরপশু কিভাবে তার মানসিক বিকারগ্রস্ত জীবন থেকে বের হয়ে এসে মানবতার ঝাণ্ডা ওড়াতে আসমুদ্রহিমাচল ভেদ করে পালাতে থাকে। এমন শক্তিধর কবিই সুবোধ সরকার। তিনি আলোচকদের কথার উত্তর দেন অত্যন্ত চমৎকার এবং সাবলীল ভাষায়। তিনি চট্টগ্রামের তরুণ প্রজন্মের সংস্কৃতি ও কবিতাঅনুরাগ ও চর্চা দেখে অভিভূত হন। তিনি বলেন, একমাত্র সাংস্কৃতিক জাগরণ, চর্চা ও বিকাশই পারে সমাজ থেকে যাবতীয় অসঙ্গতি, অন্যায়, অনাচার এবং নিপীড়নকে বিতাড়িত করে মানবতার জয়গানে মুখরিত করতে। সুবোধ সরকারের কবিতার দুএকটি পংক্তি দিয়েই লেখার পরিসমাপ্তি ঘটাবো। ‘গোলাপ টোলাপ না, আমার রাইফেল দেখতে খুব ভালো লাগতো/ কি লম্বা, মুখটা ছুঁছলোগুড়ুম গুড়ুম, ভয় লাগত, ভালোও লাগত। (এক কনস্টেবলের চিঠি)

শাড়ি’ কবিতায় লিখছেন:

বিয়েতে একান্নটি শাড়ি পেয়েছিল মেয়েটা

অষ্টমঙ্গলায় ফিরে এসে আরো ছটা

এত শাড়ি এক সঙ্গে সে জীবনে দেখেনি।

আলমারির প্রথম তাকে সে রাখলো সব নীল শাড়িদের

হাল্কা নীল একটাকে জড়িয়ে ধরে বলল, তুই আমার আকাশ

দ্বিতীয় তাকে রাখল সব গোলাপীদের

একটা গোলাপীকে জড়িয়ে ধরে বলল ‘তোর নাম অভিমান’

তৃতীয় তাকে তিনটা ময়ুর যেন তিন দিক থেকে ছুটে আসা সুখ

তেজপতা রং এর শাড়িটার নাম দিল বিষাদ’

শাড়ির গল্প এখানে শেষ নেই । এই কবিতায় মেয়েটির উপহার পাওয়া ৫৭ টি শাড়ির গল্প করুণ আর বিষাদের পরিসমাপ্তিতে পরিণত হয়। মেয়েটি বিধবা হলে শাশুড়ি তাকে সাদা থান পড়িয়ে দিয়েছিল, কিন্তু বর্বর পিশাচরা তার সাদা থানটিও খুলে তাকে বিবস্ত্র করে, ১৯ বছরের মেয়েটি বস্ত্রহীন হয়ে বাঁচাও বাঁচাও করে দৌড়াতে থাকে। কবি তার প্রতিটি কবিতায় সমাজের বীভৎস্য ও অমানবিক চিত্রের প্রতিচ্ছবি নির্মাণ করেন। এই কারণেই তাঁর প্রায় কবিতায় একটি গল্পের প্লট পাঠকের সামনে অত্যন্ত কৌতূহলী ও অনুসন্ধিৎসু হিসাবেই আবির্ভূত হয়। কবিকে শ্রদ্ধা আর শত কুর্ণিশ এই ধরণের অনুষ্ঠানে এসে আমাদেরকে তাঁকে নিবিড় করে জানার সুযোগ করে দেয়ার জন্য।

পূর্ববর্তী নিবন্ধহামাসের হামলার আগেই ইসরায়েলকে সতর্ক করেছিল মিশর
পরবর্তী নিবন্ধনাট্যকার ইয়োন ফসে’র সাহিত্যে নোবেল জয়