আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নয়ন জরুরি

নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করতে হবে

| শনিবার , ১৭ জানুয়ারি, ২০২৬ at ৭:২৪ পূর্বাহ্ণ

রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে গত ১৩ জানুয়ারি ‘গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা সংস্কার ও নির্বাচনী ইশতেহার’ শীর্ষক অনুষ্ঠিত সংলাপে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ হয়নি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশিষ্টজনরা। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া এবং পলাতক আসামি গ্রেপ্তার না হওয়া ও প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে আলোচকদের মধ্য থেকে। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বিভাগীয় সংলাপে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সংলাপে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনে টাকার খেলা বন্ধ করতে হবে। নির্বাচনী এবং রাজনৈতিক অন্ধকারের দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরে আসতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিএনপির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, এখন কোনো মবের ঘটনা ঘটলে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দাঁড়িয়ে থেকে ‘তামাশা’ দেখে। আগামী নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৫ শতাংশ আসনে নারী প্রার্থী মনোনয়ন না দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিএনপির সাবেক এ সংসদ সদস্য বলেন, জুলাই সনদে নারীদের আসন নিয়ে আলোচনা হলো। ৫ শতাংশ মনোনয়ন কেন নারীরা পেল না, এই প্রশ্ন কেউ করেনি। তাহলে কোথায়, কোন সংস্কার করলাম। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার বলেন, ‘নির্বাচনের কয়েক দিন বাকি আছে মাত্র। আমি নিজে একজন প্রার্থী। নির্বাচনী আমেজ যেটা বলা যায়, সেটা কিন্তু এখনও তৈরি হয়নি। কারণ জনগণ এখনও প্রশ্ন করে যে, নির্বাচন আসলেই হবে কিনা। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও রাকসুর সাবেক ভিপি রাগিব আহসান মুন্না বলেন, ছাত্ররাজনীতি ধ্বংস করেছেন রাজনীতিবিদরা। তারা নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য ছাত্রদের অপব্যবহার করছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মাহবুবুর রহমান বলেন, শুধু নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়। এর জন্য কতগুলো সংস্কার দরকার, যাতে নতুন বন্দোবস্ত কার্যকর হয়, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হয়ে দেশে নেতা তৈরি হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকার ওপরও জোর দেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জসীম উদ্দিন খান বলেন, আমরা চাই রাজনৈতিক দলগুলো যেন তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়, যাতে দেশে কর্মক্ষম ও দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরি হয়। বন ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়েও দলগুলোর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার থাকা দরকার বলে মনে করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অপতথ্য চিহ্নিত করার জন্য আমরা নির্বাচন কমিশনের দিক থেকে কোনো উদ্যোগ দেখছি না। ভুল তথ্য, অপতথ্য ও মিথ্যা তথ্য চিহ্নিত করা এবং এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের উচিত একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু করার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হলো মব সন্ত্রাস। সরকারের নীরবতা ও দুর্বলতার কারণে মব সংস্কৃতির অবসান ঘটছে না। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে অন্য সমস্যাগুলো হলো কালো টাকার ব্যবহার, প্রার্থীদের হলফনামা যাচাই না করা। এ জন্য নির্বাচনী ব্যয় মনিটরিং কমিটি থাকা দরকার।

সামগ্রিক বিবেচনায় নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি সন্তোষজনক। তবে অভিজ্ঞতা বলে, নির্বাচন কমিশন কতটা প্রস্তুতি নিতে পেরেছে, তার মূল পরীক্ষাটা শুরু হবে কয়েকদিন পর। আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে আচরণবিধি লঙ্ঘন, রাজনৈতিক সহিংসতা, কালো টাকা, ক্ষমতা ও পেশিশক্তির ব্যবহার খুব সাধারণ একটি প্রবণতা। আচরণবিধি মেনে সব প্রার্থীই যাতে প্রচারণার জন্য সমান সুযোগ পান, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। এ ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র শিথিলতা এলে ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠতে পারে, আবার নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিগত সরকারের আমলে পরপর তিনটি অগ্রহণযোগ্য ও বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনআস্থা তলানিতে এসে নেমেছিল। ফলে বর্তমান ইসির সামনে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার ও নিরপেক্ষতা প্রমাণের গুরুদায়িত্ব এসে পড়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ বা আরপিও সংস্কারের মাধ্যমে ইসি আগের চেয়ে অধিকতর ক্ষমতায়িত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। আমরা আশা করি, প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগে ইসি দলমতের ঊর্ধ্বে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবে।

নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরিতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নয়ন। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে জোরালো অভিযান পরিচালনা না করা হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি আশা করা যায় না।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে