‘হক’ এবং শাহ বানো

কাজী রুনু বিলকিস | শনিবার , ৯ মে, ২০২৬ at ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ

ভারতের সাংবিধানিক আইন ও মুসলিম ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইনের টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে এক নারীর আইনি লড়াইয়ে ভারতের সুপ্রীম কোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়ের উপর ভিত্তি করে “হক” ছবিটি নির্মিত হয়। ইতোমধ্যে ছবিটি ভারত এবং বাংলাদেশে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ইয়ামী গৌতম এবং ইমরান হাশমি অভিনীত তিন তালাক এবং ভরণপোষণের অধিকারের লড়াই দর্শকের হৃদয় স্পর্শ করেছে। এটা শুধু তালাকের গল্প নয়। নারীর প্রতি অন্যায্য ও পারিবারিক অবিচারের বিষয়গুলো সামনে নিয়ে এসেছে। একজন নারীর বৈবাহিক সম্পর্ক, তার নিজের আত্মমার্যাদা এবং নিজের অধিকার আদায়ের দীর্ঘ সংগ্রামের ঐতিহাসিক রায় এবং অনন্য মাইলফলক! সেই রায় তখনকার সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে বেশ আলোড়ন তৈরি করেছিল। ইসলামী আইনে পরিষ্কার নির্দেশনা আছে, দ্বিতীয় বিবাহের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নিতে হবে। কিন্তু সেটা অগ্রাহ্য করে দ্বিতীয় বিবাহ করেন ‘হক’ সিনেমার আব্বাস খান। সাজিয়া বানোকে তার বিবাহের কারণ ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আব্বাস খান বলেন, সওয়াবের জন্য তিনি এই বিয়েটি করেছেন। সাজিয়া বিস্ময়ের সাথে বলতে থাকে, তুমি নামাজ পড়োনা, রোজা রাখোনা, যাকাত দাওনা! আর তুমি সওয়াবের জন্য আরও একটা বিয়ে করে ফেললে!! এটা প্রচলিত মুসলিম সমাজের বিশ্বাসের প্রতি ছুড়ে দেওয়া সাজিয়া বানোর প্রশ্ন। দ্বিতীয় যে বিষয়টা ইসলামের নিয়ম বলে চালিয়ে দেওয়া হয় স্বামী তিন তালাক বললে তালাক হয়ে যায়। এটাও একটা ভুল ব্যাখ্যা। এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক বললে তালাক হয়ে যায় না। এটা একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আমাদের সিনেমার দৃশ্যে এমন দৃশ্য সচরাচর দেখা যায় স্বামী স্ত্রীকে এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক বলে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেয় আর স্ত্রী আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে না না করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে! সাজিয়া বানোর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে কিন্তু তিনি শক্ত ছিলেন। তিনি আইনের পথে হাঁটেন। তার এই সংগ্রাম, ন্যায্যতার লড়াইয়ে তার নিজ সমাজের সমর্থন পর্যন্ত পাননি। ধর্মীয় নেতারাও তার প্রতিবাদী কন্ঠকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। সমাজ তাকে একঘরে করে রাখে। বাজার পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হয় তার জন্য। তার জীবনকে দুর্বীষহ করে তোলা হয়। পুড়িয়ে মারার চেষ্টাও হয়। হার মানেননি সাজিয়া বানো। এই বিষয়গুলো চমৎকারভাবে এসেছে ছবিতে। ইয়ামি গৌতমের অভিনয় অনেকদিন মনে রাখার মতো।

সুপর্ণ ভার্মা পরিচালিত ‘হক’ সিনেমাটি নেটফ্লিক্সে দেখতে দেখতে অনেক কথাই মনে পড়ছিলো। মনে পড়ে গেল আঙুরী বেগম আর তার ছেলে রহিমের কথা। সে আমার বাসায় সতেরো আঠারো বছর কাজ করেছিলো। ছেলে বেশি ছোট হওয়ায় সে কাজ পাচ্ছিলো না। কারো কাছে রেখে আসার মতো অবস্থাও ছিল না। ছেলের বয়স যখন চার বছর তখন হাতিয়া থেকে মা ছেলেকে বাসায় এনে রেখেছিলাম কাজের সহকারী হিসেবে। রহিম যখন মায়ের গর্ভে তখন তার জন্মদাতা তার মাকে ফেলে চলে যায়। সে কখনো তার বাবাকে দেখেনি। এরপর তার দীর্ঘ পথচলায় বাবাকে আর খোঁজার প্রয়োজন মনে করেনি। সে আমাদের খুব আপনজন হিসেবে বেড়ে উঠেছিলো। সেও এখন সংসারী। মা, স্ত্রী সন্তান নিয়ে ভালো আছে।

বাবারা ফেলে যেতে পারে খুব সহজে। কিন্তু মায়েরা আঁকড়ে ধরে রাখে। বাবা খোরপোশ দিলো কি দিলো না সেটা বড় প্রশ্ন হয়ে উঠে না একজন মায়ের কাছে! আমার চার দশকের সংসারে অনেক আঙুরী বেগমকে আমি পেয়েছি। তাদের তেমন কোন আক্ষেপও দেখিনি। তারা ধরেই নেয় এটাই নিয়ম এবং নিয়তি পুরুষশাসিত এই সমাজে। তাছাড়া এটার কোন সুরাহা আছে কিনা তাও তাদের জানা নেই। প্রতারিত হবার কারণে কোথাও বিচার পাওয়ার ব্যবস্থা আছে কিনা কিংবা কার কাছে গেলে ন্যায্য বিচার পাবে সেই পর্যন্ত যাবার সময় বা সক্ষমতা কোনটাই তাদের নেই! কাজই জীবন! কাজের মধ্যেই একসময় জীবন ফুরিয়ে আসে! কাবিন, তিন তালাক, তিনমাসের ইদ্দত এসব কোনটাই এখানে কাজ করেনা। এটা তো গেলো একটা শ্রেণির কথা।

মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারেও এখন ডিভোর্সের হার বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। বাংলাদেশে বিবাহ বিচ্ছেদের পর কাবিন বা দেনমোহর পরিশোধ করা আইনত: বাধ্যতামূলক হলেও পরিশোধের হার মোটেও সন্তোষজনক নয়। দেনমোহর বিয়ের সাথে সম্পর্কিত নারীর একটা অধিকার।

হক’ সিনেমাটি একটি সত্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মাণ করা হয়। শাহ বানো নামে এক মুসলিম মহিলা তার স্বামীর বিরূদ্ধে আইনী সংগ্রামকে উপজীব্য করে ছবির কাহিনি এগিয়ে যায়।

ঘটনাটি ১৯৭৮ সালের। ভারতের মধ্যপ্রদেশের শাহ বানোর সাথে ইন্দোরের ডাকসাইটে উকিল মোহাম্মদ আহমেদ খানের সাথে বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের নয় বছর পর পাঁচটি সন্তান রেখে উকিল সাহেব পুনরায় কমবয়সী একজনকে বিয়ে করেন। একসময় শাহ বানো এবং তার সন্তানদের দূরে সরিয়ে দেন। কিছু দিনের জন্য শাহ বানোকে ২০০(দুইশত টাকা) খোরপোশ বাবদ পাঠাতেন একসময় তাও বন্ধ করে দেন। শাহ বানো লেখাপড়া জানতেন এবং তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। অর্থ সহায়তা না পেয়ে তিনি আদালতের দারস্থ হন। ১৯৭৩ সালের ফৌজদারি কার্যবিধির সিআরপিসির ধারা ১২৫ এর অধীনে ভরনপোষণের আবেদন করেন। এই আইনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এটি একটি ধর্ম নিরপেক্ষ আইন। ধর্ম নির্বিশেষে সকল ভারতীয়দের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু মোহাম্মদ আহমেদ খান এর বিরোধিতা করেন, তিনি শরিয়া আইনের যুক্তি দেন, ইদ্দত বিচ্ছেদের তিন মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের অধীনে তার বাধ্যবাধকতা শেষ হয়ে যায়। এখন তার আর কোন ভরনপোষণ জোগানোর প্রয়োজন নেই। একজন স্থানীয় মাজিস্ট্রেট ২৫ রুপি করে ভরনপোষণের ব্যবস্থা করে দেন। পরে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট তা বাড়িয়ে ১৭৯.২০ রুপি করে দেন। কিন্তু তার উকিল স্বামী মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে যান যেন ধর্মীয় আইন তাকে কোন বাধ্যবাধকতা পালন থেকে রক্ষা করতে পারে। কিন্তু তাৎকালীন ভারতের প্রধান বিচারপতি ওয়াই ভি চন্দ্রচুড়ের নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতি ব্যাঞ্চ একটি যুগান্তকারী রায় দেন। আদালত শাহ বানোর পক্ষে রায় দেয় ধারা ১২৫ এর অধীনে, তার ভরনপোষণের অধিকারকে সমর্থন করে এবং ধর্ম নিরপেক্ষ ভারতীয় সাংবিধানিক আইনকে প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো ঐ সময়ের সরকার পার্লামেন্টে নতুন আইন করে এই আইনটি বাতিল করে দেয়। যেহেতু এই রায়ে মুসলিম সমপ্রদায় অসন্তুষ্ট ছিল কারণ শরিয়া আইনের বাইরে গিয়ে এই রায় দেওয়া হয়েছে। সেকারণে তাদের খুশি করার জন্য তৎকালীন ভারত সরকারের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এই আইনটি বাতিল করেন এবং মুসলিম ভোট নিশ্চিত করার পথ সুগম করেন। রাজনীতিবিদদের কাছে ক্ষমতার নিশ্চয়তাটাই আগে, তাই নারীর মানবিক অধিকারের চেয়ে বড় হয়ে উঠে ক্ষমতার রাজনীতি! এভাবেই পরাজিত করা হয় শাহ বানোদের। ধর্মের নামে নারীদের নির্ধারিত বলয়ের মধ্যে আটকে রাখা হয়। রাজনীতিটাই মুখ্য হয়ে উঠে যে কোন মূল্যে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপানিতে ডুবে ধান, জোঁকের ভয়ে মাঠে নামছেন না কৃষক
পরবর্তী নিবন্ধঅভিযোজন বনাম আত্মবিসর্জন-নারীর এক অদৃশ্য লড়াই