বিশ্বেসাহিত্যে সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম অথচ গভীর কবিতা হলো ‘হাইকু’। মাত্র তিন পঙ্ক্তিতে প্রকৃতি, অনুভূতি ও দর্শনকে ধারণ করার এই শিল্পধারা সপ্তদশ শতকে জাপানে জন্ম নেয়। যদিও ঊনবিংশ শতকের আগে ‘হাইকু’ নামে এই কাব্যধারার অস্তিত্ব ছিল না জাপানি সাহিত্যে। বর্তমানে ‘হাইকু’ বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম কবিতা হিসেবে বিশ্ব–সাহিত্যে পরিচিত। হাইকু শব্দটি বহুবচন। একবচন হলো ‘হাইকি’ যার অর্থ–একটি হাস্যরসাত্মক রূপ।
তৎকালীন জাপানি সাহিত্যে ত্রয়োদশ শতকে “রেঙ্গা” নামক এক ধরনের বিশেষ সাহিত্য ধারার প্রচলন ছিল। রেঙ্গা শব্দের অর্থ সংযুক্ত পঙ্ক্তির কবিতা। রেঙ্গা ছিল এক ধরনের শিকল কবিতা। এই ধরনের কবিতায় একাধিক পালা করে একে অপরের কবিতার সঙ্গে মিলিয়ে নতুন পঙ্ক্তি যোগ করে দীর্ঘকায় করার চল ছিল। এই দীর্ঘ কবিতার প্রথম তিন লাইন ৫,৭,৫ জাপানি মোরাসে (মাত্রায়) লেখা হতো। আর এই প্রথম স্তবককেই বলা হতো ‘হোক্কু’। ‘হোক্কু’ বা প্রথম এই স্তবক লেখার দায়িত্ব পড়তো সম্মানীয় কবির ওপর। হোক্কুর কাজ ছিল পুরো কবিতার জন্য একটি ঋতু, স্থান, মেজাজ, ও সুর নির্ধারণ করে দেওয়া। তিনটি পঙ্ক্তিতে ঋতু, দিনের সময়, এবং ভূ–দৃশ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর মতো বিষয় উল্লেখ করা হতো যা এটিকে প্রায় একটি স্বাধীন কবিতায় পরিণত করেছিল পরবর্তীতে। রেঙ্গার হাস্যরসাত্মক রূপ বা সংযুক্ত স্তবককে বলা হতো ‘হাইকাই’। জাপানি ভাষায় ‘হাইকাই’ শব্দটির অর্থ হচ্ছে মজা, কৌতুক, পার্থিব ও হালকা চালে কবিতা লেখা। এ ধরনের পদগুলোতে হাস্যরসের পরিমাণ বেশি থাকতো। এই ‘হাইকাই’ শব্দের প্রথম অংশ ‘হাই’ এবং হোক্কু শব্দের শেষ অংশ ‘কু’ এর সমন্বয়ে ‘হাইকু’ শব্দের উৎপত্তি। ঊনিশ শতকের জাপানি লেখক মাসাওকা শিকি প্রথম এই ‘হাইকু’ নামটি ব্যবহার করেন। ১৭ শতকের কবি মাৎসুয়ো বাশো (১৬৪৪–১৬৯৪, জাপানি সাহিত্যে হাইকুর জনক) যখন হোক্কু এবং রেঙ্গা থেকে ‘হাইকুকে’ পৃথক করে স্বতন্ত্র শিল্প হিসেবে চর্চা শুরু করেন তখন এ–কাব্য ধারাটি জাপানি সাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র সাহিত্য শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তাঁর রচিত হাইকুগুলো জাপানি সমাজের সর্বস্তরে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় এবং জাপানি সাহিত্যে জনপ্রিয় কাব্যিক আসন দখল করে। মূলত হাইকু প্রকৃতির বর্ণনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, যা একটি ঋতুর ইঙ্গিত দিতো এবং একটি নির্দিষ্ট অব্যক্ত আবেগিক প্রতিক্রিয়া জাগ্রত করতো। টোকুগাওয়া যুগের (১৬০৩–১৮৬৭) শুরুতে এই আঙ্গিকটি খ্যাতি লাভ করে। ১৬৭০–এর দশকের এডোতে (বর্তমান টোকিও) থাকাকালীন বাশো এই নতুন শৈলীর কবিতা লেখা শুরু করেন। তাঁর জাপানি ভাষায় রচিত হাইকুর মধ্যে বিখ্যাত উল্লেখযোগ্য একটি হাইকু হলো–
“ফোরুইকে ইয়া
কাওয়াজু তোবিকোমু
মিজু নো ওতো”।
এই কবিতাটি পরবর্তীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলায় অনুবাদ করেন। কবিতাগুলোতে বাশোর জাপান ভ্রমণ কালের অভিজ্ঞতা উঠে আসতে দেখা যায়। মাৎসুয়ো বাশো ছাড়াও জাপানি সাহিত্যে অন্যান্য অন্যতম হাইকুর রচিয়তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো–আঠারো শতকের Buson, আঠারো শতকের শেষের দিকের কবি Issa, ঊনিশ শতকের কবি Masaoka Shiki, ঊনিশ শতকের শেষের দিকের কবি Takaham Kzosh এবং Kawhigashi Hekigoto. চর্যা–পরবর্তী এই হাইকু কবিতাগুলো সতেরো অক্ষর (সিলেবল) বিশিষ্ট তিন চরণে লেখা হতো এবং এর গঠনবিন্যাস ছিল প্রথম চরণে ৫ অক্ষর; দ্বিতীয় চরণে ৭ অক্ষর; এবং তৃতীয় চরণে ৫ অক্ষর। এর ভাষা সহজ–সরল, বোধগম্য। তিন চরণের সর্বোচ্চ ১৭ অক্ষর এক নিঃশ্বাসে উচ্চারণ করা যায়। তবে বর্তমানে এ কাঠামো অনেক সময় শিথিলভাবে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। হাইকুর দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে–কিগো (ঋতু সংকেত) এবং কিরেজি (ভাবের বিরতি বা মোড়)। প্রথম লাইনের সাথে বা তৃতীয় লাইনের সাথে অন্য দুই লাইনের সরাসরি কোন সামঞ্জস্য থাকে না, হঠাৎ দেখা কোন অনুভূতির প্রকাশ ঘটায়। প্রাকৃতিক দৃশ্য এর মূল উপজীব্য বিষয় হলেও হাইকু কবিতায় প্রকৃতিকে আকৃষ্ট করে ব্যক্তির অনুভূতি আবেগ প্রকাশিত হয়। প্রকৃতিকে উদ্দেশ্য করে ব্যক্তি অনুভূতির চিত্রকল্প এই কবিতাগুলোতে তুলে ধরা হয়। হাইকু হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে তিন লাইনের সতেরো অক্ষরই কেবল মূল বিষয় নয় তার সাথে রয়েছে কিছু প্রাকৃতিক চিত্রকল্প; দর্শনকথা ও কবি অনুভূতি।
জাপানি ভাষায় ১৭ মোরাসকে ইউরোপীয়গণ ১৭ দল ভেবে হাইকু লেখার সূত্রপাত করেন। ইউরোপে ইমেজিস্ট আন্দোলনের পর ১৭ অক্ষরের পরিবর্তে আরো বেশি অক্ষরে হাইকু লেখা শুরু হয়। ঊনিশ শতকের আগে বিশ্বের অন্যান্য দেশে হাইকুর পরিচিতি ছিল না। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে পল–লেউস, কোউচোউড এক ধরনের অনেকগুলো ছোট ছোট জাপানি কবিতা নিজ মাতৃভাষায় ফরাসিতে অনুবাদ করেন। পরবর্তীকালে ফরাসি থেকে তা অনূদিত হয় ইংরেজিতে। ইংরেজি সাহিত্যের–জগতে এজরা পাউন্ড এবং অ্যালান গিন্সবার্গের মতো কবিদের হাতে হাইকু জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
বাংলা সাহিত্যে হাইকুর চর্চা নেহাত কম নয়। বাংলা সাহিত্যে হাইকুর পদার্পণ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে। ১৯১৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম জাপান ভ্রমণ করেন, মূলত জাপানের শিক্ষাবিদ ড. নিতোবে ইনাজো–এর আমন্ত্রণে সেখানে যান এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেন। জাপানের শিক্ষা সংস্কৃতি ও সমাজ জীবন দেখার উদ্দেশ্যে রওনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেখানে তিনি জাপানি সাংস্কৃতির এই অন্যতম শিল্প রূপের সাথে পরিচিত হন। জাপান ভ্রমণে ‘তুসামার মারু’ নামক জাহাজের অভিজ্ঞতা সম্বলিত গ্রন্থ “জাপানযাত্রী”–তে তিনি প্রথম হাইকুর নান্দনিকতা এবং সংক্ষিপ্ত রূপের প্রশংসা করেন।
বাংলা সাহিত্য অনুবাদের ক্ষেত্রে ৫,৭,৫ সিলেবল কাঠামো বজায় রাখা কঠিন হতে পারে কিন্তু হাইকুর মূল দর্শন–একটি মুহূর্তকে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম করে তোলার মধ্যেই মূল সার্থকতা নিহিত থাকে। যেমন–মাৎসুয়ো বাশোর একটি হাইকু কবিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক অনুবাদিত হয়েছে–
“পুরনো পুকুর
ব্যাঙের লাফ
জলের শব্দ”।
এই অনুবাদটি ১৭ অক্ষর বিশিষ্ট হয় নি। কিন্তু এর দর্শন বজায় আছে। পুরনো পুকুর–নীরবতা নিঃসঙ্গতা; ব্যাঙের লাফ–হঠাৎ নড়াচড়ার শব্দ; এবং জলের শব্দ–শব্দহীনতায় হঠাৎ শব্দের অনুভূতির প্রকাশ অনুবাদটিকে সার্থক করে তুলেছে।
তবে বাংলা ভাষায় নিজস্ব মাত্রায় ও অক্ষরে তিন লাইনের হাইকু রচনা করা সম্ভব। যেমন–
“টিপ টিপ বৃষ্টিতে
পিছলে পড়া নদীর ঘাট
স্মৃতির পাঁয়তারা”।(নিজের লেখা)
এই কবিতাটিতেও হাইকুর প্রণীত শর্ত–বাংলা ভাষার অক্ষরবিন্যাস মানা হয়েছে। জাপানি হাইকু অনুবাদের ক্ষেত্রে ১৭ অক্ষরের মিলবিন্যাস কখনো কখনো রক্ষিত হয় না, কারণ জাপানি ভাষার ১২ মোরাসে বাংলা ভাষায় ১৭ অক্ষর হয়। যেহেতু দুটি ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, তাই ভাষার অক্ষর এবং মাত্রার তারতম্যের কারণে হাইকু অনুবাদের ক্ষেত্রে অনেক সময় ৩ চরণে ১৭ অক্ষরবিশিষ্ট পদ বজায় থাকে না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাড়াও বাংলা ভাষায় ‘হাইকু’ রচনায় উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ হলেন–আসাদ চৌধুরী, আবিদ আনোয়ার, দুলাল বিশ্বাস, রহিমা আখতার কল্পনা, ও আরও অনেকে। তারা প্রচলিত ধারার (৫,৭,৫) বাইরে গিয়ে অনেক কবিতা লিখেছেন। আবিদ আনোয়ার এর একটি হাইকু কবিতা–
“বাসর ঘর
আপন করে দেয়
যে ছিল পর”।
‘দ্য হাইকু ফাউন্ডেশন’ এর উদ্যোগে প্রতিবছর ১৭ এপ্রিল আন্তর্জাতিক হাইকু দিবস পালন করা হয়। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে প্রতিবছর হাইকু দিবসটি এপ্রিল মাসে নানা অনুষ্ঠানাদির মাধ্যমে দিনটি পালিত হয়। অনুষ্ঠানাদির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো–হাইকু আবৃত্তি; ওয়ার্কশপ ও সেমিনার; কুকাই (হাইকু প্রতিযোগিতা); গিনগো ওয়াক (তাৎক্ষণিক অভিজ্ঞতার আলোকে হাইকু রচনা); আলোচনা; মতবিনিময় ও বইমেলা। এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন সময়ে “আন্তর্জাতিক হাইকু কবি সম্মেলন” অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলন হলো বিশ্বজুড়ে হাইকু–প্রেমী ও কবিদের মিলন মেলা যেখানে মূলত প্রকৃতি ও ঋতু ভিত্তিক সংক্ষিপ্ত জাপানি কবিতা আলোচনা করা হয়। বাংলা ভাষায় প্রথম আন্তর্জাতিক হাইকু কবি সম্মেলন হয়েছে ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সালে কলকাতায়, কৃষ্ণপদ ঘোষ মেমোরিয়াল ট্রাস্ট ভবনে; যুথিকা সাহিত্য পত্রিকার আয়োজনে।
সংক্ষিপ্ততার মধ্যেও গভীরতা প্রকাশের এই অনন্য শিল্পরূপ হাইকু আজ বিশ্বসাহিত্যে জনপ্রিয় স্থান দখল করে আছে। বাংলা ভাষাতেও এর চর্চা দিন দিন সমৃদ্ধ হচ্ছে।
ইমেইল: mstiannatulferdues214@gmail.com











