হৃদয়ে চিরজাগরুক শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু

তানভীর আহমেদ | শনিবার , ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ at ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ

কিছু মানুষ চলে গেলেও তাঁদের উপস্থিতি ফুরিয়ে যায় না। তাঁরা থেকে যান স্মৃতিতে, সুরে, ভালোবাসায় একটি শহরের সম্মিলিত আবেগের অংশ হয়ে। আইয়ুব বাচ্চু তেমনই এক নাম। তিনি শুধু একজন শিল্পী নন; তিনি একটি প্রজন্মের তারুণ্য, উচ্ছ্বাস ও স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে তাঁর অবদান যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি তার জন্মস্থান চট্টগ্রামের মানুষের হৃদয়ে তাঁর স্থান উচ্চাসনে ।

নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই আইয়ুব বাচ্চুর গান শুনলেই তারুণ্যের রক্তে যেন নাচন ধরত। এখনও চোখের সামনে ভেসে ওঠে চট্টগ্রামের দামপাড়া পুলিশ লাইন মাঠের সেই উন্মুক্ত কনসার্ট। সদ্য প্রকাশিত বাচ্চু ভাইয়ের জনপ্রিয় গান ‘সেই তুমি কেন…’ দর্শকদের অনুরোধে তাঁকে তিনবার গাইতে হয়েছিল। মঞ্চ থেকে বিদায় নেওয়ার পরও দর্শকদের ভালোবাসা তাঁকে আবার ফিরিয়ে এনেছিল স্টেজে। শিল্পী ও শ্রোতার সেই নিবিড় সম্পর্কের দৃশ্য আজও স্মৃতিতে অমলিন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে বাচ্চু ভাইয়ের গান শুনতে দলবেঁধে ছুটে গিয়েছিলাম। অনুষ্ঠান শেষে রাত ১১টায় বাসায় ফেরায় পিতার বেদম বেত্রাঘাতও জুটেছিল। কিন্তু প্রিয় শিল্পীর গান সামনাসামনি শোনার আনন্দের কাছে সেই শাস্তিও সেদিন তুচ্ছ মনে হয়েছিল। বাচ্চু ভাইয়ের প্রতি সেই দুরন্ত আবেগ আজ ফিরে তাকালে মনে হয়, আইয়ুব বাচ্চুর গান আমাদের জীবনের কত গভীরে প্রোথিত ছিল।

চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামের জিমনেশিয়াম মাঠের আরেক কনসার্টের স্মৃতি আজও উজ্জ্বল। কনসার্ট চলাকালীন হঠাৎ করে লালখান বাজারের ছেলেদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক উত্তেজনা শুরু হয়। বাচ্চু ভাই মঞ্চে উঠে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, “মারামারি বন্ধ গরন, বেগ্‌গুনের লই আই আজিয়া নাইচচুম”।

মুহূর্তেই থেমে গেল গণ্ডগোল। এরপর তাঁর গানের তালে হাজারো দর্শকের নাচে দুলতে লাগল পুরো জিমনেসিয়াম মাঠ। তাঁর কণ্ঠে ছিল এমন এক মায়া, যা উত্তেজনাকেও মুহূর্তে আনন্দে রূপান্তরিত করতে পারত।

নিজ স্কুল সেন্ট প্লাসিডস–এর প্রাক্তন ছাত্র সংগঠন ওল্ড প্লাসিডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের (ওপিএ) অনুষ্ঠানেও বাচ্চু ভাইয়ের সঙ্গে স্টেজে উঠে গলা মিলিয়েছিলাম। সেই মুহূর্তের উত্তেজনা, আনন্দ ও গর্ব আজও স্পষ্ট মনে আছে।

চট্টগ্রামের প্রতিটি কনসার্টে গর্ব করে তিনি বলতেন, ‘আরা চিটাইঙ্গা পোয়া, মেডিত ফইরলে লুয়া।’ এই কথার মধ্যেই ফুটে উঠত জন্মশহরের প্রতি তাঁর গভীর টান। তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের সন্তান এই পরিচয় তিনি কখনও আড়াল করেননি; বরং গর্বের সঙ্গে বহন করেছেন। তাঁর গিটার ও কণ্ঠ শুধু বাংলাদেশে নয়, দেশের বাইরেও বাংলা সংগীতের পরিচয় বহন করেছে। কিন্তু বিশ্বমঞ্চের সাফল্যের মধ্যেও তাঁর হৃদয়ের এক বড় অংশ পড়ে ছিল চট্টগ্রামের অলিগলি, মানুষের মুখ ও আঞ্চলিক ভাষার টানে।

২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর ক্ষণজন্মা এই শিল্পীর আকস্মিক প্রয়াণে কেঁদেছিল পুরো দেশ। তবে চট্টগ্রামের কান্নাটা ছিল যেন একটু বেশি আপনজন হারানোর কান্না। তাঁর জানাজায় লাখো চট্টগ্রামবাসীর অশ্রুসিক্ত উপস্থিতি প্রমাণ করেছিল বাচ্চু ভাই শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না; তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের মানুষের হৃদয়ের মানুষ, তাঁদের আনন্দ–বেদনার সঙ্গী।

আগামীকাল তাঁর ৮ম মৃত্যুবার্ষিকীতে সময়ের ব্যবধান পেরিয়েও মনে হয়, বাচ্চু ভাই কোথাও হারিয়ে যাননি। তাঁর গান বাজলে এখনও মানুষ থমকে দাঁড়ায়, গিটারের সুরে জেগে ওঠে পুরোনো স্মৃতি, আর ‘সেই তুমি কেন…’ শুনলেই ফিরে আসে সেই সোনালি দিনগুলো। তাঁর গান আমাদের ব্যক্তিগত স্মৃতিকে যেমন স্পর্শ করে, তেমনি প্রজন্মের সম্মিলিত অনুভূতিকেও জাগিয়ে তোলে। মানুষের জীবন থেমে যায়, কিন্তু সত্যিকারের শিল্পীর সৃষ্টির কোনো মৃত্যু নেই। আইয়ুব বাচ্চু তাই আজও বেঁচে আছেন তাঁর গানে, গিটারের তারে, লাখো–কোটি শ্রোতার স্মৃতিতে এবং চট্টগ্রামের মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসায়। তিনি চোখের আড়ালে, কিন্তু হৃদয়ের ভেতর চিরজাগরুক একজন শিল্পী হিসেবে, একজন আপনজন হিসেবে, একজন চিরন্তন কিংবদন্তি হিসেবে।

লেখক : গণমাধ্যম কর্মী।

পূর্ববর্তী নিবন্ধছোটবেলার দুর্গাপূজা: স্মৃতির রঙিন অ্যালবাম
পরবর্তী নিবন্ধসৌদি সংকটে বাংলাদেশের শ্রমবাজার