ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা শুরু করার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই চরম উত্তেজনা প্রশমনে ইন্দোনেশিয়া মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিলেও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে এ নিয়ে মতভেদ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। খবর বিডিনিউজের।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র দিমিত্রি মেদভেদেভ ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কড়া সমালোচনা করেছেন। এই সামরিক অভিযানকে আড়াল করার কৌশল হিসেবে ওয়াশিংটন পরমাণু আলোচনাকে ব্যবহার করেছে বলেও অভিযোগ তার। আর মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে চীন অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, ইরানের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভৌগলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। উত্তেজনা আর যেন না বাড়ে এবং আবার সংলাপ শুরুর করার জন্য সকল পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফর দার লিয়েন ও ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা বলেছেন, ইরানে যা ঘটছে তা ‘খুবই উদ্বেগজনক’। আমরা সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন, বেসামরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত ও আন্তর্জাতিক আইন পুরোপুরি মেনে চলার আহ্বান জানাচ্ছি।
বিপজ্জনক উত্তেজনার হুঁশিয়ারি ম্যাক্রোঁর : ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এক বিবৃতিতে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যে এই যুদ্ধ ‘আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার ওপর গুরুতর প্রভাব’ ফেলবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘বর্তমান এই পরিস্থিতির অবনতি সবার জন্যই বিপজ্জনক। এটি অবশ্যই থামাতে হবে।’
ম্যাক্রোঁ আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যে ফ্রান্সের নাগরিক ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া কোনো ঘনিষ্ঠ অংশীদার অনুরোধ জানালে তাদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সম্পদ মোতায়েন করতে ফ্রান্স প্রস্তুত রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মধ্যস্থতায় প্রস্তুত ইন্দোনেশিয়া : ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সংলাপ সহজতর করতে প্রেসিডেন্ট প্রাবোবো সুবিয়ান্তো প্রস্তুত রয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স–এ এক পোস্টে মন্ত্রণালয় জানায়, দুই পক্ষ সম্মত হলে প্রেসিডেন্ট প্রাবোবো নিজে তেহরান ভ্রমণেও আগ্রহী। ইন্দোনেশিয়া গভীর খেদ প্রকাশ করে বলেছে, আলোচনার ব্যর্থতার কারণেই এই সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে যা বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
বিভক্ত বিশ্বনেতারা : ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা নিয়ে বিভিন্ন দেশ তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে।
অস্ট্রেলিয়া : প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ মার্কিন পদক্ষেপের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বিশ্বশান্তির জন্য দীর্ঘদিন ধরে হুমকি হয়ে আছে। তিনি বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ সমর্থনযোগ্য।
নরওয়ে : দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসপেন বার্থ এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, আত্মরক্ষামূলক বা ‘প্রিভেন্টিভ স্ট্রাইক’ পরিচালনার জন্য তাৎক্ষণিক ও অকাট্য হুমকির প্রমাণ প্রয়োজন, যা এখানে স্পষ্ট নয়।
পাকিস্তান : পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার ইরানের ওপর এই ‘অন্যায়’ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি অবিলম্বে উত্তেজনা প্রশমন করে ফের কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানান।
বেলজিয়াম : দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাঙ্মি প্রিভোট আক্ষেপ করে বলেছেন, সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাসুল যেন সাধারণ ইরানি জনগণকে দিতে না হয়।
জার্মানি : বার্লিন জানিয়েছে, হামলার বিষয়ে তাদের আগে থেকেই অবহিত করা হয়েছিল। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় জার্মানির ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট টিম বৈঠকে বসছে। একইসঙ্গে ইরানে থাকা তাদের নাগরিকদের সরকারি পোর্টালে নাম নিবন্ধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত তার দেশের প্রায় ২১ লাখ শ্রমিকের নিরাপত্তাকে ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় থাকা নাগরিকদের অবস্থান শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। এর আগে শনিবার ভোরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানে ‘বড় ধরনের যুদ্ধ অভিযান’ শুরুর ঘোষণা দেওয়ার পর মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান বাহিনী ইরানের পশ্চিমাঞ্চলে হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও সম্পদগুলোর ওপর পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। পাল্টাপাল্টি এই হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।












