শুক্লা ইফতেখারের দীর্ঘদিন বৃষ্টিহীন

সৌভিক চৌধুরী | শুক্রবার , ২৯ এপ্রিল, ২০২২ at ১১:১৩ পূর্বাহ্ণ

 

 

কবিতা যখন কিছু বলতে চায়, যখন এর শব্দগুলো শুধু শব্দই থাকে না, একেকটি শব্দ জীবন্ত হয়ে ওঠে, তখন তা অনুভবের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। ‘দীর্ঘদিন বৃষ্টিহীন’ কবিতা গ্রন্থটি এমনই এক অনুভুতির যূথবদ্ধ প্রকাশ যেখানে কবি শুক্লা ইফতেখার ফিরে গেছেন প্রেম এবং প্রকৃতি অনুষঙ্গতার সৌকর্যে। তিনি একজন অধ্যাপক এবং প্রায় ৪ দশক ধরে অধ্যাপনা করেছেন ইংরেজি বিষয়ে। অধ্যাপনা কাজে যুক্ত থাকায় দুই দশক তিনি কবিতাচর্চা থেকে দূরে ছিলেন। কিন্তু তারপরেও তাঁর মননে ছিল কবিতা, তিনি কবিতায় ফিরে এসেছেন, লিখছেন এবং কবিতায় বাস করেছেন। বইটিতে প্রকাশিত হয়েছে ৫৬ টি কবিতা। প্রতিটি কবিতাই বোধের জগতে বিচরণ করেছে। কবিতাগুলো হয় দু’ লাইন , নয়তো চার লাইন, এর বেশী নয়, কিন্তু অনুভুতির প্রকাশে ঋদ্ধ। সমসাময়িক অবস্থা তিনি প্রকাশ করেছেন স্বল্প শব্দের সমন্বয়ে, যেখানে রোমান্টিক অনুভূতিও কবি ধারণ করেছেন। তেমনই একটি কবিতা

তোমাকে আদিগন্ত জড়িয়ে ধরার ইচ্ছায় গুছাই আমার গহিন

অদূরে দাঁড়িয়ে ঠাট্টা করে মৃত্যুভীতি

তুমি আমার স্পর্শের গন্ধ ভুলে গেছ কি ?

জীবনের পায়ে মাথা কুটে মরি যে আমি দীর্ঘদিন বৃষ্টিহীন।’

কবিতাটির শিরোনাম ‘কোভিড দিন’। কোভিডের মহামারীতে বিচ্ছেদের সুর এসেছে কবির মধ্যে । মহামারীও প্রিয়জনের সান্নিধ্য লাভের পথকে রুদ্ধ করে দেয় । জীবন যেন খরায় আকীর্ণ, বৃষ্টিহীনতায় বিপন্ন । কবি উপলব্ধি করেছেন, বৈশ্বিক মহামারী মানুষের মাঝে এক দূরত্ব তৈরি করেছে , জীবনকে করেছে বিপন্ন। এই বিপর্যয়ের ছায়ায় স্বজনবিচ্ছেদের অপ্রত্যাশিত অবস্থা প্রতিফলিত হয়েছে কবিতাটিতে ।

কোভিড কথন’ কবিতার মূল সুরও দূরত্ব কিংবা অভাববোধ। কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির জল জমে থাকে অন্তরে আর সেই জলে অবগাহন করে প্রিয়জনের সান্নিধ্য উপভোগ করার প্রয়াস পেয়েছেন কবি ।

ইলিশ মাছের ভাজা টুকরো রাখি আমার পাতের কোলে

দেখে দেখে ভাতগুলো সাবাড় করি শুধুই ঝোলে

আধেক জীবন মায়ার পিছু, আধেক উঠলো জ্বলে ।’

এই কবিতাটির শিরোনাম ‘মায়া’। মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকি আমরা , এ আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি। একে যেমন ত্যাগ করা যায় না তেমনি মায়ার অভাব বোধ আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। ইলিশ মাছের উপমায় কবি মায়ার দর্শন প্রকাশ করেছেন কিন্তু তিনি মায়াকে জীবনের অংশ করতে চাননি। নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের প্রতি মানুষের মায়া থাকবেই, কিন্তু বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা যায় না। স্বাভাবিক জীবন যাপনে আমরা অভ্যস্ত, কিন্তু বৈষয়িক ব্যাপারে মানুষের মায়া থেকেই যায় , এ থেকে ফিরে আসা যায় না। জীবনযাপনের স্বাভাবিক আচরণের বাইরেও আমরা সহজাত মায়ার কারণে উদ্দিষ্ট বিষয়ের দিকে ধাবিত হই। এখানে তাঁর বোধের প্রকাশ পেয়েছে । ছন্দের মেলবন্ধনে কবিতাটি প্রতিভাত। তেমনি প্রতিটি কবিতাই এভাবে ছন্দের বন্ধনে আবদ্ধ।

প্রকৃতির সান্নিধ্যে যাওয়া কবির সহজাত। এ সান্নিধ্য কবির বোধকে নাড়িয়ে দেয় এ সময় তিনি হয়ে ওঠেন অনুভূতিপ্রবণ। বৃষ্টির ধারাকে যদি বলি এমনই একটি অনুভূতির উৎস, তবে বলা যায় কবি শুক্লা ইফতেখার এই অনুভূতিকে ধারণ করেছেন নিবিড়ভাবে। বৃষ্টিকে বোধের নিবিড়তায় নিয়ে লিখেছেন বেশকিছু কবিতা । তারই একটি কবিতা

বৃষ্টির শব্দের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকি

বৃষ্টিকে চোখে দেখি না।

আমার ভেতর বাহির জলে থৈ থৈ

আমি আর তাকে খুঁজি না।’

বৃষ্টি তো কবিকে আচ্ছন্ন করেছে, তাহলে কেন বৃষ্টি তাঁর অদেখা, কারণ কবির ভেতরটাই যে জলে পরিপূর্ণ তাই বৃষ্টিকে খুঁজতে যাওয়া আর হয় না। শুধুই কি তাই। বৃষ্টিকে তিনি দেখেছেন দু’ভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বৃষ্টিতে ভেজা আর বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দেয়া। এএক অনুভূতির ভিন্নতা। প্রকৃতির সাথে নিজের ভেতরের অনুভূতিকে মিলিয়ে দেয়া।

কবির গ্রন্থের নামও যেখানে ‘দীর্ঘদিন বৃষ্টিহীন’ সেখানে বৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। উপমায় দিয়েছেন প্রিয়তম’র অবগাহন।

বৃষ্টিতে ভেজা আর বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দেওয়া

দুটোর আনন্দ আলাদা

তুমি না হয় মুক্ত করলে আমাদের অবগাহনটা। ‘

নারী পুরুষের মধ্যে দেখাঅদেখার বেদনা চিরায়ত। শূন্যতা মানুষকে করে তোলে উদ্বেলিত। নৈকট্যের আকুতি প্রতিটি নারীপুরুষের মধ্যেই রয়েছে। তেমনি একটি কবিতা ‘দূর ভাবনা ’।

দুর্ভাবনায় মরি না আমি

দূর ভাবনায় মরি

সেই কবে কখন তুমি আসবে বলেছিলে

দুরাশার পাকে ঘুরি ।’

রিক্ততা প্রকাশিত হয়েছে একবিতায়, যেখানে বেদনাহত প্রতীক্ষার পালা অনিঃশেষিত। আকুতি ভরা অন্তর এক শূন্যতায় পর্যবসিত, দূরের ভাবনায় উদ্বেলিত।

শাশ্বত এবং চিরন্তন বিষয় নিয়ে ভাবেন কবি শুক্লা ইফতেখার। তাঁর এভাবনা প্রতিফলিত হয়েছে ‘অশ্রু ‘ এবং ‘মৃত্যু‘ দুটি কবিতায় । ‘অশ্রু ‘ কবিতাটি এরকম

বলো, জল থেকে অশ্রু কতদূর ?

দৃশ্যপট বদলে যেতে লাগে যতদূর ।’

কবি এখানে জল ও অশ্রুর উপমায় ঘটনার দৃশ্যপট বদলের অবস্থা ব্যক্ত করেছেন । এই জলকে আমরা স্বাভাবিক একটি সত্তা বলেই জানি । জলও কখনো দৃশ্যপটের পরিবর্তনে অশ্রু হয়ে যায়, সে হতে পারে বেদনাশ্রু কিংবা কখনো আনন্দাশ্রু । উপমার মাধ্যমে দুটো পঙক্তির বুননে অসীম অর্থের প্রকাশ দেখিয়েছেন কবি।

 

মৃত্যু’ কবিতাটি মাত্র দু’লাইনে লেখা

মৃত্যুর ছলনা কে বোঝে ?

জীবনের কোলে বসে মুচকি হাসে ।’

মৃত্যুর রহস্যময়তা আমরা অনেক সময় বুঝতে পারি না । আমাদের জীবনে এটি অবধারিত। কবির মনে এই ইহজাগতিক চেতনা নাড়া দিয়েছে যে, মানুষ যতকিছুই করুক না কেন, এই মানুষের কোলে বসেই মৃত্যু এক চেতনা জাগায়, বোঝাতে চায় মানুষের গন্তব্য কোথায়।

 

কবি শুক্লা ইফতেখার মূলত চিরন্তনী চেতনার কবি । ‘দীর্ঘদিন বৃষ্টিহীন’ কবিতাগ্রন্থে আমাদের সত্তা, সমসাময়িকতা এবং শাশ্বত চেতনার বিষয়গুলো স্বল্প পঙক্তিতে ছন্দময় ঋদ্ধতায় ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন। উপমার ব্যবহারে তিনি অত্যন্ত নিপুন এবং সুচিন্তিত। সব্যসাচী হাজরার সুদৃশ্য প্রচ্ছদে কবিতা গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে ‘বাতিঘর’ । বইটি পাঠক মহলে সমাদৃত হবে বলে আশা করা যায়।