প্লাস্টিক, রাবার ও অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের দাপটে অস্তিত্বসংকটে পড়া মীরসরাইয়ের কুমারপাড়াগুলো আবার প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করেছে। শৌখিন ও শিল্পবোধসম্পন্ন মানুষের মধ্যে মাটির পণ্যের নতুন করে চাহিদা তৈরি হওয়ায় সুদিন ফিরছে এই প্রাচীন শিল্পে।
উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নের ছত্তরুয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ভোরের আলো ফুটতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন প্রতিটি পরিবারের সদস্যরা। কেউ মাটি প্রস্তুত করছেন, কেউ তৈরি ২করছেন মাটির খোলা (তাওয়া), খেলনা কিংবা পিঠার ছাঁচ। কেউ আবার রোদে শুকানো মাটির পাত্রে রং–তুলির ছোঁয়ায় দিচ্ছেন বাহারি রূপ। এই গ্রামে পিঠা তৈরির খোলার পাশাপাশি মাটি দিয়ে তৈরি হচ্ছে হাঁস, ঘোড়া, টিয়া, মাছ ও দোয়েল পাখির আকৃতির খেলনা। এছাড়া মাটির ব্যাংক, মগ, গ্লাস, প্লেট ও চায়ের কাপসহ নানা গৃহস্থালি পণ্য তৈরিতেও ব্যস্ততা বেড়েছে মৃৎশিল্পীদের।
ছত্তরুয়া কুমারপাড়ার মনিবালা পাল বলেন, এটা আমাদের বাপ–দাদার পেশা। তাদের দেখাদেখি পেটের তাগিদে আমরাও করছি। তবে যে পরিমাণ খরচ আর পরিশ্রম হয়, তাতে আসলে পোষায় না। মৃৎশিল্পী রাজন পাল জানান, মৃৎশিল্পের মূল উপকরণ এঁটেল মাটি এখন সহজে পাওয়া যায় না। বাইরের জায়গা থেকে মাটি আনতে গেলেও অনেক সময় পুলিশের ঝামেলায় পড়তে হয়। এছাড়া প্লাস্টিকের জিনিসের ভিড়ে মাটির পণ্যের চাহিদা টিকে থাকা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
স্থানীয়দের মতে, একসময় কুমারপাড়ায় মাটির জিনিসের রমরমা বাজার থাকলেও এখন তা শুধুই স্মৃতি। তবু শিকড়ের টান আর পূর্বপুরুষের পেশার প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এই শিল্প আঁকড়ে ধরে আছেন এখানকার মানুষ। আগে বাড়ির নতুন বউরা এই কাজে সহযোগিতা করলেও এখনকার শিক্ষিত প্রজন্ম এসব কষ্টসাধ্য কাজ করতে নারাজ। ফলে বিলুপ্তির পথে হাজার বছরের এই ঐতিহ্য। মূলত প্লাস্টিক, সিরামিক, মেলামাইন ও স্টিলের আধিপত্যে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে মৃৎশিল্প। পয়লা বৈশাখ, ঈদ, পূজা–পার্বণ ও মেলা ঘিরে চাহিদা বাড়লেও বছরের বাকি সময়টা কুমারদের কাটে টানাপোড়েনে।
মৃৎশিল্প সমিতির সভাপতি মৃদুল চন্দ্র পাল বলেন, বাপ–দাদার পেশা কোনোমতে ধরে রেখেছি। আগের মতো চাহিদা ও জৌলুশ নেই। এ শিল্প টিকিয়ে রাখতে একাধিকবার সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার আবেদন করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি। সরকারি অবহেলার কারণে এ পেশায় জড়িতরা মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না।
মীরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোমাইয়া আক্তার বলেন, যোগদানের পর লিখিত কোনো আবেদন পাইনি। আবেদন পেলে এবং আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে মাটির সংকটসহ বিরাজমান সমস্যাগুলো নিরসনের চেষ্টা করব।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প বাঁচাতে সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ, স্বল্প সুদে ঋণ ও আধুনিক যন্ত্রপাতির সহায়তা দিলে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কুমারপাড়ার মৃৎশিল্পীরা।











