আসকার দিঘিকে রক্ষার জন্য জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিন

| শনিবার , ২০ জুন, ২০২৬ at ৯:৩৬ পূর্বাহ্ণ

নগরে পুকুর দিঘি বা জলাশয় অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পুকুর, দিঘি, খাল, নদীএসব জলাশয় নগরের প্রাণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। জলাশয় না থাকলে নগরের তাপমাত্রা শুধু বৃদ্ধি পায় না, নগরে পানির স্তরও নিচে নেমে যায়। কিন্তু সেই পুকুর ও জলাশয়গুলোকে কিছুতেই রক্ষা করা যাচ্ছে না। তাই জলাশয় রক্ষায় বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধান জরুরি। ব্রিটিশ শাসনামল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, জলাশয় সংরক্ষণ আইনসহ অনেকগুলো আইন কোনো না কোনভাবে জলাশয় দূষণ ও দখল প্রতিরোধ, সংরক্ষণ ও রক্ষা বা এ সম্পর্কিত বিষয় উল্লেখ করেছে। কিন্তু এসব আইন বাস্তবায়নও কোনো একক সংস্থার কাছে না থাকায় আইনের বাস্তবায়ন শিথিলভাবে হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কোন বাস্তবায়নই হচ্ছে না বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তাছাড়া দখল ও দূষণকারীদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণেও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শ আইন বাস্তবায়নে বাধার সম্মুখীন হয়।

গত ১৭ জুন ‘অস্তিত্ব সংকটে আসকার দিঘি’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় দৈনিক আজাদীতে। এতে বলা হয়, নগরীর ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ জলাধারগুলোর অন্যতম আসকার দিঘি দিন দিন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দখল, দূষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দিঘিটির প্রায় পুরো অংশ কচুরিপানা ও জলজ আগাছায় ভরে গেছে। বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ময়লাআবর্জনা ও বর্জ্যের স্তূপ জমে পানির স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে এক সময়ের স্বচ্ছ ও প্রাণবন্ত জলাশয়টি এখন অনেকটাই মৃতপ্রায় রূপ ধারণ করেছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশবিদরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক এই জলাধার ভবিষ্যতে তার পরিবেশগত ও জলাধারগত গুরুত্ব হারাতে পারে। নগরীর জামালখান এলাকায় অবস্থিত আসকার দিঘি কয়েকশ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী একটি জলাশয়। নগরীর জলাধার ব্যবস্থায় এই দিঘির গুরুত্ব অপরিসীম। এই দিঘি নগরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি বৃষ্টির পানি ধারণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। একসময় এই দিঘির স্বচ্ছ পানিতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণীর বিচরণ ছিল। আশপাশের বাসিন্দাদের জন্যও এটি ছিল একটি প্রাকৃতিক উন্মুক্ত পরিবেশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও অবহেলার কারণে দিঘিটির পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হতে শুরু করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, জলাশয় কমে যাওয়ার ফলে একদিকে অল্প বৃষ্টিতে যেমন জলাবদ্ধতার সমস্যা আগের তুলনায় আরো বেড়েছে, তেমনি অনেক এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট তৈরি হচ্ছে, ধীরে ধীরে এই সমস্যা বড় আকার ধারণ করতে শুরু করেছে। জলাশয় ভরাট করে যেসব বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে, সেগুলোও খুব ঝুঁকিপূর্ণ। ধারণা করা হয়, ছয় মাত্রার ভূমিকম্প হলেই এসব ভবন প্রায় সবই ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেক স্থানে অগ্নিকাণ্ডের সময়ে পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সার্বিক বিবেচনায় পুকুর ও দিঘিগুলো ভরাট হয়ে যাওয়া পরিবেশের জন্য অশনি সংকেত। যারা পুকুর, দিঘি ও জলাশয়গুলো ভরাট কিংবা দখল করেছেন ও ভরাট করছেন, তাদের বেশিরভাগই আসলে লোভ ও লালসা থেকেই করছেন। ফলে পুকুর ভরাটের ঘটনাগুলো ঘটে চলেছে বেআইনিভাবে এবং কখনো কখনো যোগসাজশে আইনের ফাঁক গলিয়ে। এসব ক্ষেত্রে আইন রক্ষার দায়িত্ব যে সকল প্রতিষ্ঠানের ওপর সে সকল প্রতিষ্ঠানকেও আমরা যথাযথ দায়িত্ব পালনে দেখছি না। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, প্রকৃতি প্রদত্ত কিংবা মানুষের সৃষ্টি করা বৈশিষ্ট্যসম্বলিত ও পুরনো পুকুর, দিঘি এবং জলাশয়গুলোকেই বেশি নষ্ট করা হচ্ছে, ভরাট ও দখল করা হচ্ছে। ফলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা জরুরি।

গবেষকদের মতে, ‘চট্টগ্রাম শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক সময় একাধিক পুকুর, দিঘি ছিল। পাহাড়ের নাম দিয়ে যেমন এলাকার নাম হয়েছে, তেমনি পুকুরদিঘির নামেও অনেক এলাকাকে চেনা যেত চট্টগ্রামে। এখন সেখানে নাম আছে, কিন্তু পুকুর কিংবা দিঘি নেই। যেমন দেওয়ানজি পুকুরপাড় একটি এলাকার নাম। সেখানে দেওয়ানজিও নেই, তার পুকুরও নেই। রথের পুকুরপাড় এলাকাতে প্রতিবছর অবশ্য রথযাত্রার উৎসব হয়, কিন্তু পুকুর কোথাও হাওয়া হয়ে গেছে। আন্দরকিল্লাহর রাজাপুকুরে রাজা স্নান সারতে আসেন না, কেননা সুউচ্চ ভবনের নিচে সেই পুকুর চাপা পড়ে গেছে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসকার দিঘিকে রক্ষা করার জন্য জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। কচুরিপানা ও ভাসমান বর্জ্য অপসারণ করতে হবে। এ কাজের জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

পূর্ববর্তী নিবন্ধকৌতুক কণিকা
পরবর্তী নিবন্ধ৭৮৬