উত্তাল সাগর, বৈরী আবহাওয়া আর বছরের পর বছর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌপথে চলাচল–কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার মানুষের কাছে এটি ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে ‘এসটি নিঝুম দ্বীপ’ সি–ট্রাক চালু হওয়ায় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল দ্বীপবাসী। কিন্তু মাত্র চার মাসের মাথায় সেই সি–ট্রাক হাতিয়া রুটে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠতে আবারও উদ্বেগ–আতঙ্কে ডুবেছে দ্বীপের প্রায় দুই লাখ মানুষ। সামনে বর্ষা মৌসুম ও ঈদুল আজহা ঘিরে নিরাপদ যাতায়াত নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে কুতুবদিয়াজুড়ে।
কুতুবদিয়া–মগনামা নৌ–রুটে চলাচলরত ‘এসটি নিঝুম দ্বীপ’ সি–ট্রাকটি হাতিয়া রুটে সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে–এমন অভিযোগে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। তাদের দাবি, হাতিয়ার সংসদ সদস্য হান্নান মাসুদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ–পরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) এ উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, বিষয়টি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে এবং বিকল্প জলযান আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, গত ২৫ জানুয়ারি ২০২৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে কুতুবদিয়া–মগনামা নৌ–রুটে সি–ট্রাক চলাচলের উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের নৌ–উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন উপস্থিত থেকে সি–ট্রাক নিয়ে রাজনীতি না করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু মাত্র চার মাসের ব্যবধানে সি–ট্রাক সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠায় স্থানীয়দের অনেকে বলছেন, শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রভাবের বলি হতে যাচ্ছে কুতুবদিয়ার মানুষের বহু কাঙ্ক্ষিত এই নৌযান।
দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ ট্রলার ও ছোট নৌযানের ওপর নির্ভরশীল ছিল দ্বীপটির মানুষ। বর্ষা মৌসুমে উত্তাল সাগরে যাতায়াত করতে গিয়ে প্রায়ই ঘটেছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনা। এমন বাস্তবতায় ‘এসটি নিঝুম দ্বীপ’ চালু হওয়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। প্রতিদিন হাজারো যাত্রী, রোগী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও কৃষিপণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল সি–ট্রাকটি। স্থানীয়দের ভাষ্য, বড় আকারের হওয়ায় এটি ছিল তুলনামূলক নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য। সমপ্রতি বিআইডব্লিউটিসির একটি দাপ্তরিক পত্র নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। ওই নথিতে ‘যেখানে যে অবস্থায় আছে সে অবস্থায়’ ভিত্তিতে ‘এসটি নিঝুম দ্বীপ/এসটি কুতুবদিয়া’ সি–ট্রাক বিক্রির প্রক্রিয়া শুরুর উল্লেখ রয়েছে। প্রায় ৯৮ লাখ টাকা ভিত্তিমূল্যে বিক্রির উদ্যোগ এবং পাঁচ সেট দরপত্র বিক্রির তথ্যও সেখানে রয়েছে। এতে স্থানীয়দের আশঙ্কা আরও বেড়েছে। তাদের ধারণা, এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই কুতুবদিয়া থেকে সি–ট্রাক সরিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে চলাচলরত সি–ট্রাকটি হাতিয়া রুটে স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিবর্তে কুতুবদিয়ার জন্য অপেক্ষাকৃত ছোট ও পুরোনো একটি জলযান দেওয়ার আলোচনা চলছে। স্থানীয়দের মতে, এমন জলযান বর্ষার উত্তাল সমুদ্রে নিরাপদ চলাচলের জন্য উপযোগী নয়। ফলে সামনে ঈদুল আজহা ও বর্ষা মৌসুমে যাতায়াত সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে।
বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়রা সংসদ সদস্যসহ বিআইডব্লিউটিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তবে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সি–ট্রাক সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে তাদের আশঙ্কা। ক্ষোভ প্রকাশ করে কুতুবদিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আকবর খান বলেন, আমাদের কুতুবদিয়া যেন অভিভাবকহীন। আমরা কিছু পেলেও শেষ পর্যন্ত তা ধরে রাখতে পারি না।
এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক (কমার্শিয়াল) এস এম আশিকুজ্জামান বলেন, বিষয়টি আমাদের জানা আছে। টেন্ডারে ‘এসটি নিঝুম দ্বীপ/সেন্টমার্টিন’ উল্লেখ করা হয়েছে। সেন্টমার্টিন জাহাজটি আমাদের হাতে এলে তখন বর্তমান ব্যবস্থায় সমন্বয় করা হবে। নতুন জাহাজ নির্মাণাধীন রয়েছে, এক সপ্তাহের মধ্যে পাওয়ার আশা করছি।
তবে আশ্বাসের চেয়ে বাস্তবতাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন কুতুবদিয়ার মানুষ। তাদের প্রশ্ন–বর্ষার ঠিক আগমুহূর্তে নিরাপদ নৌযান সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত কেন? সমুদ্রবেষ্টিত একটি দ্বীপের মানুষের জন্য নিরাপদ যোগাযোগ কি এখনো বিলাসিতা হয়েই থাকবে?













