৬০ বছরে কবি ও শক্তিমান কথাশিল্পী মহীবুল আজিজ

নিজামুল ইসলাম সরফী | শুক্রবার , ২২ এপ্রিল, ২০২২ at ৬:০৯ পূর্বাহ্ণ

ড. মহীবুল আজিজ, কবি, কথাশিল্পী, অধ্যাপক। তিনি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এক জোতির্ময় ব্যক্তিত্ব। কবি, ছোটগল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য, বিশ্বসাহিত্যের একজন নিবিষ্টচিত্ত পাঠক ও গবেষক তিনি।
১৯ এপ্রিল ৬০তম জন্মবার্ষিকীতে মহীবুল আজিজ স্যারকে জানাচ্ছি শুভেচ্ছা, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, সাবেক সভাপতি ও কলা অনুষদের সাবেক ডিন মহীবুল আজিজ তার জীবনের অভাবনীয় নীরবতায় জন্মদিনকে স্মরণীয় করে রখেন সৃজনের সম্ভারে।
করোনাকালে বিগত জন্মদিনে তিনি সম্পন্ন করেছিলেন অষ্টাদশ কাব্যগ্রন্থের পাণ্ডুলিপি। শিরোনাম ‘লকডাউন ও অন্যান্য কবিতা।’
তাঁর সেই কাব্যগ্রন্থের রোমের ক্যাথিড্রালে একাকি টেনর- কবিতার কিছু অংশ এরকম, যা মূলত একটি সনেট:
হে টেনর, কার জন্যে গান গাও তুমি,
পেট্রিসিয়ান প্লেবিয়ান সকলেই মরে।
ভূমিকম্প ছাড়াই কাঁপে পদতলে ভূমি,
তবু তুমি ছড়াও কণ্ঠ বিশ্বচরাচরে।
লাশ-কাটা ঘরে ভিঞ্চি বেড়াতেন খুঁজে,
মানুষেরা সিয়েস্তায় থাকতো চোখ বুঁজে।
সেই রোম সেই দেশ সবটাই মর্গ আজ,
চর্তুদিকে পরিব্যপ্ত মৃত্যু কারুকাজ।

কলিসিয়াম খাঁ-খাঁ করে মহাশূন্যতায়,
মৃত দর্শকেরা ভিড় জমায় এরেনায়।
যখন সবটাই এক স্তব্ধ মরুভূমি,
গ্ল্যাডিয়েটর হয়ে ফের জন্ম নিলে তুমি।

হ্যাঁ, টেনর নও তুমি, যুদ্ধজয়ী বীর,
অদৃশ্য শত্রুকে ছোঁড়ো মৃত্যুঞ্জয়ী তীর।
যেভাবে ছুঁড়েছে তীর গল ও রোমান,
লড়েছে প্রতাপশালী লক্ষ এট্রুসকান।
তোমার ডানদিকে সারা বিশ্ব, বামে বিধি,
মৃত্যুভয়ে মানুষের ঘুম নেই চোখে।
মৃত্যুর আলোক জ্বলে দ্যুলোকে-ভূলোকে,
মনুষ্যলোকের তুমি দৃপ্ত প্রতিনিধি।

সন্ধ্যা ধীরে নামে রোমে, আলো নিভে আসে,
অমল প্রাণের হাসি মোনালিসা হাসে।
মৃত্যুহাওয়া বয়ে যায় স্তব্ধ উপত্যকায়,
তারই মধ্যে জীবনের গান ভেসে যায়।
লকডাউন ও অন্যান্য কবিতা গ্রন্থের প্রসঙ্গে মহীবুল আজিজ বলেন, ‘এই চলমান সঙ্কুল পরিস্থিতিকে লিপিবদ্ধ করে রাখার প্রয়াস এই কাব্যগ্রন্থ। আমাদের জীবনে ও পৃথিবীর ইতিহাসে যে ঘোরতম বিরূপতা এসে হানা দিয়েছে, তার অভিঘাতেই রচিত হয়েছে কবিতাগুলো, যা সভ্যতার পরিক্রমায় একটি বিশেষ অবস্থাকে চিত্রিত করে।’
‘জন্মদিনেও লিখছি, যেমন আমি সারা জীবনই লেখালেখির মধ্যে যাপন করতে চেয়েছি নিজের মহার্ঘ জীবন’, বলেন মহীবুল আজিজ।’ স্ত্রী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. কাজী শামীম সুলতানা কিছুটা অসুস্থ, একমাত্র সন্তানের দীর্ঘকালীন চিকিৎসা, শুশ্রূষা, শিক্ষার বিষয়গুলো চলমান। কিন্তু চারিদিকে নৈঃশব্দ। যেন কেউ নেই পাশে কোথাও। তবু আমি যাপিত জীবনের সংগ্রাম ও সংক্ষোভে কবিতাকে নিয়ে আছি অন্তর্গত আনন্দে, বলেন তিনি।
১৯৬২ সালে জন্মগ্রহণকারী মহীবুল আজিজ রচনা করেছেন গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, অনুবাদ মিলিয়ে পঞ্চাশাধিক গ্রন্থ। অতিক্রম করেছেন তিন যুগের কাছাকাছি অধ্যাপনা, গবেষণার পেশাজীবন। ভ্রমণ করেছেন বিশ্বের বহুদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল। মিশেছেন বিশ্বজনীন সাহিত্য প্রতিভাসহ নানা ধর্ম, বর্ণ, বিশ্বাসের বর্ণিল মানুষের সঙ্গে।
জন্ম ১৯ এপ্রিল ১৯৬২ সালে নড়াইল, যশোর হলে ও তাঁর স্থায়ী নিবাস: চট্টগ্রাম।
মহীবুল আজিজ আশির অন্যান্য নতুন প্রজন্মের মতই মধ্যবিত্তের অস্তিত্ব সংকট, চেতনালোকের নানাবিধ ক্ষরণ, গ্রামীণ জীবনের অসুস্থ জীবনাচার ও মূল্যবোধের টানাপড়েনকে তাঁর কথাসাহিত্যে সুদক্ষ শিল্পীর কুশলি বিন্যাসে উপস্থাপন করেছেন। কবি হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পেলেও তাঁর গল্পগ্রন্থগুলো বিষয়বৈচিত্র্যে অনন্য। জীবনের প্রতি প্রবল অনুরাগ, মানবিক সম্পর্কের জটিল অন্ধিসন্ধির জালভেদ ও মানব সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা তাঁর গল্পে তীব্র মঙ্গলাকাঙ্ক্ষায় উৎসারিত। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ মহীবুল আজিজের গল্পগ্রন্থের অন্যতম সার্থক প্রাপ্তি। তাঁর গ্রাম উন্নয়ন কমপ্লেক্স ও নবিতুনের ভাগ্যচাঁদ (১৯৮৮), ‘দুগ্ধগঞ্জ (১৯৯৭), মৎস্যপুরাণ (২০০০), ‘আয়নাপড়া’ (২০০৬), ‘বুশম্যানের খোঁজে (২০১২), ‘নীলা মা হতে চেয়েছিল (২০১৪), ‘তপনশীল ও তার বিবাহ-প্রকল্প (২০১৫) প্রভৃতি গল্পগ্রন্থ এবং ২০১৪ সালে প্রকাশিত দুটি উপন্যাস যথাক্রমে- ‘বাড়ব’ এবং ‘যোদ্ধাজোড়’- উক্ত মন্তব্যের সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপনযোগ্য। মহীবুল আজিজ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী সামরিক শাসনের সময়কালে বাংলাদেশের আবহাওয়ায় বেড়ে উঠেছেন। এসময় সাহিত্য জগতে প্রবেশের পর গ্রামীণ এবং নাগরিক জীবনের চিন্তা ও আবেগকে অন্তরে লালন করে নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের জটিলতার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তি মানুষকে অবলোকন করতে চেয়েছেন বিভিন্ন গ্রন্থের গল্পসমূহে। তিনি নাগরিক ও গ্রামীণ জীবনে ব্যক্তি মানুষের অতল গহীনে ডুব দিয়ে তাঁর যন্ত্রণা, কষ্ট, ভয়, হতাশা, সংশয়, সাহসিকতাকে পরিস্ফুট করেছেন অসামান্য আলোকসম্পাতে। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলো একদিকে যেমন নাগরিক রুচি এবং আবেগকে লালন করে তেমনি অপরদিকে নাগরিক সভ্যতার যে নেতিবাচক অবদান- সংশয়, বিচ্ছিন্নতাবোধ, নিঃসঙ্গতা, আত্মানুসন্ধানের আত্মদহন প্রভৃতি মনোজগতের অতল গহ্বরের অন্ধকারের পুঞ্জিভূত উপাদান চরিত্রের মনের মধ্যে থেকে লেখক আবিষ্কার করেছেন বিশ্লেষণমুখী প্রক্রিয়ায়। পুঁজিতন্ত্রের অভিঘাতে যেখানে ব্যক্তির সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো অগ্রাহ্য হয়েছে, অনিকেত সঞ্চারী করে তুলেছে তার দৈনন্দিন জীবন, সেখানে যন্ত্রণাদগ্ধ সেই ব্যক্তির মনস্তত্ত্বের বিবরণ ও বিশ্লেষণ হয়ে উঠেছে প্রধান। নাগরিক সভ্যতাও যে ধর্মীয় আবেষ্টন থেকে ব্যক্তির যন্ত্রণা ও অবচেতনের কামনাকে অগ্রাহ্য করতে চায় এবং এরই ফলে ব্যক্তি মানুষ কীভাবে প্রতিবাদী সত্তায় জাগরিত হয় তারই শিল্পরূপ অধিকাংশ গল্পের গতিচঞ্চল প্রান্ত। অন্যদিকে আবার গ্রামীণ জীবন অবলোকনে তাঁর স্বাতন্ত্রতা চিহ্নিত হয়েছে। তাঁর গল্পে গ্রামীণ জীবন, রাজনীতি ও নাটকীয়তা এবং মুক্তিযুদ্ধের রূপায়ণ সম্পর্কে আমার নেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন- ‘আমার শৈশব গ্রামেই কাটে। ১৯৬৬-তে বাবার চাকরিসূত্রে চলে আসি চট্টগ্রামে। সেই থেকে এখানেই। আমরা থাকতাম চট্টগ্রামের দোহাজারিতে। এমন যে এলাকা, রাতে হাতি যেতো আমাদের ঘর ঘেঁষে। ওখান থেকে কখনও কখনও বাবার সঙ্গে জিপে করে আরও ভেতরে যেতাম বান্দরবানে- পাহাড়, বন-জঙ্গল এসব মিলে মিশে সে এক অবর্ণনীয় শৈশব অভিজ্ঞতা। আমার গল্পে গভীর গ্রাম নেই, যে গ্রামীণতাটুকু এসেছে তা গল্প বা চরিত্রের প্রয়োজনেই। রাজনীতি এবং নাটকীয়তার কথা যদি বলি পৃথিবীর সব সাহিত্যেই এই দুটি উপাদান গুরুত্বপূর্ণ। সেই কতকাল আগেরকার ‘ ডেকামেরন’ কিংবা চসারের কাব্যগুলি দেখুন রাজনীতি এবং নাটক দুই-ই আছে। নাটকীয়তাও আসলে এক ধরনের সামাজিক অবস্থা বা সামাজিক পরিস্থিতি। মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে আমার পুরাণ আমার ইতিহাস। আমার নয় বছর বয়সে বাংলাদেশে এ অসাধারণ ঘটনার সংঘটন। আমার বোধোদয়, চিন্তার বিস্তীর্ণতা, অনুভবের সামাজিকতা সবই আশ্চর্য এক বিদ্যুতে স্পৃষ্ট হয় মুক্তিযুদ্ধের ঘটনায়। পৃথিবীর এত বড় একটি ঘটনার মধ্যে কোনভাবে আমিও ছিলাম এটা ভাবতে পারাটাও বিস্ময়কর। আমার যে চারটি গল্পগ্রন্থ (বর্তমানে ৭টি) হিসেব করলে তার প্রতিটিতেই একটি করে মুক্তিযুদ্ধের গল্প রয়েছে- ‘হোমো স্যাপিয়েন্স’ (গ্রাম উন্নয়ন কমপ্লেক্ষ ও নবিতুনের ভাগ্যচাঁদ), ‘তাড়িখানার বিস্ময়কর বালক ও পশ্চাতকাহিনী’ (দুগ্ধগঞ্জ), ‘মৎস্যপুরাণ’ (মৎস্যপুরাণ), ‘আয়নাপড়া’ (আয়নাপড়া), ‘অনবয়ব’ (বুশম্যানের খোঁজে), ‘বোরখাঅলি সুচিত্রা’ (তপনশীল ও তার বিবাহ-প্রকল্প)। এটা কোন সমাপতনের ফল নয় হয়তো আমার চিন্তা প্রক্রিয়ার বিশেষ একটি অংশ মুক্তিযুদ্ধের জন্যে সংরক্ষিত।’ (অরুন্ধতী, সেপ্টেম্বর ২০১০)
মহীবুল আজিজের পিএইচ ডি গবেষণা বিষয়: বাংলাদেশের উপন্যাসে গ্রামীণ নিম্নবর্গ : ১৯৪৭- ১৯৭১, গবেষণা-নির্দেশক: সমাজবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. অনুপম সেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এর সহযোগী অধ্যাপক মিল্টন বিশ্বাস লিখেছেন- ‘মহীবুল আজিজের কথাসাহিত্যের বিষয় যেমন মুক্তিযুদ্ধ পূর্বকালের জীবন তেমনি আছে যুদ্ধোত্তর সামাজিক সমস্যা, মন্বন্তর, সামরিক শাসন, ক্ষুধা, দারিদ্র্য, দাঙ্গা ইত্যাদি। তিনি অনেক বিষয় নিয়ে গল্প লিখেছেন তবে প্রাধান্য পেয়েছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন। গ্রাম বা শহরের বিষয় অবলম্বন করে গল্পে যাপিত জীবনের সংকট ও সমস্যার আলেখ্যই উন্মোচিত হয়েছে। তাঁর কোনো কোনো গল্পে শ্রেণি সংগ্রামও প্রমূর্ত হয়েছে। মূলত মহীবুল আজিজ নাগরিক জীবনের নানাবিধ সংকটকে ব্যক্তির বহুমাত্রিক চেতনার সংস্পর্শে দৃশ্যমান করতে চেয়েছেন। কিন্তু ব্যক্তি তো শুধু গণ্ডিবদ্ধ পরিবারের সংকটের চূড়ান্তসীমায় ক্ষয়ে গিয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় না। সচেতন শিক্ষিত নাগরিক জীবনযন্ত্রণার মূলে থাকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনাস্রোত। লেখক সযত্নে সেসবের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক কাহিনীর অবয়ব নির্মাণ করেছেন। তবে তিনি শিথিল বিবরণ ও একঘেঁয়েমী কাহিনিসূত্র বর্জন করেছেন। বস্তুত মহীবুল আজিজের কথাসাহিত্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পাশ্চাত্য শিল্প আঙ্গিক জীবন বাস্তবতা রূপায়ণে অনিবার্য প্রভাব ফেলেছে। এজন্য বিশ্লেষণ, মননধর্মিতা, তীক্ষ্ম, ঋজু, নির্মেদ ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে আখ্যান প্রতিমায়। তিনি এখনো গল্প-উপন্যাস লিখে চলেছেন। সাহিত্যচর্চায় তিনি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন এভাবে- ‘আমি সর্বদাই পরিকল্পনার মধ্যেই থাকি।’ তাঁর সেই পরিকল্পনায় আছে নতুন গল্পগ্রন্থ, অপ্রকাশিত কবিতা এবং ৪০টির মতো গান প্রকাশের সম্ভাবনা। তিনি নিজের ভেতর দীর্ঘ সময় ধরে গল্পের প্লট লালন করেন। একটি গল্প ২৮ বছর ধরে লালন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস দুটি ঠিক একইভাবে তিনি লিখেছেন; দীর্ঘ দিনের পরিকল্পনা লালন করে। কবি-কথাসাহিত্যিক মহীবুল আজিজের পরিকল্পনাগুলো নতুন গ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে সার্থকতা অর্জন করবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।