শিক্ষা উপকরণ : কার্যকর পঠন-পাঠনের অন্যতম উপাদান

ড. শামসুদ্দীন শিশির | সোমবার , ২২ জুন, ২০২৬ at ৫:৪৭ পূর্বাহ্ণ

বিষয়বস্তুর পাঠকে সহজ, সতেজ, সজীব, আকর্ষণীয়, প্রাণবন্ত, বোধগম্য এবং দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য যেসব শিখন সামগ্রী ব্যবহৃত হয়, সেগুলোকে শিক্ষা উপকরণ বলে। যেমন: ছবি, চার্ট, মডেল, মানচিত্র ইত্যাদি।

. ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে শ্রেণিবিন্যাস

বা ইন্দ্রিয় ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষা উপকরণকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়:

. শ্রবণভিত্তিক: যেসব উপকরণ থেকে কেবল শুনে শেখা যায়। যেমন: রেডিও, অডিও রেকর্ডার ইত্যাদি।

.দর্শনভিত্তিক: যেসব উপকরণ দেখে শেখা যায়। যেমন: ছবি, ম্যাপ, চার্ট, মডেল, বাস্তব বস্তু ইত্যাদি।

. শ্রবণদর্শন ভিত্তিক: যেসব উপকরণে একই সাথে দেখা ও শোনা যায়। যেমন: টেলিভিশন, কম্পিউটার, মাল্টিমিডিয়া ভিডিও ইত্যাদি।

. প্রয়োগ বা কার্যসম্পাদনের প্রকৃতি অনুযায়ী শ্রেণিবিন্যাস

. অনুসন্ধানভিত্তিক উপকরণ : শিক্ষার্থীরা নিজে প্রশ্ন করবে, তথ্য খুঁজবে এবং গবেষণার মাধ্যমে শিখবে।

উপকরণ: ম্যাগনিফাইং গ্লাস, চুম্বক, থার্মোমিটার, মানচিত্র, গ্লোব, বৈজ্ঞানিক কিট, পরিমাপের ফিতা এবং প্রকৃতি থেকে সংগৃহীত উপাদান (পাতা, পাথর, মাটি)

. কার্যসম্পাদনভিত্তিক উপকরণ : শিক্ষার্থীরা যা শিখেছে, তা হাতেকলমে বা বাস্তব কাজের মাধ্যমে প্রদর্শন করবে।

উপকরণ: মডেল তৈরির সরঞ্জাম (কাগজ, আঠা, কাঁচি, মাটি), পোস্টার পেপার, মার্কার, অভিনয়ের পোশাক, ব্লকস, পাজল এবং ড্রয়িং বুক।

. তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক উপকরণ : ডিজিটাল মাধ্যম ও ইন্টারঅ্যাক্টিভ কন্টেন্টের মাধ্যমে আধুনিক শিখন নিশ্চিত করা।

উপকরণ: ল্যাপটপ, প্রজেক্টর, স্মার্টবোর্ড, ইন্টারনেট, শিক্ষামূলক অ্যাপস, বুক এবং ভিডিও কন্টেন্ট।

কার্যসম্পাদন: মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশন তৈরি, অনলাইন কুইজ বা সিমুলেশন সফটওয়্যার ব্যবহার।

. আর্থিক মূল্যের ভিত্তিতে শ্রেণিবিন্যাস : . উচ্চমূল্যের: এগুলো বাণিজ্যিকভাবে তৈরি এবং বাজার থেকে কিনতে হয়। যেমন: কম্পিউটার, প্রজেক্টর, গ্লোব, ইলেকট্রনিক ডিভাইস।

. স্বল্পমূল্যের: কম খরচে শিক্ষক বা শিক্ষার্থীরা স্থানীয় উপকরণ দিয়ে তৈরি করতে পারেন। যেমন: নিজ হাতে তৈরি চার্ট, পোস্টার, মার্কার, রঙ পেনসিল।

. বিনামূল্যের: প্রকৃতি বা ফেলে দেওয়া জিনিস থেকে সংগৃহীত। কোনো অর্থের প্রয়োজন হয় না। যেমন: পাথর, লতাপাতা, বীজ, পুরানো বোতল, খবরের কাগজ, পুরানো ক্যালেন্ডার ইত্যাদি।

শিক্ষকের জন্য বিশেষ নির্দেশনাবলি:

.স্থায়ী শিখন: পাঠ স্থায়ী করার জন্য শিক্ষার্থীদের লিখে শেখার অভ্যাস করাতে হবে। ২.উচ্চারণ: লেখার সময় মুখে উচ্চারণ করে লিখলে জড়তা দূর হয়। ৩.বোর্ডের ব্যবহার: বোর্ডে বড় করে লিখতে হবে যেন শেষ বেঞ্চ থেকেও স্পষ্ট দেখা যায়। লেখার সময় একপাশে দাঁড়াতে হবে যাতে বোর্ড ঢেকে না যায়। বোর্ডে লেখার সময় মুখে উচ্চারণ করতে হবে যাতে কোনো কারণে বোর্ড না দেখলেও শিক্ষকের মুখের উচ্চারণ শোনে লিখতে পারে।

পর্যবেক্ষণ: প্রতিটি শিক্ষার্থীর পাশে গিয়ে তারা সঠিকভাবে লিখছে কি না তা তদারকি করতে হবে।

মনোযোগ আকর্ষণ: একঘেয়েমি দূর করতে ছোট হাততালি বা বিভিন্ন মজাদার কৌশল ব্যবহার করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের নাম ধরে ডাকা।

সক্রিয় অংশগ্রহণ: শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে জোড়ায় কাজ বা দলীয় কাজ প্রদান করতে হবে।

সবার প্রতি লক্ষ্য রাখা: পাঠদানের সময় কেবল সামনের শিক্ষার্থীদের নয়, বরং পর্যায়ক্রমে ক্লাসের প্রতিটি শিক্ষার্থীর দিকে আলাদাভাবে নজর দিতে হবে। সেজন্য শ্রেণিকক্ষের একজায়গায় দাঁড়িয়ে না থেকে মৃদু পায়চারি করা।

শিক্ষার্থীদের দেখে শেখার উপর বেশি জোর দিতে হবে বিধায় মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টের ব্যবহার করলে শিখন স্থায়ী হবে। তাই শিক্ষকদের আই সি টি প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা আবশ্যক। সম্মানিত শিক্ষকরাও আন্তরিকতার সাথে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবেন।

লেখক: প্রাবন্ধিক, শিক্ষা গবেষক ও শিক্ষক প্রশিক্ষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধআদর্শ সমাজ বিনির্মাণে তরুণদের ভূমিকা
পরবর্তী নিবন্ধআর্থিক সমৃদ্ধির জন্য সঞ্চয়, বিনিয়োগ শিক্ষা ও পুঁজিবাজার