স্মরণ : আলোকিতজন আলহাজ্ব বজলুস সাত্তার

জামাল উদ্দিন বাবুল | শুক্রবার , ২১ আগস্ট, ২০২৬ at ৬:৪৬ পূর্বাহ্ণ

স্মরণের ডালা খুলে আমি আজ লিখতে বসেছি আমার পরম শ্রদ্ধাভাজন সমাজ কর্মে যিনি আমাকে মূল্যবান উপদেশ দিয়ে সংগঠন গড়তে উৎসাহ দিয়েছেন, তাঁকে নিয়ে। তিনি চিরকাল মানবতাবাদী ও অসামপ্রদায়িক চেতনার ধারক আলহাজ্ব বজলুস সাত্তার। ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর বর্তমান আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ভিংরোল গ্রামের এক প্রখ্যাত বনেদী পরিবারে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আবদুস সাত্তার ও মায়ের নাম নুরজাহান বেগম।

বৃটিশ আমলে তৎকালীন সরকার তাঁর পিতা জনাব আবদুস সাত্তারকে খাঁন বাহাদুর উপাধীতে ভুষিত করেছিলেন। চট্টগ্রামের রহমতগঞ্জ সড়কটি খাঁন বাহাদুর আবদুস সাত্তার সড়ক নামে পরিচিত। তিনি ছিলেন মার্চেন্ট কোঅপারেটিভ ব্যাংক লিমিটেড সাবেক মার্চেন্ট এমপ্লয়ীজ কোঅপারেটিভ ব্যাংক লিমিটেড চট্টগ্রাম এর লব্ধ প্রতিষ্ঠিত একমাত্র কোঅপারেটিভ ব্যাংক এর প্রতিষ্ঠাতা। ১৯০৪ সালে সমবায় আইন পাশ হলে ১৯০৫ সালে চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে সাথে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন চট্টগ্রাম আরবান কোঅপারেটিভ ব্যাংক লিঃ। এর পরপরই ১৯০৯ সালে নির্যাতিত অবহেলিত মুসলিম জনগোষ্ঠীকে স্বনির্ভরশীল করে তুলতে মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর আন্তরিক সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা করেন আন্দরকিল্লা এলাকায় ইসলামাবাদ টাউন কোঅপারেটিভ ব্যাংক। ১৯১৯ সালে বৃটিশ সরকার স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন আইন প্রবর্তন করলে খান বাহাদুর আবদুস সাত্তার চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালটির প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসুরী তাঁর সন্তান জনাব বজলুস সাত্তার ১৯২২ সালে চট্টগ্রাম সরকারী মুসলিম হাই স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ইংরেজী বৃত্তি পরীক্ষায় প্রথম হয়ে বৃত্তি লাভ করেন। ১৯২৭ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় পূর্ব বাংলা আসাম থেকে গোল্ড মেডেল লাভ করে বৃত্তিপ্রাপ্ত হন। ১২২৯ সালে আই এস সি রসায়নে ১০০ নম্বরে ১০০ পেয়ে সরকারি বৃত্তি হিসেবে ২০ টাকা এবং হাজী মহসীন বৃত্তি ১০ টাকাসহ মোট ৩০ টাকা বৃত্তি লাভ করেন। অসাধারণ মেধাবী ছাত্র হিসেবে ১৯৩৫ সালে কলিকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্স সহ স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৩৬ সালে ব্যাংকিংয়ে উচ্চতর পড়াশোনার উদ্দেশ্যে ও ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য ইংল্যান্ডে গমন করেন তবে ১৯৩৯ সনে পড়ালেখা অসমাপ্ত রেখে দেশে ফিরে আসেন। অতঃপর ১৯৪০ সালে কিছুকাল তাঁর পিতার প্রতিষ্ঠিত কলিকাতা সাত্তার ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই সনে তিনি পিপলস থিয়েটার নামে একটি বামপন্থী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন। এ সংগঠনে তাঁর সাথে আরো ছিলেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য, সংগীত বিশারদ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, আবদুল আহাদ প্রমূখ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ। ১৯৪২ সালে তিনি নীলকর বিরোধী আন্দোলন, কৃষক মুক্তি আন্দোলন, বিনা খেসারতে জমিদারি উচ্ছেদ আন্দোলন এবং নিখিল ভারত খেলাফত নন কো অপারেশন আন্দোলনের অগ্রদূত ছিলেন। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের সহযোগী হিসেবে আনসার বাহিনী গঠন করেন। ১৯৪৭ সালে তমুদ্দুন মজলিস নামে একটি সর্বজনীন ইসলামী কৃষ্টি ও সংস্কৃতি বিকাশের প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেন। রাজনৈতিক কারণে ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার কড়া নজরদারিতে ছিলেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালিদের স্বার্থ বিরোধী সকল প্রকার নিপীড়ন মূলক আইনের বিরুদ্ধে তিনি সব সময় সোচ্চার ছিলেন। ১৯৫৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল স্বাধীনতা যুদ্ধের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির একজন প্রথম সারির নেতা হিসেবে রাজনৈতিক ময়দানে সরব ছিলেন। সভা সমাবেশে ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার সারগর্ভ বক্তৃতা সবাইকে বিমোহিত করতো।

তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন সাদা মনের মানুষ, সৎ, চরিত্রবান, নির্লোভ, নিরহঙ্কারী কীর্তিমান পুরুষ এবং আপন স্বকীয়তায় সমুজ্জ্বল আপন মহিমায় মহিমান্বিত। রাজনৈতিক সচেতন বজলুস সাত্তার ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগের একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। ১৯৫৭ সালে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠিত হলে তিনি চট্টগ্রাম শহর ন্যাপের সভাপতি ও ন্যাপ জাতীয় কমিটির সহ সভাপতি নির্বাচিত হন। পাকিস্থান আমলে ১৯৭০ সালে বামপন্থী রাজনীতির কারণে বিনা বিচারে প্রথমে ৪ মাস ও পরে আরো ১ বছর জেল খাটেন। ইতিপূর্বে তিনি ১৯৬২ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ১৯৬৬ সনে নবীন মেলা প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে তিনি এবং তাঁর সহধর্মিণী মরহুমা খালেদা খানম এই সংগঠনের উপদেষ্টা হিসেবে আমৃত্যু জড়িত ছিলেন। আমি জীবনে উনাদের যে স্নেহ আদর পেয়েছি তা কখনো ভুলতে পারবো না। তাঁদের সুযোগ্য কন্যারাও প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে এখনো নবীন মেলার নানা কর্মসূচীতে নিয়মিত সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন।

ব্যক্তিগত জীবনে ২য় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তৎকালীন পূর্তমন্ত্রী শামসুদ্দিনের কন্যা খালেদা খানমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি ২ ছেলে ও ৫ কন্যা সন্তানের জনক। ওনার বড় ছেলে আকবর সাত্তার এ্যারোনেটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে লন্ডনের একটি বিখ্যাত ফার্মে কাজ করতেন এবং বড় মেয়ে ডা. আনজুমান আরা ইসলাম চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছিলেন। প্রবীণ রাজনীতিবিদ আলহাজ্ব বজলুস সাত্তার ২০০৬ সালের ৮ ডিসেম্বর শুক্রবার ৯৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। আমি মহান আল্লাহ পাকের দরবারে তাঁকে জান্নাতের শ্রেষ্ঠ মাকামে কবুল করে নেওয়ার আকুতি পেশ করছি।

লেখক: সভাপতি নবীন মেলা , চট্টগ্রাম।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপাবলিক পরীক্ষায় এফ গ্রেড তথা ফেল প্রথা বাতিল করেই গ্রেড চালু করা হোক
পরবর্তী নিবন্ধবিশ্বমানবতার মুক্তির দূত মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর জীবনাদর্শ