সাপের কামড় মানেই এক রুদ্ধশ্বাস লড়াই। একদিকে বিষে নীল শরীর, অন্যদিকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোর তাগিদ। হাসপাতাল দূরে হলে মৃত্যু প্রায় অবধারিত। এই বাস্তবতা সত্ত্বেও দেশের ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থাকে না সাপের কামড়ের প্রধান ওষুধ ‘অ্যান্টিভেনম’। বাধ্য হয়ে সাপে কাটা রোগী নিয়ে স্বজনদের ছুটতে হয় জেলা সদর বা বিভাগীয় শহরের হাসপাতালে। এতে পথেই মৃত্যু হয় অনেক রোগীর। সাপের কামড়ের ঘটনা প্রায় ৯৫% গ্রামে ঘটলেও অ্যান্টিভেনম সাধারণত উপজেলা বা জেলা শহরের সরকারি হাসপাতালে রাখা হয়। এর মূল কারণ হলো অ্যান্টিভেনম সংরক্ষণের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসকের অধীনে আইসিইউ বা জরুরি জীবন রক্ষাকারী সাপোর্ট সিস্টেমের প্রয়োজন হয়, যা সব প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থাকে না।
বাংলাদেশ ছোট দেশ হলেও এখানে বিকশিত হয়েছে ৯০ প্রজাতিরও বেশি সাপ। যাদের মধ্যে সাত থেকে আটটি সাপ অত্যন্ত বিষধর এবং মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে থাকে। বাংলাদেশে বিষধর সাপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো: রাসেলস ভাইপার (চন্দ্রবোড়া), কোবরা (গোখরা), কেউটে, এবং শঙ্খিনী। এছাড়া, পাহাড়ি বোড়া, সবুজ বোড়া, লাল–গলা ঢোঁড়া, এবং সামুদ্রিক সাপের কিছু প্রজাতিও বিষাক্ত। তাদের বিষের গঠন ভারতের সাপের চেয়ে আলাদা হওয়ায় ভারতীয় অ্যান্টিভেনম অনেক সময় কার্যকর হয় না। এই বৈজ্ঞানিক অসামঞ্জস্যই বহু মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। দেশে অ্যান্টিভেনমের উৎপাদন না থাকায় সাপের কামড়ে যেমন মানুষের মৃত্যু বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে মৃত্যু আতঙ্ক। সাপে কাটলেই অ্যান্টিভেনম দেওয়া যায় না। অ্যান্টিভেনমেরও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে। তবে বিষধর সাপ কামরেছে কি না, তা নিশ্চিত হতে বাংলাদেশে একটিও পরীক্ষা নেই। শুধু রক্ত জমাট বাঁধছে কি না, সে পরীক্ষাটি করা হয়। এক্ষেত্রে উপসর্গের ভিত্তিতে চিকিৎসককে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
সাপের ছোবলের ঘটনা বেশি ঘটে বর্ষাকালে, অর্থাৎ–জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসে। আর সাপের প্রজনন মৌসুম ‘অক্টোবর’ মাসে। দেশে এই দুই সময়ে সাপের ছোবলের ঘটনা বেড়ে যায়। আমাদের দেশে ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনমগুলো শত বছরের পুরোনো প্রযুক্তিতে তৈরি এবং দক্ষিণ ভারতের চার ধরনের সাপ থেকে সংগৃহীত বিষে তৈরি হওয়ায় সব ধরনের সাপের বিষের বিরুদ্ধে এটি কার্যকর নয়। অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের পরও ২০ থেকে ২২ শতাংশ রোগীর মৃত্যু হয়।
সাপের কামড়ের শিকার হলে রোগীকে কোনো অবস্থাতেই ওঝা বা কবিরাজের কাছে নিয়ে যাওয়া যাবে না, বরং যত দ্রুত সম্ভব সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। ওঝারা ঝাড়ফুঁক বা মন্ত্রের মাধ্যমে বিষ নামানোর যে দাবি করে, তার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সাধারণত বিষহীন সাপের কামড়ে মানুষ ওঝার কাছে গিয়ে কাকতালীয়ভাবে বেঁচে যায়, যা সাধারণ মানুষের মনে বিভ্রান্তি তৈরি করে। কিন্তু বিষধর সাপ কামড়ালে ওঝার কাছে গিয়ে সময় নষ্ট করার কারণে বিষ শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং রোগীর মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
বাংলাদেশের যে পরিস্থিতি তাতে সাপে কামড়ানো রোগীদের জন্য হাসপাতালে আলাদা কোনো ইউনিট নেই। সাধারণ ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েই তাঁদের চিকিৎসা নিতে হয়। এসব রোগীকে কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। সাপে কামড়ানোর জায়গাটি ফুলে গেল কি না, রোগীর চোখে দেখতে সমস্যা হচ্ছে কি না, ওপরের পাতা পড়ে গেছে কি না, পেটে ব্যথা হচ্ছে কি না, হাত–পা অসাড় হয়ে আসছে কি না, এমন লক্ষণ দেখে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, এটি বিষধর সাপের কামড় কি না। শরীরের যে স্থানে সাপ দংশন করেছে, সেখানে অনেকেই কেটে দেন। তারা মনে করেন, এতে বিষ বের হয়ে যাবে। এটি একেবারেই ভুল ধারণা। এতে বরং সংক্রমণসহ অন্যান্য ঝুঁকি বাড়ে। কামড় দেওয়া জায়গাটি ডাক্তারের কাছে নেওয়ার আগ পর্যন্ত জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে।
সাপে কাটার ঘটনাগুলোর প্রায় ৯৫ ভাগই গ্রামাঞ্চলে ঘটে। অথচ বেশিরভাগ অ্যান্টিভেনমই সরবরাহ করা হচ্ছে শহরের হাসপাতালে। উপজেলা ও জেলা সদরে অনেক সময় অ্যান্টিভেনম থাকলেও সেখানকার চিকিৎসকেরা জটিলতার ভয়ে তা দেন না। সাপে কাটা রোগীকে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের পর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যেমন – অনেকের তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। এমন রোগীকে সামাল দিতে আইসিইউর দরকার হয়। উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে তো সেই সুযোগ নেই, তাই সাপে কাটা রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বিগত বছরগুলোর চেয়ে এ বছর সাপের কামড়ে বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে তাই উপজেলা পর্যায়ে ডাক্তারদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং প্রতি উপজেলায় আইসিইউ স্থাপনের ব্যবস্থা করতে হবে।
লেখক : শিক্ষক, কথাসাহিত্যিক ও চিত্রনাট্যলেখক












