চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) পরিচ্ছন্নকর্মী নিবাস নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বেড়েছে ৭৭ কোটি ৯২ লাখ ৫২ হাজার টাকা। বর্ধিত এ অর্থসহ প্রকল্পটিতে সম্পূর্ণ অর্থায়ন করবে সরকার। গতকাল রোববার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৩০৯ কোটি ৩৫ লাখ ২০ হাজার টাকায় সংশোধিত প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর মাসে। এর আগে ২০১৮ সালে ২৩১ কোটি ৪২ লাখ ৬৮ হাজার টাকায় প্রকল্পটি প্রথম অনুমোদন দেয় একনেক। নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধিসহ চার কারণে প্রকল্পটির কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে পারেনি চসিক। ফলে প্রকল্পটি সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
এদিকে সংশোধিত প্রকল্পে প্রস্তাবিত ৩০৯ কোটি টাকার মধ্যে ২৪৭ কোটি ৪৮ লাখ ১৬ হাজার টাকা সরকার ও ৬১ কোটি ৮৭ লাখ ৪ হাজার টাকা চসিকের নিজস্ব ফান্ড থেকে ব্যয় করার শর্তে গত ৬ জানুয়ারি অনুমোদন দেয় পরিকল্পনা কমিশন। তবে গতকাল একনেক সভায় সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন একনেক চেয়ারপার্সন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে অনুরোধ করেন, প্রকল্পের সম্পূর্ণ অর্থ যেন জিওবি ফান্ড থেকে দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী মেয়রের অনুরোধ রেখে প্রকল্পের সম্পূর্ণ অর্থ জিওবি ফান্ড থেকে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত দেন। এর ফলে চসিকের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আজাদীকে বলেন, অন্যান্য সিটি কর্পোরেশনের তুলনায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব আয় কম। যে পরিমাণ আয় হয় তা দিয়ে কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন–ভাতা, ইউটিলিটি ব্যয় এবং সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করা হয়। তাই প্রকল্পটিতে প্রস্তাবিত নিজস্ব অর্থায়নের পরিবর্তে সম্পূর্ণ জিওবি অর্থায়নে প্রধানমন্ত্রীর সানুগ্রহ অনুমোদনের বিষয়টি বিবেচনার জন্য অনুরোধ করেছি। প্রধানমন্ত্রী আমার অনুরোধ রেখেছেন। তিনি (প্রধানমন্ত্রী) পরিচ্ছন্নকর্মীদের নিবাস নির্মাণের বিষয়টি মানবিক বিবেচনায় সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে সিদ্ধান্ত দেন। মানবিক বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
২০১৮ সালে অনুমোদিত প্রকল্পটি গত ৮ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি। এখন দুই বছরে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব কিনা জানতে চাইলে মেয়র বলেন, আমরা চেষ্টা করব। একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে দুষ্টুমি করে হেসে হেসে বলেছেন, ২০২৭ সালের মধ্যে শেষ করতে না পারলে জরিমানা করব।
কী আছে প্রকল্পে : নগরের পরিচ্ছন্নকর্মীদের জীবনমান উন্নত করার লক্ষ্যে ‘পরিচ্ছন্নকর্মী নিবাস নির্মাণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প গ্রহণ করে চসিক। সংশোধিত প্রকল্পের উন্নয়ন প্রস্তাবনা (আরডিপিপি) অনুযায়ী, প্রকল্পের আওতায় ১৪ তলা বিশিষ্ট ৭টি ভবন নির্মাণ করা হবে। সেখানে পরিচ্ছন্নকর্মীদের জন্য থাকবে ১ হাজার ৩৬টি ফ্ল্যাট। এর মধ্যে বান্ডেল কলোনিতে ৩টি, ফিরিঙ্গিবাজারে ১টি, ঝাউতলায় ২টি এবং সাগরিকায় চসিকের নিজস্ব জায়গায় ১টি ভবন হবে। ভবনগুলোতে বসবাসকারী পরিচ্ছন্নকর্মীদের প্রতিটি পরিবারের জন্য দুটি বেডরুম, একটি রান্নাঘর ও দুটি বাথরুম থাকার কথা।
প্রকল্পের অগ্রগতি কতটুকু : প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই প্রথম অনুমোদন হয়। তখন প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত। পরবর্তীতে তিন দফায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১৩০ কোটি ১২ লাখ টাকা। চলতি ২০২৫–২০২৬ অর্থবছরে এডিপিতে ৪৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বরাদ্দ আছে।
চসিকের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ঝাউতলায় একটি ভবনের ১২ তলা পর্যন্ত হয়েছে। সেখানে অপর একটি ভবনের কাজ শুরু হয়নি। বান্ডেল কলোনির তিনটি ভবনের মধ্যে জায়গার অভাবে একটির কাজ হচ্ছে না। তবে সেটি এখন মাদাড়বাড়ী ওয়ার্ডে করা হবে। বাকি দুটির মধ্যে একটির ৮ তলা এবং অপরটির ১১ তলা পর্যন্ত হয়েছে। ফিরিঙ্গিবাজারে একটির ১০ তলা পর্যন্ত হয়েছে। সাগরিকায় ১৪ তলা পর্যন্ত কাজ শেষ।
যে কারণে সংশোধন : প্রকল্প সংশোধনের কারণ হিসেবে আরডিপিতে কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়। প্রকল্পটির নির্মাণকাজের ব্যয় প্রাক্কলন গণপূর্ত রেট সিডিউল ২০১৮ অনুযায়ী করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে ২০২৩ সালের গণপূর্ত রেট সিডিউল অনুযায়ী ও কনসালটেন্ট কর্তৃক সার্ভে থেকে প্রাপ্ত ডিজাইন মোতাবেক উক্ত ভবন নির্মাণ ব্যয় প্রাক্কলন করায় তা ৭৭ কোটি ৯২ লাখ ৫২ হাজার টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রকল্পটি সংশোধনের প্রয়োজন হয়েছে।
দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বলা হয়, সিটি কর্পোরেশনের ২১ নং ওয়ার্ডে বান্ডেল কলোনিতে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় নির্ধারিত ২টি ভবনের মধ্যে ১টি করা সম্ভব হচ্ছে না। ভবনটি ৩০ নং পূর্ব মাদারবাড়ী ওয়ার্ডস্থ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব জায়গায় নির্মাণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া প্রকল্পের ড্রইং, ডিজাইন ও সুপারভিশন পরামর্শক ২০২০ সালে নিয়োগ করা হয়। এ খাতে সাড়ে ৪ কোটি টাকার সংস্থান ছিল। প্রকল্প মেয়াদ বৃদ্ধিজনিত কারণে পরামর্শক ব্যয় ২ কোটি টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
তৃতীয় কারণ হিসেবে বলা হয়, প্রকল্প এলাকা থেকে সেবকদের অন্য জায়গায় পুনর্বাসন করতে সময়ক্ষেপণ হওয়ায় প্রকল্পের কাজ শুরু করতে বিলম্ব হয়েছে। সে পরিপ্রেক্ষিতে অবশিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার জন্য ২ বছর ৬ মাস প্রকল্প মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সংশোধন প্রস্তাব অনুমোদন হতেই প্রায় ২ বছর অতিক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে।














