মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধসহ বৈশ্বিক সংকটে বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ঘুরপথ এবং দূর দেশ থেকে আমদানির অভিঘাত ক্রমে চাপ তৈরি করছে দেশের অর্থনীতিতে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সৃষ্ট অস্থিরতায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল–গ্যাসের দাম বেড়ে গেছে। এতে করে জ্বালানি আমদানিতে ডলারের ব্যয় এক বছরের ব্যবধানে বেড়ে গেছে ৬৫ শতাংশ। মাত্র তিন মাসে জ্বালানি তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানির জন্য ৩৭০ কোটি ডলারের ঋণপত্র (এলসি) খুলতে হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২২৮ কোটি ডলার। আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লেও বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে। এতে সরকারি ভর্তুকির বোঝা বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, টাকার বিনিময়মূল্য, শিল্পোৎপাদন, বিনিয়োগ ও মূল্যস্ফীতি নিয়েও সংশ্লিষ্টদের মাঝে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশের জ্বালানি তেল, এলপিজি ও সিএনজির প্রায় পুরোটাই আমদানি নির্ভর। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে জ্বালানি তেল, গ্যাস আমদানি করে দেশের চাহিদা মেটানো হয়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের আমেরিকা–ইরান যুদ্ধ, ইউক্রেন–রাশিয়া যুদ্ধসহ সৃষ্ট বৈশ্বিক সংকটে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেল–গ্যাসক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আর এর খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জুলাই–সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) অপরিশোধিত তেল আমদানির জন্য প্রায় ৬৩ কোটি ডলারের এলসি খুলেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ২০ কোটি ডলারের কিছু বেশি। এক বছরের ব্যবধানে অপরিশোধিত তেল আমদানির এলসি প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সময়ে অন্যান্য পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য, বিশেষ করে গ্যাস আমদানির জন্য সরকারি–বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর খোলা এলসির পরিমাণ ১১২ কোটি ডলার থেকে বেড়ে ২৪০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। সব মিলিয়ে প্রথম প্রান্তিকে জ্বালানি তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানির এলসি খোলার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৭০ কোটি ডলার। আগের বছর একই সময়ে যা ছিল ২২৮ কোটি ডলার।
একইসাথে আমদানির বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধের পরিমাণও বেড়ে গেছে। জুলাই–সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে জ্বালানি তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানির এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ২৯৩ কোটি ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেশি। ফলে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ এবং লেনদেনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
জ্বালানি আমদানির এই বাড়তি ব্যয় বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একাধিক দিক থেকে ঝুঁকি তৈরি করছে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, আমদানিনির্ভর জ্বালানির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও শিল্পকারখানার পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায়। এর চাপ গিয়ে পড়ে সাধারণ ভোক্তার ওপর। একই সঙ্গে জ্বালানি কেনায় বেশি ডলারের প্রয়োজন হওয়ায় অন্যান্য আমদানি, বৈদেশিক মুদ্রার বাজার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপরও চাপ বাড়ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় চলতি বছরে ১ হাজার ৮০০ কোটি থেকে ২ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। আগে এই ব্যয় ছিল ১ হাজার ২০০ কোটি থেকে ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট, হরমুজ ইস্যুসহ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি লাগাতার হলে ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
বিপিসির দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, চলতি বছরের জুলাই–সেপ্টেম্বর সময়ে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৭ ডলারে উঠেছে। গত বছরের একই সময়ে এই দাম ছিল ৬৯ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে ক্রুডের দাম বেড়েছে ৪০ শতাংশের বেশি। একই সময়ে জাপানে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) গড় দাম প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে (এমএমবিটিইউ) ১১ দশমিক ৭৩ ডলার থেকে বেড়ে ১৪ দশমিক ৪৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য আমদানিকৃত ক্রুড পরিবহনের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) একজন কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশের জন্য ক্রুড অয়েল আনতে হচ্ছে কয়েক হাজার মাইল বাড়তি পথ ঘুরে আফ্রিকার কেপটাউন হয়ে। এতে জাহাজভাড়া এবং সময় অস্বাভাবিক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। খরচ বেড়ে গেছে।
গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহের অনিশ্চয়তা প্রকট হয়েছে। দেশের গ্যাস চাহিদার এক–তৃতীয়াংশের বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারী কাতার এনার্জি ফোর্স মেজর ঘোষণা দিয়ে সরবরাহ বন্ধ রাখার পর স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। কাতার এনার্জি গত মাসের শেষ দিকে বাংলাদেশকে দেওয়া ফোর্স মেজরের নোটিশের মেয়াদ বাড়িয়ে আগামী মাস পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে। তবে আগামী মাসেও কাতার এনার্জি গ্যাস দিতে পারবে কি না তা নিয়ে পেট্রোবাংলার একাধিক কর্মকর্তা সংশয় প্রকাশ করেছেন।
এ অবস্থায় স্পট মার্কেট থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ প্রায় ৩০ ডলারে এলএনজি কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ গ্যাসের দাম ছিল ১০ ডলারের কাছাকাছি। এখন বাংলাদেশকে তিন গুণ বেশি দামে গ্যাস কিনে গ্যাস সেক্টর টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে। এতে সরকারের ব্যয় এবং ভর্তুকি বেড়ে যাচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ পাওয়া না গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার উৎপাদনে সংকট তৈরি হবে, যা দেশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে রপ্তানিসহ সর্বত্র প্রভাব ফেলবে। ফলে সরকারকে উচ্চমূল্যে জ্বালানি কেনার পাশাপাশি সরবরাহের ঘাটতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করতে হচ্ছে।
সূত্র বলেছে, ২০২৫ সালে যত পরিমাণ এলএনজি আমদানি করা হয়েছিল, এ বছরও একই পরিমাণ আমদানি করতে হলে শুধু এলএনজি কেনার পেছনে আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি অর্থ ব্যয় হতে পারে। সরকারের রাজস্ব ও ব্যয়ের ওপর এর প্রভাব পড়বে। ভর্তুকির জন্য অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হলে উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক সুরক্ষা কিংবা অন্য গুরুত্বপূর্ণ খাতের ব্যয় ব্যবস্থাপনায়ও সংকট তৈরি হবে।
তেল আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় গত মাসে সরকার চারটি প্রধান পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। এর প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ে পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তাদের বাড়তি দামে সবকিছু কিনতে হচ্ছে। এতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে।
জ্বালানি ব্যয়ের এই চাপের মধ্যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশে স্থবির থাকতে পারে। প্রতিবেদনে দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট ও ব্যয় বৃদ্ধিকে বেসরকারি বিনিয়োগের পথে বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জ্বালানির উচ্চমূল্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়ায় নতুন বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে।
বিপিসির শীর্ষ একজন কর্মকর্তা জানান, পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে এবং ঘাটতির আশঙ্কা নেই। ডিসেম্বর পর্যন্ত তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম যদি এভাবে দীর্ঘদিন চড়া থাকে তাহলে একই পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করতে অনেক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হবে। এটা দেশের উন্নয়ন এবং অগ্রগতির পথে বাধা হতে পারে।












