‘গুমরাহ’ উপন্যাসের প্লট হচ্ছে একটি গ্রামের মসজিদ পরিচালনার আধিপত্য নিয়ে তৈরি দ্বন্দ্ব। এই উপন্যাসে লেখক সীতাকুণ্ড–মীরসরাইয়ের, ক্ষেত্রবিশেষে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার করেছেন। প্লটের সাথে এই আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহারই আমাকে এই বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিল।
ছদুরখিল গ্রামের ইতিহাস, গোড়াপত্তন, শেখ কলিমুল্লাহর পূর্বপুরুষ, বংশ এবং মোতাওয়াল্লি নির্ধারণের নিয়ম নিয়েও উপন্যাসে বিস্তারিত আলোচনা এসেছে।
সীতাকুণ্ডের পাশে খালি জায়গায় ঘর বাঁধেন শেখ ছদু, যার নামানুসারেই পরবর্তীতে গ্রামের নাম হয় ছদুরখিল। সেই ছদুরখিলে শেখ ছদুর গোড়াপত্তনের পর বংশবিস্তার এবং পরবর্তীতে চাষাবাদ ও লবণের ব্যবসার মাধ্যমে গ্রামটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় লবণ চাষের জন্য আসা শ্রমিকেরাও। তারাও থিতু হয়ে এই গ্রামে বংশবিস্তার করে, যারা দাড়ালিয়া হিসেবে পরিচিত। তাই বলা যায়, গ্রামের অধিকাংশ মানুষই লতায়–পাতায় একে অপরের সাথে সম্পর্কিত।
এই ছদুরখিল গ্রামের কলিমুল্লাহ ভুঁইয়া জামে মসজিদে গ্রামের দুটি গোত্র ‘সন্দ্বীপী’ এবং ‘দাড়ালিয়া’ দীর্ঘদিন একত্রে নামাজ পড়ে আসছে। এই দুটি গোত্রের পেছনের ইতিহাস বিস্তারিতভাবে পাঠক উপন্যাসটি পড়ার সময় জানতে পারবেন। এতটুকু বলে রাখি, এই দুটি গোত্রের পত্তনের সময়কাল সন্দ্বীপের রাজা সেবাস্টিন গনজালেসের সময় থেকে শুরু। এই ইতিহাসের সাথে আরো জানা যায় মসজিদ স্থাপনের ইতিহাসও। বর্তমানে এই মসজিদের মোতাওয়াল্লি রোকন মাস্টার। প্রায় ৩০ বছর ধরে রোকন মাস্টার এই মসজিদের মোতাওয়াল্লির দায়িত্ব বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পালন করে আসছেন। রোকন মাস্টারের বাবা জমিরুদ্দিন এই মসজিদের মোতাওয়াল্লি ছিলেন, কিন্তু স্ট্রোক করে প্যারালাইজড হওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত মোতাওয়াল্লি হন রোকন মাস্টার। সেই থেকে তিনিই মসজিদের মোতাওয়াল্লি। নতুন মোতাওয়াল্লি কে হবেন তা নিয়ে দীর্ঘ সময় কোনো বৈঠক বসে না। এই একচ্ছত্র আধিপত্যবাদই পরবর্তীতে রোকন মাস্টারকে সকলের থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ইচ্ছেমতো মসজিদ পরিচালনা, হুজুর নিয়োগ–অপসারণ, সকলের মতামতকে অগ্রাহ্য করা থেকে শুরু করে তুচ্ছতাচ্ছিল্যের মাধ্যমে দুই গোত্রের সুপ্ত বিভাজনকে জাগিয়ে তোলে। এভাবেই গ্রাম্য রাজনীতি, মানুষের সামাজিক–মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে পুরো উপন্যাসটির কাহিনী এগিয়েছে।
এটি লেখকের দ্বিতীয় উপন্যাস। প্রথম উপন্যাসের কয়েক পৃষ্ঠা রকমারিতে পড়েছি। দুই উপন্যাস যে একজনের লেখা, তা বোঝার উপায় নেই। তবে উপন্যাসের পৃষ্ঠাসংখ্যা মাত্র ১২৮ দেখে মনে হচ্ছিল কয়েক ঘণ্টার পড়া মাত্র। আমার সেই কয়েক ঘণ্টা পেরিয়েছে প্রায় দেড় দিনে। আন্ডারএস্টিমেট করলে যা হয় আর কি। লেখকের বর্ণনার ভাষাগত সৌন্দর্য চোখে পড়ার মতো। তবে বর্ণনা এত বিস্তৃত আর এত খুঁটিনাটি সংযুক্ত যে তার জন্য লেখককে সাধুবাদ জানাতে হয়, কারণ এত বিশদ বর্ণনার জন্য লেখকের কল্পনাশক্তিও অত্যন্ত গভীর হতে হয়।
তবে এই দিকের ইতিবাচক–নেতিবাচক দুই দিকই অনুভব করেছি। ইতিবাচক দিক, লেখক গ্রামীণ পরিবেশ, মানুষের পেশা, মনস্তত্ত্ব সবকিছুই সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। লেখনী চমৎকার, পড়তে পড়তে চোখের সামনে দৃশ্যগুলো ভেসে ওঠে। ডায়লগগুলোর ক্ষেত্রে পুরোপুরি আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার ছিল, যেটা উপন্যাসকে আমার জন্য ব্যাপকভাবে আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। পুরো বই শেষ করার পর মনে হয়েছে, বইটা কিনে খুবই ভালো করেছি। একদমই ভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছি, কারণ এর আগে ধর্মীয় উপাসনালয়কেন্দ্রিক রাজনীতি নিয়ে কখনো পড়া হয়নি (সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর মাজারভণ্ডামি কেন্দ্রিক উপন্যাস ‘লালসালু’ ব্যতীত)।
এবার আসি নেতিবাচক দিক নিয়ে। বিস্তারিত বর্ণনায় প্রচুর চরিত্রের আগমন ঘটছিল, তাই প্রধান চরিত্রগুলোকে খুঁজে পেতে বেগ পেতে হয়েছে। বেশ অনেকদূর যাওয়ার পর মূল চরিত্র কোনগুলো তা নিশ্চিত হতে পেরেছি। গল্পের প্রয়োজনে লেখক এতগুলো চরিত্র উপস্থিত করেছেন, কিন্তু পাঠক হিসেবে এই সম্পর্কের জট ছাড়াতে গিয়ে মাঝেমধ্যে খেই হারিয়েছি। তখন অস্থির লেগেছে। কিছু অপ্রয়োজনীয় লেজ ছাঁটাই করলে মাথার চাপটা কম লাগত। মূলত এই কারণেই উপন্যাসটি পড়তে কিছুটা সময় লেগেছে। ইতিহাস, বংশানুক্রম এসব প্রসেস করতে সময় লেগেছে। এটার কারণও অবশ্য প্রথমেই বলেছি, ১২৮ পৃষ্ঠার হালকা বই হিসেবে পড়তে বসেছিলাম। তাই হালকা বই না ধরে কিঞ্চিৎ মনোযোগ সহকারে ধীরেসুস্থে বইটি পড়লে পাঠক ভালো করবেন।
ব্যক্তিগত মতামত, আঞ্চলিক ভাষার উপন্যাস হিসেবে বাংলাসাহিত্যে বিশেষ একটি সংযোজন লেখক শোয়ায়েব মুহামদের ‘গুমরাহ’। তবে পরবর্তী মুদ্রণে কিছু বানানের ত্রুটি সংশোধন এবং আঞ্চলিক ভাষার পাশাপাশি (আহমদ ছফার ‘সূর্য তুমি সাথী’ আঞ্চলিক উপন্যাসটির মতো) ব্র্যাকেটে প্রমিত বাংলা অনুবাদ থাকলে অন্যান্য বিভাগ–অঞ্চলের মানুষের জন্য পড়ে বোঝাটা আরো সহজ হবে বলে মনে করি।












