হেসে খেলে বড় হচ্ছে যমুনা

চকরিয়া প্রতিনিধি | শনিবার , ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২ at ৪:৫১ পূর্বাহ্ণ

প্রায় চার মাস বয়সী একটি শাবক রেখে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাহাড় থেকে পড়ে মারা যায় একটি মাদী হাতি। মা মারা যাওয়ার পর খাবারের অভাবে দুগ্ধপোষ্য শাবকটির অবস্থা খারাপ হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে টেকনাফ বনবিভাগ শাবকটিকে উদ্ধারের পর ২০২১ সালের ১০ মার্চ প্রেরণ করে কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারাস্থ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে। তখন পার্ক কর্তৃপক্ষ শাবকটির নাম রাখে ‘যমুনা’। সেই যমুনাই এখন পার্কে আগত দেশি-বিদেশি পর্যটক-দর্শনার্থীর কাছে অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে কোমলমতি শিশুরাই মাহুত বীরুসেন চাকমার সঙ্গে হাতিশাবক যমুনার খুনসুটি দেখে বেশ আনন্দ পাচ্ছে। পার্কে আগতরাও ‘যমুনা’ বলে ডাক দিলেই ছুটে আসছে। এ সময় তাদের গায়ে শুঁড় দিয়ে স্পর্শ করে আদরও দিচ্ছে। যা স্বচক্ষে দেখার অনুভূতিটাই অন্যরকমের।
পার্কের প্রকল্প পরিচালক এবং চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল চট্টগ্রামের বিভাগীয় বনকর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রফিকুল ইসলাম চৌধুরী দৈনিক আজাদীকে বলেন, মা-বাবা, স্বজনহারা এই এতিম হাতিশাবক যমুনার বয়স যখন আড়াই থেকে তিনবছরের মধ্যে হবে তখন এটিকে হাতি বিশেষজ্ঞ ও মাহুত দ্বারা আরো প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলা হবে। সেই পরিকল্পনাই রয়েছে আমাদের।
পার্ক কর্তৃপক্ষ জানায়, পার্কে প্রেরণের সময় শাবকটির একটি পায়ে আঘাতের ক্ষত ছিল। ওজন ছিল প্রায় ১২১ কেজি। সেই শাবক এখন অনেকটাই বড় হয়েছে। যমুনা বলে ডাক পড়লেই মুহূর্তের মধ্যে সাড়া দিচ্ছে সে। পার্কের মাহুত বীরসেন চাকমাই এই শাবকের বাবা-মা। বীরসেনকে এক মুহূর্ত না দেখে থাকতে পারে না শাবক যমুনা।
সেই শাবকটির বর্তমান অবস্থা জানতে চাইলে পার্কের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, যখন পার্কে আনা হয়, তখন ঠিকমত হাঁটতেও পারছিল না শাবকটি। এখানে আনার পর প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা এবং নিয়ম করে প্রতিদিন ১০ প্যাকেট ল্যাকটোজেন দুধ, ৮০টি কলার পাশাপাশি প্রতিদিন সকালে দুধ-দইয়ের সাথে জাওভাত করে খাওয়ানো হয়। এসব খাবারের বিপরীতে প্রতিদিন বরাদ্দ দিতে হয়েছিল ৪৭০০ টাকা। খাবারের রুটিন এভাবে প্রায় দেড় বছর বয়স পর্যন্ত চালানোর পর কয়েকমাস আগে থেকে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
পার্ক কর্মকর্তা মাজহার জানান, বর্তমানে যমুনার বয়স ১ বছর ১০ মাস। প্রতিদিন ৫শ গ্রামের ৬ প্যাকেট করে ল্যাকটোজেন দুধ, ১০০টি বেশি কলার পাশাপাশি কলাগাছের আঁটি কেটে চিপসের মতো করে খাওয়ানো হচ্ছে। সাথে দুধ-দইয়ের সমন্বয়ে জাওভাতও দেওয়া হচ্ছে নিয়মিত। দিনের বেলা পার্কের নির্দিষ্ট খোলা জায়গায় প্রাকৃতির পরিবেশে আর রাতে পার্কের বন্যপ্রাণী হাসপাতালের আইসোলেশন কক্ষে রাখা হয় হাতিশাবক যমুনাকে।
সরেজমিন দেখা গেছে, বন্যপ্রাণী ও মানুষের স্বভাব একেবারে ভিন্ন হলেও হাতিশাবক যমুনা মানুষের ভালবাসায় বেশ আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। নিয়মিত পরিচর্যায় নিয়োজিত পার্কের মাহুত বীরুসেন চাকমাও শাবকটিকে সম্পূর্ণ মা-বাবার মতোই আদর, স্নেহ ও ভালবাসার মাধ্যমে বেশ যত্ন-আত্তিতে বড় করে তুলছেন। নির্দিষ্ট ইশারায় যমুনা বলে ডাক দিলেই বীরুসেনের কাছে গিয়ে শুঁড় দিয়ে আদর করে একেবারে শান্তশিষ্টভাবে বসে পড়ে শাবকটি। তখন এক ধরনের ব্রাশ দিয়ে শরীর আঁচড়ে দিলে সোজা শুয়ে পড়ে এপাশ-ওপাশ করে। মানুষ এবং প্রাণীর মধ্যকার সেই দৃশ্য পার্কে আগত পর্যটক-দর্শনার্থীরা অবলোকন করে মনে অন্যরকম প্রশান্তি অনুভব করেন।
মা-বাবা হারা হাতিশাবক যমুনার পরিচর্যাকারী বীরুসেন চাকমা বলেন, আমার সংসার রয়েছে। সংসারে স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিরাই আমার সাথে যে আচরণ করে, ঠিক একই আচরণ করে হাতিশাবক যমুনা। তাকেও আমার পরিবারের অন্যতম সদস্য হিসেবে মনে করি। চাকরির কারণে আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমিও যমুনার ভালবাসায় আবদ্ধ হয়ে পড়েছি।