এসিড দগ্ধের যন্ত্রণায় দুই যুগ বেঁচে থাকা

অবশেষে অভিযুক্ত বন্ধু গ্রেপ্তার

আজাদী প্রতিবেদন | রবিবার , ২ অক্টোবর, ২০২২ at ৬:০৯ পূর্বাহ্ণ

দীর্ঘ ২৪ বছর পর এসিডদগ্ধ হাফেজ মোহাম্মদ জাকারিয়ার শরীরের যন্ত্রণা কিছুটা হলেও লাঘব হবে। তাছাড়া তার বেঁচে যাওয়াটাই একটা মিরাকল। ১৯৯৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বন্ধু কামাল ঈর্ষান্বিত হয়ে তার শরীর এসিডে ঝলসে দিয়েছিল। যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা জাকারিয়ার মৃত্যু নিশ্চিত করতে গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল কামাল। এর পর থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করে নিজেকে আত্মগোপনে রাখে। তবে শেষ রক্ষা হয়নি, ২৪ বছর পর ধরা পড়তে হয়েছে র‌্যাবের হাতে। গত শুক্রবার চাঁদপুর জেলার শাহরাস্থি থানাধীন মেহের স্টেশন রোড এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার কামাল হোসেন প্রকাশ বালু কামাল শান্ত চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ থানার কাউনিয়া এলাকার রসুল করিমের ছেলে।
র‌্যাব-৭, চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ ইউসুফ বলেন, মোহাম্মদ জাকারিয়া কোরআনে হাফেজ ছিলেন। তিনি পড়ালেখার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষায় প্রশিক্ষিত হতে চেয়েছিলেন। এ লক্ষ্যে তিনি দূর সম্পর্কের আত্মীয় মো. রফিকের আগ্রাবাদ কমার্স কলেজের বিপরীত পাশে অবস্থিত দি মেট্রো রেফ্রিজারেশন নামক দোকানে ফ্রিজ মেরামতের কাজ শুরু করেন। ওই দোকান রফিক ও তার বন্ধু শাহজাহানের (আসামি কামালের বড় ভাই) অংশীদারীত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত হত। রফিকের ছেলেমেয়েদের আরবি পড়াতেন জাকারিয়া। পাশাপাশি এলাকার অনেক শিশুকে পবিত্র কোরআন ও ধর্মীয় শিক্ষা দিতেন। আসামি মো. কামালও ওই দোকানে কাজ করত। জাকারিয়াকে সবাই পছন্দ ও সম্মান করার বিষয়টি কামালের ভাল লাগতো না। রফিক এক পর্যায়ে দোকান বিক্রির কথা ভাবলে হাফেজ জাকারিয়া দোকান ক্রয়ের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন। এজন্য কামাল জাকারিয়ার সঙ্গে প্রায়ই তর্ক-বিতর্ক ও ঝগড়া করতো।
র‌্যাব অধিনায়ক বলেন, ১৯৯৮ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর মালিকের অবর্তমানে জাকারিয়া এবং কামাল দোকান খুলে কিছুক্ষণ কাজ করে। এক সময় উভয়ের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক ও ঝগড়া হয়। ঝগড়ার এক পর্যায়ে কামাল দোকান থেকে বের হয়ে যায়। পরদিন হরতাল থাকায় দোকান বন্ধ ছিল। এদিন কামাল জাকারিয়াকে জরুরি কথা আছে বলে দোকানে আসতে বলে। সকাল ৯টায় জাকারিয়া দোকানে এলে কামাল মগে করে এসিড নিয়ে এসে জাকারিয়াকে বলে, ‘তোর জন্য চা এনেছি, খা’। কিন্তু জাকারিয়া খেতে না চাইলে কামাল ক্ষিপ্ত হয়ে মগ ভর্তি এসিড জাকারিয়ার মুখে নিক্ষেপ করে। এতে জাকারিয়ার চোখ-মুখ-বুক-হাত ঝলসে যায়। তীব্র যন্ত্রণায় জাকারিয়া চিৎকার করতে থাকে। এসিড নিক্ষেপের পরও জাকারিয়ার মৃত্যু না হওয়ায় মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য কামাল দিয়াশলাই দিয়ে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং কয়েকটি লাথি দিয়ে পালিয়ে যায়।
এম এ ইউসুফ আরও বলেন, গুরুতর আহত জাকারিয়ার চিৎকারে আশপাশের লোকজন এসে প্রায় মৃত অবস্থায় তাকে দেখতে পেয়ে ডবলমুরিং থানায় সংবাদ দেয়। ডবলমুরিং থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে জাকারিয়াকে মৃত মনে করে থানায় নিয়ে যায়। থানায় ডিউটিরত এক কনস্টেবল হঠাৎ লক্ষ করেন, জাকারিয়ার শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে। পরবর্তীতে ডবলমুরিং থানা পুলিশ গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে যায়। টানা চারদিন সেখানে চিকিৎসা প্রদান করার জ্ঞান ফিরে জাকারিয়ার। কিন্তু চোখ ও শরীর এসিডে ঝলসানোর ভয়াবহতা দেখে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। সেখানে হাফেজ জাকারিয়া সর্বপ্রথম আয়নায় নিজের বীভৎস চেহারা দেখে অজ্ঞান হয়ে যান এবং ৩০ দিন কোমায় ছিলেন। পরবর্তীতে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। এসিডে জাকারিয়ার এক চোখ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর মোটামুটি সুস্থ হওয়ার পর তিনি সৌদি আরব চলে যান।
এ ঘটনায় তার বাবা মোহাম্মদ ইউনুস মিয়া বাদী হয়ে ঘটনার পরদিন ১৯৯৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ডবলমুরিং থানায় মামলা দায়ের করেন। ঘটনার পর থেকে থানা পুলিশ পলাতক আসামি কামালকে গ্রেপ্তারের জন্য অনেকবার অভিযান পরিচালনা করলেও ধূর্ত কামালকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০০৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়। গত ২৪ এপ্রিল চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালত আসামি মো. কামালকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ১ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ২ বছর কারাদণ্ড প্রদান করেন।
র‌্যাব-৭ মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ওয়ারেন্টভুক্ত পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তার করার লক্ষে গোয়েন্দা কার্যক্রম অব্যাহত রাখে। আসামি কামাল হোসেন চাঁদপুর জেলার শাহরাস্থী থানাধীন মেহের স্টেশন রোড এলাকায় অবস্থান করার খবর পেয়ে গত ৩০ সেপ্টেম্বর পৌনে ৩টার দিকে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে ঘটনার দায় স্বীকার করেছে।
গ্রেপ্তারের পর কামাল জানিয়েছে, কিছুদিন পলাতক থাকার পর একসময় নিজ এলাকা চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ চলে যায়। পরবর্তীতে সেখানে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। সেখানে ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত স্টুডিওর কর্মচারী হিসেবে ছবি উঠানো, বিয়ে বাড়ির প্যাকেজিং অনুষ্ঠানের কাজ করতো। ২০০১ সাল থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত সে নিজ ও অন্য এলাকায় গোপনে কৃষিকাজ করেছে। ২০০৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ থানায় দায়েরকৃত ডাকাতির মামলায় কারাগারে ছিল। ২০০৭ সালে মুক্তি পাওয়ার পর ঢাকার যাত্রাবাড়ির কাঁচামালের আড়তে সবজির ব্যবসা শুরু করে। ২০১০-২০১১ সালে সে পুনরায় ডাকাতির প্রস্তুতির দায়েরকৃত মামলায় কারাবাস করে। ২০১১-২০১৩ সালে মুক্তি পেয়ে বিভিন্ন এলাকায় ছদ্মবেশে কৃষিকাজ করছিল। ২০১৩ সালে এলাকা ছেড়ে শাহারাস্থিতে এসে জমি কিনে বালুর ব্যবসা শুরু করে।
আসামির বিরুদ্ধে লক্ষ্মীপুর জেলার রায়গঞ্জ থানায় ১টি এবং চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ থানায় ৬টি চুরি, ডাকাতি, নাশকতা এবং মাদক সংক্রান্ত মামলা এবং নগরীর ডবলমুরিং থানায় ১টি এসিড নিক্ষেপ সংক্রান্ত মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তার আসামিকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছেন র‌্যাব কর্মকর্তা। হাফেজ মো. জাকারিয়া বর্তমানে সৌদি আরবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি বিবাহিত এবং তার ২ সন্তান রয়েছে। এসিডে ঝলসে যাওয়ার পর থেকে এখনও তিনি অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করছেন। দীর্ঘ ২৪ বছর পর পলাতক আসামি কামাল হোসেন প্রকাশ বালু কামাল গ্রেপ্তার হওয়ায় তিনি ও তার পরিবার র‌্যাবের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপাগলা মসজিদের দানবক্সে তিন কোটি ৯০ লাখ টাকা
পরবর্তী নিবন্ধপাহাড় থেকে ছড়ায় লাফ, এরপর করুণ পরিণতি