হল্যান্ড থেকে

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া | শনিবার , ২ জুলাই, ২০২২ at ৫:১৩ পূর্বাহ্ণ

দেশ ফিরে আসি বারবার

প্রায় আড়াই বছর পর দেশে এলাম। অথচ ফি-বছর দেশে অন্তত একবার আসা চাই- এমনটি ছিল অলিখিত নিয়ম। কখনো কাজ নিয়ে, কখনো স্রেফ বেড়ানো। কিন্তু কোত্থেকে অলুক্ষণে ‘কোভিড’ এসে সব লণ্ডভণ্ড করে দিলো। প্রায় কোটি প্রাণ হারিয়ে গেলো। এখনো এই ঘাতক-ব্যাধি থেকে মুক্তি মেলেনি এই বিশ্বের। বিশ্বব্যাপী মানুষ যখন একটুখানি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে শুরু করলো, তখনই শুরু হলো ইউক্রেনকে ঘিরে রাশিয়া ভার্সাস যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের তথা ন্যাটোর পরোক্ষ যুদ্ধ। দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি কেবল অনুন্নত বিশ্বেই নয়, ইউরোপেও তার প্রভাব পড়লো। তারপরও জীবন থেমে থাকে না। মানুষ ছুটছে-এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। ঠিক করলাম আর নয়, সামনে যাই থাক দেশে যাবোই। এখন ইউরোপে সামার, সবার ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ার পালা। সামারে ইউরোপে কেউ ঘরে থাকতে রাজি নয়, এমন কি যে ব্যক্তিটির কোনো কাজ নেই এবং যিনি সরকারি ভাতায় চলেন তারও ‘ভেকেশনে’ যাওয়া চাই। তিনিও সরকার থেকে পান এই সময়টা ‘ভ্যাকেশন এলাউন্স’ যদিও বা তা খুব যৎসামান্য। আর সে কারণে গত কয়েক মাস ধরে হল্যান্ডের প্রধান বিমান বন্দর ‘শিফল এয়ারপোর্টে’ যাত্রীর অস্বাভাবিক রকমের ভীড়। এর পেছনে রয়েছে বিমানবন্দরে কর্মচারী-সংখ্যার স্বল্পতা। বিগত প্রায় দেড় বছর কোভিডের কারণে তেমন কোনো উড়োজাহাজ উড়েনি। ফলে যে সমস্ত কর্মচারী বেকার হয়ে পড়ে, তারা অন্য পেশায় চলে যায়। আর এই কর্মচারী-সংকটের কারণে প্রতিদিন ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে, হচ্ছে ইমিগ্রেশনে প্রচণ্ড রকমের ভীড়। অনেকে তাদের ফ্লাইট মিস করছে, যাত্রীদের ক্ষোভ, কর্মচারীদের উপর বাড়তি চাপ, অসন্তোষ। সব মিলিয়ে গোটা ব্যাপারটা অনেকটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবার দশা। তাই শিফল কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে কর্মচারীদের বেতন দিল বাড়িয়ে। তারপরও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এই বছর এই সময়টা অস্বাভাবিক ভীড়। আমাদের বলা হলো ফ্লাইট ছাড়ার নির্দিষ্ট সময়ের অন্তত ৪/৫ ঘণ্টা আগে বিমানবন্দর আসা চাই।

স্বাভাবিক সময়েও আমি আগ বাড়িয়ে যে কোনো জায়গায় যাই। আকাশ-ভ্রমণে তো বটেই। কথা ছিল টেক্সি নেব। কিন্তু আত্মজ অতীশ বলে, সে ড্রপ দেবে। এই প্রথম তাকে একা বাসায় রেখে আমাদের হল্যান্ড ছাড়া। মনে মনে উদ্বেগ ছিল। কিন্তু তা আমলে না নিয়ে সে বলে, কোনো সমস্যা হবে না। আমাদের ড্রপ দিয়ে বাসায় ফেরার পথে তাকে সঙ্গ দেবার জন্যে শ্যালিকা পূরবী এসেছিল শিফলে। চেক ইন অন-লাইনে সারা হলেও লাগেজ চেক-ইন করার জন্যে লাইনে দাঁড়াতে হলো। আধুনিক প্রযুক্তির কারণে ল্যাপটপ, ব্যাগ কিছুই খুলতে হলো না। রিডেবল মেশিনে পাসপোর্ট ঢুকিয়ে আমরা এগিয়ে যাই গেইটের দিকে। হাতে অফুরন্ত সময়। প্লেন ছাড়বে রাত নয়টা পঞ্চাশে। সাড়ে-আটটা নাগাদ এয়ারপোর্টের ভেতর ম্যাকডোনাল্ডসে খেয়ে বোর্ডিং গেইটের দিকে এগিয়ে যাই। এই পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাক ভাবে গেল। মনে কিছুটা শান্তি। তিন আসনের আইল-সীট সহ দুটো আমাদের দখলে। ভাবছি পাশে না জানি কে বসে। ভাগ্য সুপ্রসন্ন- দেখা গেল কেউ নেই।

সুমনা বেজায় খুশী। আমস্টারডাম থেকে দুবাই- এই সাড়ে ছয় ঘণ্টার আকাশ পথে সে বলা যায় প্রায় সময়টা শুয়ে শুয়েই কাটালো। উঠে বসলো কেবল ডিনারের সময়। শরীর ছিল ভীষণ ক্লান্ত। জানি ঘুম আসবে না। ও-পথ মাড়ালাম না। সীটের সাথে লাগলো টিভি স্ক্রীনে সুইচ বদলাতে থাকলাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-ভিক্তিক একটি ইংরেজি ছবি বেছে নিলাম। কদ্দুর দেখে ভালো লাগলো না। বেছে নিলাম বলিউডের ছবি ‘গুড নিউজ’। আহামরি কিছু না, সে জানা ছিল, কিন্তু আমার লক্ষ্য ছবি দেখা না, লক্ষ্য সময় কাটানো। প্রায় আড়াই ঘণ্টা কেটে গেল। যারা দীর্ঘ আকাশ ভ্রমণ করেন তাদের প্রায় সবার মনের মধ্যে চিন্তা থাকে কখন না জানি ‘টার্বুলেন্স’ শুরু হয়। সুমনা বেল্ট খুলে শুয়ে। যেই না ভাবা অমনি শুরু হলো ‘দুলুনি’। পাইলট ঘোষণা দিলেন সীট বেল্ট বাঁধার এবং সীট সোজা করার জন্যে। টয়লেটের লাল বাতি জ্বলে উঠলো। অর্থাৎ এই সময়টা আর টয়লেটে যাওয়া যাবে না। বোধকরি সবাই মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করতে শুরু করলো, আমিও তাদের বাইরে নই। এমনটি একবার নয়, বেশ বার কয়েক ঘটলো। তবে মারাত্মক আকারের কিছু নয়। তারপরও এমনটি হলে শূন্যে নিজেকে বড্ড অসহায় ঠেকে। সে সময় উপরওয়ালার কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

এমিরেটসের সার্ভিস এক কথায় চমৎকার।
বিশ্বের ১৫২ টি গন্তব্যস্থলে এই এয়ারলাইন্সের চলাচল। এর বহরের সংখ্যা ২৬২টি। গত ২০২০-২০২১ সালে এক কোটি ৯০ লক্ষ যাত্রী বহন করে এমিরেটস এয়ারলাইন্স, ২০২২ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী এর কর্মচারী সংখ্যা ছিল ৪৫ হাজার ৮৪৩। সোজা বাংলায় বলা যায় এলাহী কাজ-কারবার। অনেকবার এমিরেটসে আমার আকাশ ভ্রমণ হয়েছে। ভালো লাগে এদের খাবার। আমস্টারডাম থেকে দুবাই- এই পথে পশ্চিমা-স্টাইলে খাবার। দুবাই থেকে ঢাকার পথে যে খাবার সরবরাহ করা হয় তাতে ভাত, মাংস থেকে শুরু করে চাটনী, পায়েস এমনি মুখরোচক খাবার থাকে। ড্রিঙ্কস তো আছেই, সফট থেকে হার্ডস। সব চাইতে বেশি ভালো লাগে এয়ার হোস্টেসদের সেবা। এক কথায় তুলনাহীন। দুবাই থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে উড়াল দেবার সময় ককপিট থেকে পাইলট জানান, ওই ফ্লাইটে ১১টি দেশের ১১টি ভাষাভাষীর ১১ জন কেবিন-ক্রূ রয়েছে। লন্ডন থেকে আসা এক বাংলাদেশী মহিলা যাত্রী বলেন, তিনি ‘বিমানে’ ভ্রমণ করেন না, কারণ বিমান খুব কম সময়ে নির্দিষ্ট সময়ে ছাড়ে। আর তা ছাড়া ওদের (বিমান) সার্ভিস খুব খারাপ। আর আমার অভিজ্ঞতা? সে কথা না বলাই ভালো।

গত ৩১ বছর হল্যান্ড অবস্থান সময়ে শুরুর দু-এক বছর বিমানে ভ্রমণ করেছিলাম। এর পর ও-মুখো আর হইনি। এমিরেটসের বিমানবালাদের সেবা আর বিমানের বিমানবালাদের সেবা – এ দুয়ে আকাশ-পাতাল ফারাক। আর দুর্নীতি-সে নতুন কোনো কিছু নয়। তবে ঢাকা বিমানবন্দর নেমে মনটা প্রশান্তিতে ভরে গেলো। চমৎকার ইমিগ্রেশন-সার্ভিস। মিনিট দশেকেরও কম সময়ে শেষ হলো। লাগেজ এলো ঘণ্টা খানেকের মধ্যে। তবে দুবাই থেকে ঢাকা পথটুকু সুমনার জন্যে তেমন সুখকর ছিল না। তার পাশে বসেছিলেন ছোটখাট হাতীসম এক বাঙালি মহিলা। দুহাতে ভারী ও কাজ করা সোনার চুড়ি, হাতের ৫টি আংগুলে সোনার আংটি। মাথায় ওড়না। বয়স ৬৭। তার আমেরিকান পাসপোর্ট দেখে জানলাম। কী করে তার পাসপোর্ট দেখলাম সে কথা না হয় আগামী সংখ্যায় বলি। নড়াচড়া করতে এমন কী সীট-বেল্ট পড়তেও তাকে এয়ারহোস্টেসকে এসে সাহায্য করতে হলো। মহিলার আদি নিবাস নোয়াখালী। আমেরিকায় আছেন বিগত ২৫ বছর ধরে। তার কথা বলবো আগামী সংখ্যায়।

লেখক : সাহিত্যিক, কলামিস্ট