সমতলের বৃহত্তম জেলা পরিষদ চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ যার পথচলা শুরু ১৮৮৫ সালে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড, চট্টগ্রাম নামে। গবংংৎং গধহংড়হ ধহফ ঈ. অ. ঝধসঁবষষধং নামক ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টরদ্বয় ১৮৮৫ সালে প্রশাসক হিসেবে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড, চট্টগ্রামের দায়িত্ব পালন করেন। এভাবে প্রশাসকগণ ১৯২০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯২০–২৪ সাল পর্যন্ত জনাব খাঁন বাহাদুর আমান আলী ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড, চট্টগ্রামের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। যার নামে চকবাজার হতে রাহাত্তার পুল পর্যন্ত রাস্তাটির নামকরণ করা হয়। মৌলিক গণতন্ত্র অধ্যাদেশ– ১৯৫৯ এবং স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশ–১৯৭৬ অনুযায়ী জেলা প্রশাসকগণ ১৯৫৯ সাল হতে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত যথাক্রমে ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৫ ডিসেম্বর ২০১১ সালের স্থানীয় সরকার বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনমূলে জনাব মোহাম্মদ আবদুস সালামকে প্রশাসক হিসেবে জেলা পরিষদ, চট্টগ্রামে নিয়োগ প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে তিনি নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে এক মেয়াদ ও প্রশাসক হিসেবে প্রায় ৬ মাসের মত দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে জনাব এ টি এম পেয়ারুল ইসলাম চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে গ্রামীণ জনপদে সড়ক উন্নয়ন, রিটেনিং ওয়াল নির্মাণ, ড্রেন নির্মাণ, মসজিদ, মন্দির, বিহার, কবরস্থান, শ্মশান, ঈদগাহ, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার উন্নয়নে চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ অনন্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। এসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ চট্টগ্রামের মানুষের কাছে খুবই সুপরিচিত।
এসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি জেলা পরিষদ, চট্টগ্রাম দারিদ্রতা নিরসন ও নারী উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় জেলার অসচ্ছল, দরিদ্র ও বেকার নারীদের জন্য বিনামূল্যে তিন মাস মেয়াদী বিভিন্ন ট্রেডে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালনা করে থাকে। জেলা পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয়ের ৪র্থ তলায় একটি ট্রেনিং জোন রয়েছে যেখানে ২০ জন ধারণক্ষমতার একটি কম্পিউটার ল্যাব, সেলাই ও কাটিং এর জন্য ২০ জন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ২ টি কক্ষ, ব্লক ও বাটিক, বুটিকস এন্ড ডিজাইন, এমব্রয়ডারী এবং শো পিস ও জুয়েলারীর জন্য আলাদা আলাদা প্রশিক্ষণের কক্ষ রয়েছে। জেলার যেকোনো স্বল্প শিক্ষিত বা শিক্ষিত দরিদ্র, স্বামী পরিত্যাক্তা, বিধবা, বেকার, অসচ্ছল এবং অসহায় নারীরা এসব কোর্সে আবেদনের মাধ্যমে ভর্তি হতে পারেন। আবেদন ফি বাবদ মাত্র ৫০ টাকা জেলা পরিষদের অনুকূলে জমা প্রদান করতে হয়। আবেদন ফরম জেলা পরিষদের ওয়েব সাইট হতে অথবা জেলা পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয়ের ফ্রন্ট ডেস্কে পাওয়া যায়। প্রতিদিন ৩ ঘণ্টা করে সপ্তাহে ৩ দিন ক্লাস চলে। অধিকাংশ প্রশিক্ষকগণ নারী, সার্বিক নিরাপত্তা এবং পরিবেশ বিবেচনায় বলা যায় জেলা পরিষদের প্রশিক্ষণ জোনটি সম্পূর্ণ নারী বান্ধব। অনেক মা তাদের ছোট বাচ্চাদেরও সাথে করে জেলা পরিষদে নিয়ে আসেন। বাচ্চাদের সময়ও এখানে খুব ভালোভাবে কেটে যায়।
জেলা পরিষদ অফিস ভবনে বর্তমানে অফিস এপ্লিকেশন, গ্রাফিক্স ডিজাইন, সেলাই ও কাটিং, ব্লক ও বাটিক, বুটিকস ও ডিজাইন, এমব্রয়ডারী এবং শো পিস ও জুয়েলারী প্রশিক্ষণ কোর্স চালু রয়েছে। ভবিষ্যতে ড্রাইভিং কোর্সটিও চালু করা হবে। কম্পিউটার কোর্সে পুরুষদেরও ভর্তির সুযোগ রয়েছে তবে তা আলাদা ব্যাচে। এছাড়াও রাউজান উপজেলায় গহিরার শান্তির দ্বীপে সেলাই ও কাটিং এবং এমব্রয়ডারী প্রশিক্ষণ কোর্স চালু রয়েছে। গহিরায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তথ্য প্রযুক্তি ও যোগাযোগ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অফিস এপ্লিকেশন ও গ্রাফিক্স ডিজাইন প্রশিক্ষণ কোর্স চালু রয়েছে। প্রত্যেক উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণের ব্যবস্থাপনায় মোবাইল সার্ভিসিংয়ের উপর ৩ মাস মেয়াদী ১ টি করে কোর্স জেলা পরিষদের অর্থায়নে করানোর সুযোগ রয়েছে। ২০০৯ সাল হতে এ পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ হতে ৪৭৬ টি ব্যাচে মোট ৯৫০৪ জনকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।
তিনমাস মেয়াদী প্রশিক্ষণ সমাপান্তে জেলা পরিষদ কর্তৃক পরীক্ষা নিয়ে প্রশিক্ষণার্থীদের সনদপত্র প্রদান করা হয়। সেলাই ও কাটিং এর প্রশিক্ষণার্থীদের প্রত্যেককে বিনামূল্যে একটি করে ভালো মানের সেলাই মেশিন প্রদান করা হয়। অন্যান্য প্রশিক্ষণ কোর্সের ক্ষেত্রে কোর্সের উপযোগী সরঞ্জামাদী প্রদান করা হয় যাতে প্রশিক্ষণ হতে প্রাপ্ত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে কিছুটা হলেও আয় করা যায়। জেলা পরিষদ বিশ্বাস করে নারীরা তাদের সংসারের কাজের পাশাপাশি সম্মানের সাথে নিজেদের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে কিছু টাকা আয় করতে পারলে পরিবারে যেকোন সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণের অধিকার জন্মাবে। জেলা পরিষদের প্রশিক্ষণ নেয়া অধিকাংশ নারীদের মধ্যে দেখা গেছে তারা তাদের সন্তানদের স্কুলে দিয়েই প্রশিক্ষণ ক্লাশগুলোতে আসে এবং ক্লাশ শেষে তাদের সন্তানদের নিয়ে বাসায় যায়। অর্থাৎ যে সময় তারা অলসভাবে অথবা আড্ডা দিয়ে কাটাতো সে সময়টা তারা নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে জেলা পরিষদের প্রশিক্ষণে ব্যয় করছেন। আর যারা ইতোমধ্যে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন তারা স্কুল গেইটে বসে বসে ছোট খাটো কাজ করে যাচ্ছেন গল্পের ফাঁকে ফাঁকে।
প্রশিক্ষণার্থী বাছাই কমিটির সদস্য হিসেবে আমরা যখন তাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি তখন এক এক নারীর এক এক ধরনের সমস্যা বা জীবন সংগ্রামে এগিয়ে যাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতাগুলোর কথা আমরা শুনতে পাই। কেউ পারিবারিক, কেউ আর্থিক, কেউ স্বামী বা ছেলে সন্তানদের আয় ছাড়াই পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করছেন। এগুলো শুনে সাক্ষাৎকারের দিন মনটা ভারী হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে একজন নারী একাধিক প্রশিক্ষণ কোর্সে ভর্তির আবেদন করতে দেখা যায় যদিও জেলা পরিষদ হতে এটি নিরুৎসাহিত করা হয়। একাধিক কোর্সের বিষয়ে তাদের প্রশ্ন করা হলে তারা প্রায় সময় উত্তর দিয়ে থাকেন তারা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে চান। অনেক কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া অভাবগ্রস্ত মেয়েরাও এখান থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তারা একই সাথে উচ্চ শিক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন, টিউশন করে নিজেদের ও পরিবারের খরচ চালাচ্ছেন আবার দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য জেলা পরিষদ হতে এক বা একাধিক কোর্সে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন। শিক্ষার্থীদের এ দৃঢ়তার জন্য তাদেরকে আমরা ভর্তির জন্য মনোনীতও করে থাকি। আবার এদের ভিতরে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনা ও জীবন সংগ্রামে জয়ী হওয়ায় দৃঢ় প্রত্যয় হৃদয়ে মুগ্ধতা ছড়াই। তাদের অনেকের মধ্যে অনেক ধরনের সৃষ্টিশীলতা প্রত্যক্ষ করা যায়। কোর্স শেষে তারা একটি ক্লাস পার্টি ও পরীক্ষার মাধ্যমে জেলা পরিষদ হতে বিদায় নেয়। স্বল্প সময়ের নোটিশে তারা একটি পিঠা উৎসব অথবা এমনকি একটি প্রদর্শনীরও আয়োজন করতে সক্ষম।
সেলাই ও কাটিং এর প্রশিক্ষণকালে প্রশিক্ষণার্থীদের কমবেশি ১৬ টি আইটেম তৈরীর কাজ শেখানো হয়। যেমন– সেলোয়ার, ফ্রক, কামিজ, ব্লাউজ, প্লাজো, শার্ট, প্যান্ট ইত্যাদি। এদের প্রশিক্ষণ ক্লাশে ঢুকলে সেলাই মেশিনের শব্দকে মনে হয় যেন নারীদের দারিদ্রতা জয়ের জন্য সমোচ্চারিত উচ্চারণ। শো পিস ও জুয়েলারী কোর্সে কমবেশি ৫০ টি আইটেম তৈরীর কাজ শেখানো হয়। যেমন– কাঠ বোর্ডের টিস্যু বক্স, কাঠের গহনা, ফুলের গহনা, পুতির গহনা, এন্টিকের গহনা, হাতে তৈরী ফুলের স্টিক, গ্লাস পেইন্টিং, বেতের ব্যাগ, হাতে তৈরি কুশির হেয়ার ব্যান্ড, নকশি কাঠের আয়না ইত্যাদি। এ কোর্সে বিভিন্ন ধরণের অব্যবহৃত ও ফেলে দেয়া জিনিস থেকে রিসাইক্লিং এর মাধ্যমে বিভিন্ন নান্দনিক ও শৈল্পিক পণ্য উৎপাদন শেখানো হয়। আইসক্রিমের ফেলে দেয়া কাঠি দিয়ে তারা কি চমৎকার করে কলমদানি, ভিজিটিং কার্ডের বক্স তৈরি করে তা দেখলে অবাক লাগে। প্রশিক্ষণকালে তৈরীকৃত এসব পণ্য যখন আমাদের কর্মকর্তাদের নিকট প্রদর্শন করে তখন নিজেদেরই ঈর্ষা লাগে এ ভেবে যে আমরা বা আমাদের পরিবারের সদস্যরা এ ধরনের পণ্য তৈরী করতে পারি না বা নতুন করে এ প্রশিক্ষণে ভর্তি হয়ে এ দক্ষতাটুকু অর্জন করি না কেন? তাদের সৃষ্টির এ দক্ষতা সবার মনে মুগ্ধতা ছড়াতে বাধ্য। তাদের তৈরীকৃত পণ্যগুলো ভালভাবে বাজারজাত করতে পারলে প্রচুর আয় করা সম্ভব হবে।
জেলা পরিষদের এ প্রকল্পের অধীনে প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করা অনেকে আজ নারী উদ্যোক্তা। তারা শুধু তাদের পরিবারে নয়, অনেক ক্ষেত্রে কিছু কিছু অনগ্রসর নারীর কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করেছে। জেলা পরিষদে বর্তমানে শো পিস ও জুয়েলারী কোর্সের একজন প্রশিক্ষক কর্মরত রয়েছেন যিনি জেলা পরিষদ থেকেই প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছিলেন এবং একই সাথে মাস্টার্সও করছেন। বর্তমানে তিনি তার উৎপাদিত শো পিস ও জুয়েলারী পণ্যগুলো অনলাইনে বিক্রি করছেন। তিনি নিজে ‘আহ্লাদের পসরা’ নামক একটি ঋধপবনড়ড়শ চধমব খুলে অনলাইনে ব্যবসা করে যাচ্ছেন। নারীকে নিয়ে বহুল ব্যবহৃত প্রবাদ ‘যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে’। জেলা পরিষদের প্রশিক্ষণে আসা নারীদের মনোবল, দৃঢ়তা, একাগ্রতা, পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস, দৈনিক সম্পাদিত কাজের পরিমাণ, সৃষ্টিশীলতা দেখে এ প্রবাদের সার্থকতার প্রমাণ পাওয়া যায়। অব্যাহত থাকুক নারীর এ অগ্রযাত্রা।
লেখক: নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা পরিষদ, চট্টগ্রাম।












