৩ নভেম্বর ২৬ আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে যা কাঙ্ক্ষিত এবং প্রত্যাশিত ছিল তাই হয়েছে। ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে, তারও আগে গাজায় গণহত্যায় ইসরাইলকে আস্কারা আর মদদ দিয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাধারণ জনগণের যে অর্থনৈতিক দুর্দশা আর মনোকষ্টের কারণ হয়েছিলেন, তার যথার্থ উত্তর ব্যালটের মাধ্যমে তারা আমেরিকানরা দিয়েছেন। ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানরা কংগ্রেস এবং সিনেট উভয় জায়গাতেই এখন ধরাশায়ী। এটি স্পষ্টতই রিপাবলিকানদের জন্য এক চরম বিপর্যয়।
কিশোর বয়স থেকে যখন আমাদের নানা নির্বাচনে প্রার্থীদের মার্কা বা প্রতীক দেখেছি, এই যেমন ছাতা, কবুতর, প্রজাপতি, বাঘ, বক, মই, হারিকেন, মশাল, জাতীয় নির্বাচনে লাঙ্গল, ধানের শীষ, নৌকা দেখে মনে তেমন কোনো ঔৎসুক্য জাগেনি। তবে আমেরিকার নির্বাচনে দুই দল ডেমোক্রেট আর রিপাবলিকানদের প্রতীক দেখে আমার প্রায়ই খটকা লাগত। এত এত মার্কা থাকতে শিক্ষাদীক্ষায় সারা পৃথিবীতে অগ্রণী আমেরিকানরা এই গাধা আর হাতির পিছনে কেন? এ বিষয়টি আমি অনেক পরে জেনেছি, আজ সুযোগ পেয়ে পাঠকদের সাথে শেয়ার করছি।
অ্যান্ড্রু জ্যাকসন, আমেরিকার সপ্তম প্রেসিডেন্ট। ১৮২৮ সালে তার নির্বাচনী প্রচারকালীন সময়ে, লোকজন তাকে জ্যাকঅ্যাস হিসাবে সম্বোধন করতে শুরু করে, জ্যাকসনের এই সম্বোধন পছন্দ হয়। এরই মাঝে এক ব্যঙ্গচিত্র আঁকিয়ে গাধার শরীরে জ্যাকসনের মাথাটি বসিয়ে দেন। এ কার্টুনও অ্যান্ড্রু জ্যাকসনকে আবিষ্ট করে। তিনি চিন্তা করেন, ঠিকই তো আছে, জনগণের জন্য গাধার মতো খাটুনি খাটা। অ্যান্ড্রু জ্যাকসন নির্বাচনে ভালোভাবেই জেতেন। মানুষ গাধা প্রতীক পছন্দ করে। আমেরিকার গৃহযুদ্ধ শেষ হলে ডেমোক্রেটরা গাধাকেই তাদের দলের নির্বাচনের প্রতীক হিসাবে গ্রহণ করে। ১৮৭৪ সালে টমাস ন্যাস্ট নামক এক ব্যঙ্গচিত্র শিল্পী হাতিকে গাধার বিপরীতে রিপাবলিকানদের প্রতীক হিসাবে এক ছবির মাধ্যমে উপস্থাপন করেন। তিনি তার আঁকা চিত্রে দেখান জঙ্গলে এক গাধা সিংহের চামড়া গায়ে জড়িয়ে জঙ্গলের পশুপাখিদের ভয় দেখিয়ে বেড়াচ্ছে, সবাই ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে কিন্তু হাতি অঞ্চল, নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছে। সেই থেকে রিপাবলিকানরা শক্তি সাহসের প্রতিভূ হাতিকে তাদের নির্বাচনী প্রতীক হিসাবে গ্রহণ করে।
গাধা আর হাতি আমেরিকার দুই প্রধান দলের প্রতীক এটিকে ছাড়িয়ে আমেরিকান নির্বাচনের প্রতি বিশ্বের সচেতন মানুষেরা উৎসাহ–উৎকণ্ঠা নিয়ে বরাবরই ফলাফল জানতে উন্মুখ থাকে। এর কারণও কমবেশি আমাদের সবার জানা। উৎসাহ থাকে আমেরিকায় ভালো লোকরা নির্বাচিত হলে বিশ্ব নিরাপদ থাকার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়, উৎকণ্ঠা আমেরিকার নির্বাচনে মন্দ লোকরা ক্ষমতাসীন হলে বিশ্বে দুর্গতি নেমে আসে। উদাহরণ হিসাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিষয় সামনে নিয়ে আসা যায়। ট্রাম্প আস্কারা না দিলে গাজায় গণহত্যা সংঘটিত হতো না, ট্রাম্প ইসরাইলের সঙ্গী না হলে ইরান আক্রান্ত হতো না। ইরান আক্রান্ত না হলে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হতো না, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির আমেরিকান সামরিক স্থাপনাসমূহ ইরানি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতো না। জ্বালানি তেলের বাজার টালমাটাল হতো না। ট্রাম্প ইসরাইলিদের লাগাম টেনে ধরলে সাধারণ আমেরিকানসহ সারা বিশ্বের মানুষকে চরম অর্থনৈতিক দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হতো না। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ক্ষমতাবলে বিশ্বব্যাপী এরকম বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারেন, এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ডঃ মহাথির মোহাম্মদ আমেরিকার ৪৪তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে যাওয়া বারাক হোসেন ওবামাকে ২০০৮ সালে একটি খোলা চিঠি লিখেছিলেন। ওবামার উদ্দেশ্যে লেখা সেই চিঠিটি ইংরেজি থেকে অনুবাদ করে ইতিপূর্বে আমি আমার দুটি লেখায় উদ্ধৃত করেছি, প্রযোজ্য মনে করে, বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা হিসাবে তার অংশবিশেষ এখানে আবারও সেটি তুলে ধরলাম। যদিও এ চিঠি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনপূর্ব সময়ে লেখা। এখন মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ। রিপাবলিকানদের ভরাডুবি ইতিমধ্যে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। তবুও আমেরিকার নির্বাচন ঘিরে বিশ্বপ্রেক্ষাপটে ডঃ মহাথির মোহাম্মদের চিঠিটির আবেদন এখনও সমানভাবে প্রযোজ্য।
“প্রিয় প্রেসিডেন্ট, আমি আপনার নির্বাচনে আপনাকে ভোট দিতে পারিনি। একজন মালয়েশিয়ান হিসাবে বিষয়টি সম্ভবও ছিল না। তবে আমি নিজেকে আপনার নির্বাচনী এলাকায় একজন ভোটার হিসাবে গণ্য করি, কারণ আপনার গৃহীত সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে আমাকে এবং আমার দেশকে সমানভাবে প্রভাবিত করবে। আমি আপনার পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতিকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। আপনার দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনেক পরিবর্তন একান্ত অপরিহার্য। কারণ আমেরিকা এবং আমেরিকানরা পৃথিবীতে বর্তমানে ঘৃণার পাত্রে পরিণত, এমনকি ইউরোপিয়ানরাও এখন আমেরিকানদের ঔদ্ধত্যকে পছন্দ করে না। পৃথিবীর অনেক দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত করার জন্য এক সময় আমেরিকানরা পৃথিবীতে সম্মানের পাত্র ছিলেন।
মানুষ নতুন বছরে নতুন কর্মযজ্ঞের শুরুতে অগ্রাধিকারভিত্তিতে একটি কর্মতালিকা প্রণয়ন করেন। নিশ্চয়ই আপনিও ইতিমধ্যে তা করেছেন। আমি সবিনয়ে আপনার পরিবর্তনের পথপরিক্রমায় অন্তর্ভুক্তির জন্য কিছু বিষয় তুলে ধরছি।
প্রথমত মানুষ হত্যা বন্ধ করুন। আমেরিকানরা তাদের অভীষ্ট হাসিলে মানুষ হত্যায় মোটেও কার্পণ্য করে না। এ হত্যাযজ্ঞকে আমেরিকানরা বলে যুদ্ধ। এ যুদ্ধ প্রচলিত যুদ্ধ নয় যাতে প্রশিক্ষিত এক যোদ্ধা আরেক যোদ্ধাকে হত্যা করে। আপনাদের বর্তমান যুদ্ধ সে রকম নয়। এখন যুদ্ধে লক্ষ নিরীহ নিরপরাধ মানুষ মারা যায়। এমনকি একটি দেশ ধ্বংসও হয়ে যায়। যুদ্ধ আদিম, সমস্যা সমাধানে গুহামানবদের পন্থা। আপনি অস্ত্র নির্মাণ এবং আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় যুদ্ধ পরিহার করুন।
দ্বিতীয়ত আপনাদের অর্থ আর অস্ত্রে ইসরাইলি হত্যাকারীদের প্রতি পক্ষপাতমূলক সমর্থন বন্ধ করুন। গাজায় আপনাদের যুদ্ধবিমান অসহায় মানবসন্তানদের নির্বিচার হত্যা করে চলেছে।
তৃতীয়ত: অর্থনৈতিক অবরোধ অনাকাঙ্ক্ষিত, এ অবরোধ যেসব দেশের উপর আরোপ করা হয় তারা তো আপনার দেশের বিরুদ্ধে প্রতিব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। আপনাদের অবরোধের কবলে খাদ্য আর ওষুধের অভাবে এক ইরাকেই ৫ লক্ষের উপর শিশু মারা গেছে, হাজারো বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হয়েছে। এ নির্মমতা থেকে ঘৃণা ছাড়া আপনারা আর কী–ইবা অর্জন করেছেন?
চতুর্থত আরও বেশি নিপুণ আরও বেশি কার্যকরভাবে মানুষ মারার অস্ত্র আবিষ্কার থেকে আপনাদের বিজ্ঞানীদের নিবৃত্ত করুন।
পঞ্চমত আপনাদের অস্ত্র প্রস্তুতকারীদের অস্ত্র তৈরি করা থেকে নিরুৎসাহিত করুন। বিশ্বব্যাপী অস্ত্র বিক্রয় এবং রপ্তানি থেকে নিবৃত্ত থাকুন। অস্ত্রের জন্য পাওয়া অর্থ গরিব মানুষকে বঞ্চিত করে দেওয়া। এ অর্থের বিনিময়ে অস্ত্র রপ্তানি একেবারে নৈতিকতাবিরোধী অধর্ম।
ষষ্ঠত পৃথিবীর সব দেশকে গণতন্ত্রের দীক্ষা দেওয়া নিষ্প্রয়োজন। গণতন্ত্র আমেরিকার জন্য যেরকম উপযোগী, অন্য অনেক দেশের জন্য হয়তো তা নাও হতে পারে। গণতন্ত্র কায়েমের জন্য মানুষ হত্যা অনুচিত। আপনারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে একনায়কদের চেয়েও বেশি মানুষ মারার জন্য দায়ী, তারপরও এ ক্ষেত্রে আপনাদের সফলতা আসেনি।
সপ্তমত ক্যাসিনোভিত্তিক অর্থনৈতিক কারবার বন্ধ করুন। অদৃশ্য অর্থের লেনদেনসহ সাধ্যের বাইরে আপনাদের ব্যাংকগুলির বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঋণ প্রদান বন্ধে অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। আপনাদের ব্যাংকগুলির উপর নজরদারি জোরদার করুন। অসাধু ব্যাংকারদের সাজা নিশ্চিত করুন।
অষ্টমত পৃথিবীর জলবায়ু রক্ষায় প্রণীত সকল আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদন করুন।
নবমত জাতিসংঘের উপর আস্থা রাখুন– একে সম্মান দেখান।
আপনি যদি আমার উত্থাপিত বিষয়গুলির কয়েকটিও বাস্তবায়ন করেন, তাতেও ইতিহাসে এক মহান প্রেসিডেন্ট হিসাবে আপনি গণ্য হবেন, আমেরিকানরা পুনরায় তাদের সম্মান ফিরে পাবে আর বিশ্বব্যাপী আমেরিকান দূতাবাসগুলি তাদের নিরাপত্তায় তোলা উঁচু কাঁটাতারের বেড়াগুলি নামিয়ে ফেলার অবকাশ পাবে।”
পুনশ্চ: আমেরিকার নির্বাচনে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়নি। সরকারি দল কোনো বিরোধী প্রার্থীকে জেলে পাঠায়নি। আমেরিকার নির্বাচনে কোনো ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয়নি। আমেরিকার নির্বাচনে ভোটারদের ভোটদানে কোনো বাধা প্রদান করা হয়নি। আমেরিকার নির্বাচনে ভোট গণনায় কোনো কারচুপি হয়নি। আমেরিকার নির্বাচনে পরাজিতরা ফলাফল অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নিয়েছেন। বিজয়ীরা পরাজিতদের কারও বাড়িতে বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বা পার্টি অফিসে অগ্নিসংযোগ করেনি।
আরও আশার কথা, টেক্সাসে জেমস টেলারিকোর মতো মননশীল, মিশিগানে আবদুল আল সাইদের মতো জ্ঞানবান আর জর্জিয়ায় জন ওসাফের মতো দূরদর্শী মানুষেরা আমেরিকার সিনেটে নির্বাচিত হয়ে এসেছেন। এরা ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে নিঃসন্দেহে অগ্রগতি আর মঙ্গলের পথে এগিয়ে নেবেন।
লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।












