ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারি বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি থেকে বিরোধী দল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ। কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখার পর গতকাল মঙ্গলবার রাত প্রায় ৯টার দিকে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি।
একই ঘটনায় কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব, কংগ্রেসের নেতা কে সি বেনুগোপাল, এমপি রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা, সুখজিন্দর সিং রনধাওয়া এবং আরও কয়েকজন বিরোধী নেতাকেও আটক করা হয়।
ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (নিট) বা সর্বভারতীয় মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস এবং ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সমাবেশে পুলিশি হামলার প্রতিবাদে গতকাল দুপুর থেকে দিল্লির লোক কল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে ধর্না ও অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন কংগ্রেস নেতারা। তাদের সঙ্গে সমাজবাদী পার্টির নেতারাও যোগ দেন।
টাইমস অব ইন্ডিয়া ও এনডিটিভির খবরে বলা হয়, এর আগের দিন দিল্লিতে সিজেপির নেতৃত্বে পার্লামেন্ট অভিমুখে পদযাত্রা ও পুলিশি লাঠিচার্জের ঘটনার পর কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ বাড়াতেই এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। কংগ্রেস নেতারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অনির্দিষ্টকালের অবস্থানের ঘোষণা দেন।
বিক্ষোভ চলাকালে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং ঘটনাস্থলে গিয়ে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে কথা বলেন এবং উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত ওই এলাকা থেকে কর্মসূচি প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। তবে কংগ্রেস নেতারা সরে যেতে অস্বীকৃতি জানালে কয়েক ঘণ্টা পর পুলিশ তাদের সরিয়ে দিতে অভিযান শুরু করে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, রাহুল গান্ধী রাস্তায় বসে অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। পরে তিনি মাটিতে শুয়ে পড়লে অন্তত ১০ জন পুলিশ সদস্য তাকে ঘিরে ধরে টেনে–হিঁচড়ে ও প্রায় চ্যাংদোলা করে তুলে একটি পুলিশ বাসে নিয়ে যান। এ সময় তার নাক দিয়ে রক্ত ঝরতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতেও রাহুলের নাক থেকে রক্ত ঝরার দৃশ্য দেখা গেছে। অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যায়, লোকসভার সদস্য প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে নারী পুলিশ সদস্যরা ধাক্কা দিয়ে প্রিজন ভ্যানে তুলছেন। তিনি ভ্যানে উঠতে আপত্তি জানালেও শেষ পর্যন্ত জোর করেই তাকে গাড়িতে তোলা হয়।
দ্য হিন্দু ও ইটিভি ভারত জানায়, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে দিল্লির মন্দির মার্গ থানায়, রাহুল গান্ধীকে মডেল টাউনের ছত্রশাল স্টেডিয়ামে এবং আটক অন্য সাংসদদের কিংসওয়ে ক্যাম্প এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপারসন সোনিয়া গান্ধী মন্দির মার্গ থানায় গিয়ে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। কয়েক ঘণ্টা পর রাত প্রায় ৯টার দিকে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কাসহ আটক নেতাদের ছেড়ে দেয় পুলিশ।
এনডিটিভি জানিয়েছে, পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার আগে রাহুল গান্ধী রাতভর প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচারের দাবিতে সবাই যেন এই আন্দোলনে যোগ দেন।
এর আগের দিন গত সোমবার দিল্লিতে সিজেপির কর্মসূচিতে পুলিশি লাঠিচার্জ ও ধরপাকড়ের সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এঙে রাহুল গান্ধী লিখেছিলেন, ছাত্রছাত্রীদের ওপর আক্রমণ মানে প্রত্যেক ভারতীয় পরিবারের ওপর আক্রমণ। প্রধানমন্ত্রী মোদী মনে করেন তিনি কোনো জবাব বা পরিণাম ছাড়াই পার পেয়ে যাবেন–তিনি পারবেন না। এবার আর নয়। আমি প্রত্যেক দেশপ্রেমিক ভারতীয়কে, যারা বিশ্বাস করেন আমাদের শিক্ষার্থীরা ন্যায়বিচার পাওয়ার যোগ্য, তাদের অনুরোধ করছি–প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে আমাদের সঙ্গে এই ধর্মঘটে যোগ দিন। ভারতের ছাত্রছাত্রীদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করা যাবে না।
আটকের পর পুলিশ ভ্যানের ভেতর থেকেই কংগ্রেস নেতা রণদীপ সিং সুরজেওয়ালা সাংবাদিকদের বলেন, এটাই শেষ নয়; এটি রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে এক নতুন বিপ্লবের সূচনা। তারা আমাদের কারাবন্দি করতে পারে, লাঠিচার্জ করতে পারে বা দুর্ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে যারা তাদের ভবিষ্যৎ হারিয়েছে এবং পরিবারের আশা নিভে যেতে দেখেছে, ভারতের সেই লাখ লাখ সন্তানের কাছে মোদীকে জবাবদিহি করতে হবে।
কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমার বলেন, এটা দুর্ভাগ্যজনক যে রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে আটক করা হয়েছে। আমরা সবাই এই দেশের শিক্ষার্থীদের স্বার্থে লড়ছি। আমরা ন্যায়বিচার চাই। আমরা চাই বিষয়টি সংসদে আলোচনা হোক। এখানে ১০০ জনেরও বেশি এমপি আছেন। গ্রেপ্তার হওয়ার ভয় কারও নেই। ন্যায়বিচার না পাওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে।
গতকাল মঙ্গলবারের কর্মসূচিতে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব, কে সি বেনুগোপাল, কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমারসহ বিভিন্ন রাজ্যের কংগ্রেস ও বিরোধী জোটের নেতারা অংশ নেন। ঘটনার পর কংগ্রেস এঙে রাহুল গান্ধীর রক্তাক্ত নাকের ছবি এবং তাকে টেনে–হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করে। অন্যদিকে দিল্লি পুলিশ এ ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি।












