‘সরকারকে সময় দেওয়া যাবে না’ বলে যারা হুমকি দিচ্ছে, তারা নিজেদের স্বার্থে কথা বলছে– তুলে ধরে জনগণকে তাদের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বুধবার বিকালে মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, বিএনপি আগামী পাঁচ বছর পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করবে। জনগণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাদের দেওয়া সকল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে কাজ করবে। জনগণ বিএনপিকে টাইম দিয়েছে পাঁচ বছর। যারা বলে বিএনপি–কে সময় দেওয়া যাবে না, তারা জনগণের স্বার্থে কথা বলছে না, তারা নিজের স্বার্থে কথা বলছে। তাদের বিরুদ্ধে কী করা উচিত? তাদের বিরুদ্ধে সজাগ থাকতে হবে।
তিনি বলেন, মনে আছে তো, এখানে অনেক মুরুব্বী আছেন। মনে আছে তো একাত্তরে কী করেছিল? মনে আছে তো ৮৬ তে কী করেছিল? মনে আছে তো, এর মধ্যে এক যুগ যে আন্দোলন চলেছিল, সেই আন্দোলনের তাদেরকে কোথাও আমরা কিন্তু দেখি নাই। খবর বাসস ও বিডিনিউজের।
চার দিন আগে গত শনিবার চট্টগ্রামে এক সমাবেশে বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান রাষ্ট্র সংস্কারে গণভোটের রায় কার্যকর করার দাবি তোলেন। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ওই সমাবেশে শফিকুর রহমান বলেছিলেন, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে আপনারা অপমান অগ্রাহ্য করছেন। জনগণ বসে বসে আঙ্গুল চুষবে না। রায় দিয়েছে জনগণ, মানতে হবে সরকারকে। যে সরকার জনরায় মানে না, সে সরকার জনগণের সরকার হতে পারে না। জনরায় উপেক্ষা করে কোনো সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না বলেও হুঁশিয়ার করেন তিনি। দেশ এবং জনগণের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত মন্তব্য করে শফিকুর রহমান বলেন, আমরা চাই না একটার পর একটা গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশ এবং জনগণের ক্ষতি আপনারা করুন। আমরা পরিষ্কার বলে দিচ্ছি, আমরা দীর্ঘকাল বসে বসে আপনাদেরকে এই সুযোগ দেব না। সুযোগের সময় খুবই সীমিত। সময় ফুরিয়ে আসছে। এই সময়ের ভিতরে যদি পরিবর্তন হয়ে যান আপনাদেরকে অভিনন্দন জানাব। যদি পরিবর্তন না হন, তাহলে আপনাদেরকে আপনাদের পরিণতি গোনার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
মৌলভীবাজারের সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতার এই হুঁশিয়ারির বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অতীতে যেমন আমরা দেখেছি, বলেছিল বিএনপিকে এক মুহূর্ত শান্তিতে থাকতে দেওয়া যাবে না, আজকে আবার দেখছি বিএনপির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে যারা একত্রিত হয়ে আন্দোলন আন্দোলন খেলা খেলেছিল, বিএনপির বিরুদ্ধে একত্রিত হয়ে যারা আন্দোলন আন্দোলন ষড়যন্ত্র করেছিল গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে, মানুষের ভোটের অধিকারের বিরুদ্ধে, সেই তারা এখন আবার বলছে সরকারকে সময় দেওয়া যাবে না।
বর্তমান সরকার চার কোটি পরিবারের কাছে ফ্যামিলি কার্ড, প্রায় ৩ কোটি কৃষকের কাছে কৃষক কার্ড, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষার্থীর কাছে পোশাক, ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি তুলে ধরেন সরকারপ্রধান। বাজেট উপস্থাপনের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বাজেটে ৬০ পণ্যের ওপর থেকে কর বলতে গেলে তুলে নিয়েছে, যাতে জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা বলে সরকারকে সময় দেওয়া যাবে না, তারা কী জনগণের পক্ষে কথা বলে, না বিপক্ষে কথা বলে? বিপক্ষে কথা বলে। যারা বলে সরকারকে সময় দেওয়া যাবে না, তারা কী জনগণের স্বার্থে কথা বলে, নাকি নিজেদের স্বার্থে কথা বলছে। তারা নিজেদের স্বার্থে কথা বলছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আজকে যদি শহীদদের তালিকা বের করা হয়, দেখা যাবে যে ছাত্রটি মারা গিয়েছে ছাত্রদলের কর্মী, যে ছাত্রটি গুম হয়েছে ছাত্রদলের কর্মী, যে যুবকটি মারা গিয়েছে যুবদলের কর্মী, যে যুবকটি গুম হয়েছে যুবদলের কর্মী। যেই মানুষটি বিনা কারণে জেলে খেটেছে, খুঁজলে দেখা যাবে সে বিএনপির কর্মী। যে মানুষ মিথ্যা মামলা মাথায় করে বয়ে বেড়িয়েছে বছরের পর বছর, খোঁজ করলে দেখা যাবে শহীদ জিয়া, খালেদা জিয়ার কর্মী।
১২ ফেব্রুয়ারি এয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রতি জনগণের রায়ের কথা তুলে ধরে দলে চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, মানুষ বিএনপিকে বলেছে, তোমরা দেশকে গড়ে তোলো, মানুষ বিএনপিকে বলে দিয়েছে, আগামী পাঁচ বছর তোমাদেরকে সময় দিলাম, দেশকে ঠিক করো তোমরা। স্বৈরাচার দেশকে খালি করে রেখে চলে গিয়েছিল।
শ্রীমঙ্গল থেকে বিকেল ৩টার দিকে প্রধানমন্ত্রী পৌঁছান মৌলভীবাজারে। এই অনুষ্ঠানে জেলার প্রান্তিক নারীদের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। ১০ জন নারী সদস্যের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী কম্পিউটারে বাটন চেপে মৌলভীবাজারের ১৯ ওয়ার্ডসহ অনলাইনের মাধ্যমে আরো ২১ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় তৃতীয় পর্যায়ে নারীদের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের কর্মসূচি একযোগে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের আগে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে একটি আম ও নিম গাছের চারা এবং এর আগে শ্রীমঙ্গলে ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জাম ও কৃষচূড়া গাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। মৌলভীবাজারের অনুষ্ঠানে চা–শ্রমিকের আবাসন এবং তাদের সন্তানদের বৃত্তি প্রদানসহ দুঃস্থ–অসহায়, প্রতিবন্ধী, প্রান্তিক মানুষের মধ্যে এককালীন আর্থিক অনুদানের চেক প্রদান করেন সরকার প্রধান।
সমাজ কল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, সমাজ কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারহানা শারমিন, জাতীয় সংসদের হুইপ জিকে গউস, মৌলভীবাজার–৩ আসনের সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান এবং কেরানিগঞ্জ থেকে অনলাইনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বক্তব্য রাখেন।












