হল্যান্ড থেকে

বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া

শনিবার , ৩০ মার্চ, ২০১৯ at ৮:০২ পূর্বাহ্ণ
101

ছাব্বিশে মার্চ: চাই একাত্তরের
হত্যাকাণ্ডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

২৬ মার্চ! একটি কিশোর, বয়সে তার চাইতে বড় নিকট এক আত্মীয়ের সাথে শহর ছেড়ে পায়ে হেঁটে এগিয়ে চলেছে গ্রামের দিকে। লক্ষ্যস্থল পটিয়ার উনাইনপুরা গ্রাম। এই গ্রামে তার মামার বাড়ি, পিসীর বাড়ি, দুটোই এ-পাড়া আর ও-পাড়া। তার মত অনেকেই এগিয়ে চলেছে একই পথ ধরে, গ্রামের দিকে। পুরুষ, মহিলা, শিশু, বৃদ্ধ, বৃদ্ধা নানা বয়েসী। পাক হানাদার বাহিনী যে কোন মুহূর্তে ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে শহরে ঢুকে পড়বে এমন একটা সংবাদ চাউর হয়ে গিয়েছিল। তার কয়েক ঘণ্টা আগে, পঁচিশে মার্চের রাতে, রাত তখন প্রায় বার, পাড়ার আর এক সমবয়েসী, শামীমের সাথে বাড়ির সামনে বড় যে কাঁঠাল গাছ তার নিচে দাঁড়িয়ে প্রায় প্রতিদিনকার মত গল্প করছিল। হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে গোলাগুলির আওয়াজ। পরে জেনেছে চট্টগ্রাম বন্দরে দাঁড়িয়ে থাকা পাকিস্তানি জাহাজ থেকে শহরের দিক লক্ষ্য করে গোলা বর্ষণ করছিল। ভীত সন্ত্রস্ত কিশোর দুটি নিজ নিজ ঘরে ঢুকে পড়ে। তাদের একজন এই আমি। পরদিন ভোর হলে, বাসায় আসেন সেই আত্মীয়, তার পিসতুতো ভাই। বাবা তার সাথে আমাকে গ্রামের দিকে পাঠিয়ে দেন। শহরে জন্ম নেয়া এই আমি কষ্ট খুব একটা কাছ থেকে দেখিনি। খালি হাতে সেই দাদার সাথে এগিয়ে চলেছি। গাড়ি চলছে না। যে দু-একটি বাস চলতে দেখা যায় তাতে স্থান নেই। অতদূর পথ রিঙায় যাবার যো নেই। শীর্ণকায় শরীরের এই আমি এক সময় দীর্ঘ পথ হেঁটে চলায় ক্লান্ত হয়ে পড়ি। পাঁয়ে হেটে কালুরঘাট ব্রিজ পার হতেই দাদা বললেন, ‘চল, পাশের গ্রামে আমার এক দূর সম্পর্কীয় আত্মীয় আছে, সেখানে গিয়ে একটু জিরিয়ে নেই। তারপর আবার হাঁটা যাবে’। কিছু না বলে নীরবে তাকে অনুসরণ করি। রাস্তার দুধারে, কোথায়ও বা সড়ক অবরোধ করে স্থানীয় জনগণ গাছ, ভাঙা গাড়ি, যে যা পারছে তাই দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। যাতে পাক সেনাবাহিনীর গাড়ি আসতে না পারে। ততক্ষণে কালুরঘাট ব্রিজের দক্ষিণ পাশে বালির বস্তা দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলে তাতে স্টেনগান এবং নাম না-জানা অস্ত্র তাক করে বসে আছে বেশ কিছু বাঙালি সৈনিক। মাঝেমধ্যে বাঙালি সৈন্যদের কনভয় এগিয়ে আসছে। ট্রাকগুলো আসতে দেখে সড়কের দু-পাশে দাঁড়ানো ছেলে-বুড়ো সবাই হর্ষধনি দিয়ে উঠে, তাদের উৎসাহ দেয়। বাঙালি এই সৈন্যরা আসছে বান্দরবান থেকে। লক্ষ্য শহর। ভীরু এই মন সাহস পায়, মনে মনে বলে, না, বাঙালি হারবে না। অস্ত্র হাতে বাঙালি সৈন্যরা যখন নিরস্ত্র বাঙালির পাশে এসে দাঁড়িয়েছে জয় আমাদের হবেই। দুপুরের দিকে আবার আমাদের হাঁটা চলা। গ্রামে যখন পৌছুলাম তখন রাত নেমে এসেছে। তারপর এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে।
শহর ছেড়েছি প্রাণে বাঁচার জন্যে। অনেকেই থেকে গেছে শহরে। তাদের অনেকেই তাদের প্রাণ বাঁচাতে পারেনি। অস্ট্রেলিয়ার হেরাল্ড ট্রিবিউন ২৫ মার্চের হত্যাযজ্ঞের কথা উল্লেখ করে জানিয়েছিল ‘কেবল ওই রাতে বাংলাদেশে এক লক্ষ লোককে হত্যা করে পাক সেনাবাহিনীরা। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে হত্যা করেছে ত্রিশ লক্ষ লোককে, ধর্ষণ করে দুই লক্ষেরও বেশি মা-বোনকে, অসংখ্য ঘর বাড়ি, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছিল হানাদার পাক বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসররা। এক কোটি বাঙালি জীবন বাঁচাতে পাড়ি জমিয়েছিল পাশের দেশ ভারতে। এই যাত্রাপথে অনেকেই অনাহারে, রোগে, চিকিৎসার অভাবে অকাল মৃত্যুবরণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনী যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল তার চাইতে একাত্তরের হত্যাযজ্ঞ ছিল আরো ভয়াবহ। পরবর্তীতে পাক জেনারেল রাও ফরমান আলীর যে ‘স্ক্র্যাচ ড্রাফট’ পাওয়া যায়, তাতে লেখা ছিল “পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ জমিন অবশ্যই লাল রঙে রাঙাতে হবে”। বাঙালির রক্তে তারা রাঙিয়েছিল বাংলাদেশের মাটি। দুর্ভাগ্য আমাদের, বিংশ শতাব্দীর সব চাইতে ভয়াবহ ও জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ যারা চালায়, তারা এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তাদের কিছু স্থানীয় দোসর সাজা পেয়েছে বটে, তবে যে দেশটি এই হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে সু-পরিকল্পিতভাবে তারা এখনো রয়ে গেছে বিচারের বাইরে। বিচার তো দূরের কথা বাংলাদেশে যে একাত্তরে তারা হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে সে সত্য পাকিস্তান স্বীকার করেনি এখনো। গোটা বিশ্বও একাত্তরের এই হত্যাযজ্ঞকে এখনো স্বীকৃতি দেয়নি। একাত্তরের হত্যাযজ্ঞের স্বীকৃতির দাবিতে বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হয়েছে পৃথক অনুষ্ঠান। ইউরোপেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। ইউরোপীয় ডায়াসপোরা সংগঠন, ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ ফোরাম সংক্ষেপে ইবিএফ, গেল ২৩ মার্চ হল্যান্ডের হেগ শহরে আয়োজন করেছিল এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের। একাত্তরের হত্যাকাণ্ড-নির্ভর ছবি প্রদর্শনী ছাড়াও সরব প্রতিবাদ জানিয়েছিল হেগ শহরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচারালয়ের সামনে। প্রদর্শন করা হয়েছিল একাত্তর নির্ভর প্রামাণ্য চিত্র, ব্লকেইড। ইবিএফের এই সম্মেলনে এসেছিলেন বাংলাদেশ থেকে শহীদ বুদ্ধিজীবী সাহিত্যিক, লেখক শহীদুল্লাহ কায়সারের মেয়ে অভিনেত্রী শমী কায়সার। বক্তা হিসাবে উপস্থিত ছিলেন দুই বৃটিশ সাংবাদিক ক্রিস ব্ল্যাকবার্ন ও ডানকান বার্টলেট (দুজনেই ডিসেম্বর নির্বাচনের আগে বাংলাদেশে গিয়েছিলেন), জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. ওলফ পিটার সিঙ্গেল, দি হেগ পিচ সংগঠনের পরিচালক ডাচ নাগরিক জ্যাকব দি ইয়ং, নিউ ইয়র্ক থেকে আসা ব্লকেইড-র পরিচালক আরিফ ইউসুফ, ইবিএফ প্রেসিডেন্ট লন্ডন থেকে আসা আনসার আহমদ উল্লাহ, এই কলাম লেখক এবং হল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শেখ মোহাম্মদ বেলাল। শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতার মেয়ে ড. মেঘনা গুহ ঠাকুরতা এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. আলিম চৌধুরীর মেয়ে ড. নুজহাত চৌধুরীর দুটো ভিডিও বার্তা গোটা পরিবেশকে থমথমে করে তোলে। সাথে যোগ দেয় সশরীরে উপস্থিত শমী কায়সার। এই তিন রমণীর বাবাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে পাক বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসরা। সেদিনের ওই অনুষ্ঠানে বেলজিয়াম থেকে এসেছিল দেশের গণতন্ত্রের জন্যে অবিরাম খেটে-যাওয়া জনা কয়েক বাংলাদেশি। এদের বেশির ভাগই চট্টগ্রামের। তাদের মধ্যে অতি সক্রিয় চট্টগ্রামের তরুণ, খোকন শরীফ, বেলজিয়াম আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর চৌধুরী রতন, দেশের সকল কাজে এগিয়ে আসা এম এম মুর্শেদ ও সোহেল। সবার নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না বলে উল্লেখ করতে পারলাম না। ফিনল্যান্ড থেকে গাঁটের পয়সা খরচ করে এসেছিলেন ড. মজিবুর দপ্তরি, লন্ডন থেকে এম এম আর মনোয়ার, জার্মানি থেকে আবদুল হাই ও দূরের এক শহর থেকে আসা হল্যান্ড আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মুরাদ খান। এদের নাম উল্লেখ করলাম এই কারণে, যে-ইস্যুতে এই সম্মেলন তার সাথে একাত্ম না হলে কেউ পকেটের পয়সা খরচ করে ভিন্ন দেশ থেকে হল্যান্ডে আসতো না। কতটুকু কমিটমেন্ট থাকলে এই ত্যাগ সম্ভব সে সহজে অনুমেয়। বুকের ভেতর কষ্ট পুষে রাখা কেউ কেউ এসেছেন। তাদের একজন হল্যান্ডের জসিমউদ্দিন লিটন। গার্মেন্টস ব্যবসা করেন। অনেক বছর ধরে তার সাথে পরিচয়। কিন্তু মাত্র সপ্তাহ দুয়েক আগে জানলাম একাত্তরে স্থানীয় রাজাকার, আলবদরদের তাদের ঘর লক্ষ্য করে ছোড়া গ্রেনেডে রাতে ভাত-খাওয়া অবস্থায় মারা যায় তার দুই বোন এবং মা-বাবা। কথাটা শোনা মাত্র আমার গা কাঁটা দিয়ে উঠেছিল। তার প্রতি ভিন্ন ধরনের সহানুভূতি জেগে উঠেছিল আপনাতে। নিজেকে তার স্থানে বসিয়ে তার ব্যথা, কষ্ট অনুভব করার ব্যর্থ চেষ্টা করি। ব্যর্থ এই কারণে যার ব্যথা সেই একমাত্র জানে ব্যথাটা কত বড়। একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় টাঙ্গাইলের এম এম আর মনোয়ার হারিয়েছেন তার পরিবারের ছয় সদস্যকে। এমনি অগণিত বাঙালি হারিয়েছে তাদের নিকটজনকে। আমরা তার সব কি জানি? জাতি কি জানে? জানে না। জানার প্রচেষ্টা হয়নি তেমন। দুর্ভাগ্য অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা, মুক্তিযোদ্ধা-পরিবার হারিয়ে গেছে নকল মুক্তিযোদ্ধার ভীড়ে। ঊনপঞ্চাশ বছর পেরিয়ে এসেছি। এখনো সব অপরাধীর বিচার হয়নি। বিচারের বাণী এখনো কাঁদে নিভৃতে। হত্যাকারী সে ব্যক্তি হোক, দল হোক, গোষ্ঠী হোক, দেশ হোক তাদের বিচার একদিন হবেই-সে দিনের অপেক্ষায়। (২৬-৩-২০১৯)

x