সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন আলাপে জানতে পারি হযরত শাহ মাওলানা সৈয়দ আহমদ সিরিকোটি (রহ.) পাকিস্তান পারিবারিকভাবে বড় জমিদার। তাদের এত বেশি সম্পদ যে, এগুলো খায় কে। আমাদের দেশে অনেকে তাদের দুর্নাম রটায়। এখানে আসেন টাকা নিয়ে যেতে। বিষয়টি নিয়ে আমার কাছে কৌতূহল জাগে। তারা বিশাল সম্পদের মালিক, জমিদার পরিবার। তার সরাসরি নাতি পীর ছাবের শাহ ঐ প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। আমিও সুন্নি মতাদর্শে বিশ্বাসী। তবে তাদের এই সিলসিলাভুক্ত নই। কিন্তু লেখালেখির জগতে আছি, সত্য প্রকাশ করা মনে হয় উত্তম হবে। যেহেতু বিভিন্ন আকিদা মতাদর্শের লোকজন পাকিস্তান থেকে তাদের এ দেশে আসা–যাওয়া নিয়ে কড়া সমালোচনা করছেন।
এই প্রসঙ্গে পেছনে তাকাতে হয়। তাঁর মহান পুত্র হযরত তৈয়ব শাহকে নিয়ে প্রায় বছর দুয়েক আগে দৈনিক আজাদীতে একাধিক প্রবন্ধ লেখা হয়েছিল। এ প্রবন্ধে উল্লেখ করা আছে, হযরত তৈয়ব শাহ স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে পুনঃ প্রথম বাংলাদেশে আসেন। আসেন ঢাকা হয়ে চট্টগ্রামে। প্রখ্যাত ঠিকাদার জাকির হোসেন কন্ট্রাকটরের খোলা জীপ ছিল। এই জীপে করে চট্টগ্রাম বিমান বন্দর থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল। জীপ চালাচ্ছিলেন দ্বিতীয় পুত্র আলহাজ্ব নুরুল ইসলাম। তখন তিনি টগবগে যুবক। সামনে তৈয়ব শাহ এর পাশে বসছিলেন নুর মুহাম্মদ আল–কাদেরী। বিমান বন্দর থেকে শহর পর্যন্ত অনেক গেইট করা হয় হযরত তৈয়ব শাহ এর সম্মানে। সামনে পাশে বসা নুর মুহাম্মদ আল–কাদেরীকে হযরত তৈয়ব শাহ বারে বারে বলছিলেন এই সব গেইট করে টাকা নষ্ট করার চেয়ে টাকাগুলো মাদ্রাসায় দান করলে কতই না উত্তম হত।
আলহাজ্ব নুরুল ইসলামের বড় ভাই বিয়ে করেন নুর মুহাম্মদ আল–কাদেরীর মেয়েকে। ভলুয়ারদীঘির পাড়ে ঐ বাড়ীর খানকায় অবস্থান নেন হযরত তৈয়ব শাহ। এখানে কদিন অবস্থানকালীন তরিকতের মুরিদও জনগণ তাকে যে হাদিয়া টাকা দিয়েছেন সেটা জমা ছিল। নুর মুহাম্মদ আল–কাদেরীর ঘরে যে টাকা রক্ষিত ছিল তা সামনে এনে দেন বিদায়ের আগে। হযরত তৈয়ব শাহ এসব টাকা বিভিন্ন মাদ্রাসায় ভাগ করে দিয়ে দেন।
হযরত তৈয়ব শাহ লোকজনকে পায়ে ধরে সালাম করতে খুবই অপছন্দ করতেন। বলতেন আগে পিতা–মাতাকে সম্মান কর তারপর অন্য কেহ। জাকের হোসেন কন্ট্রাকটরের বাড়ীতে হযরত তৈয়ব শাহকে খাবারের দাওয়াত দেয়া হয়। তার সম্মানার্থে জাকের হোসেন কন্ট্রাকটর একটি শেরওয়ানী সেলাই করে দেন। তখন নাকি হযরত তৈয়ব শাহ বলেছিলেন, তাকে শেরওয়ানী না দিয়ে টাকাটা মাদ্রাসাকে দিলে কতই না উত্তম হত।
সিরিকোটি সিলসিলার অভ্যন্তরীণ বিষয় আমার জানার কথা নয়। কিন্তু জাকের হোসেন কন্ট্রাকটরের ২য় পুত্র আলহাজ্ব নুরুল ইসলাম এবং বৃহত্তর বাকলিয়া নুর মুহাম্মদ চেয়ারম্যান থেকে কথাগুলো শুনতে শুনতে ভাবতে থাকি ভিন্ন মতাবলম্বীরা কি কি বলে, বাস্তবতা কতটুকু।
হযরত সিরিকোটি পরিবারের আরেক বৈশিষ্ট্যের কথা শুনে আরও অভিভুত হই। এই সিলসিলার লোকমুখে শুনে আসছিলাম সিরিকোট তাদের বাড়িতে কোন মেহমান গেলে কাজের লোকেরা কাজে সহযোগিতা করবে। মূল আতিথেয়তা করতে পারবে না। মূল আতিথেয়তা করবে তাহের শাহ বা ছাবের শাহ অথবা তাদের সন্তানেরা। জামেয়ার অধ্যক্ষ (অবঃ) মুফতি অছিয়র রহমান বলেন, পাকিস্তানের সিরিকোট আমাদের পীর ছাহেবের পরিবার বিশাল সম্পদের মালিক। যেমনি গমের চাষ তেমনি বাগানাদী, সিরিকোট থেকে হরীপুর পর্যন্ত বাগান আর বাগান।
আমাদের হযরত পীর ছাহেবের পরিবার নিজেরাই মেহমানদারী করেন। অধ্যক্ষ মুফতি অছিয়র রহমান আরও বলেন, হযরত তাহের শাহ যতদিন সক্ষম ছিলেন তিনি নিজেই মেহমানদারী করতেন। মেহমানের নিকট খাবার নিজেই নিয়ে আসতেন। মেহমানের সাথে বসে খেতেন, অতঃপর খাবারের বাসন, বাটি নিজে নিয়ে যেতেন।
বর্তমানে হযরত তাহের শাহ খুবই অসুস্থ। হযরত ছাহেব শাহ সিরিকোট শরীফে থাকলে একইভাবে হাতে মাথায় করে খাবার নিয়ে আসেন। খাবারের পর নিজ হাতে বাসন বাটি নিয়ে যান। মেহমান বেশি হলে হুজুর কেবলাগণের সন্তানেরা খাবার আনা নেয়াতে সহযোগিতায় তৎপর থাকেন। কাজের লোক রান্না বান্নাতে থাকবে, মেহমানদারীতে নয়।
এই প্রসঙ্গে এডভোকেট মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ার বলেন, দেশ থেকে এত কষ্ট করে যেয়ারতে সিরিকোট যাই; একদিনের চেয়ে দুই দিন থাকা আমাদের জন্য কষ্ট হয়। যেহেতু যারা আমাদের পীর বা পীরজাদা তথায় গেলে তারা আমাদের জন্য বিছানা করে দেন, নিজ হাতে খাবারের ব্যবস্থা করেন, হাতে কাঁধে করে খাবার নিয়ে আসেন। এই দৃশ্য আমাদেরকে দাহ করে।
ড. কামাল উদ্দিন আজহারী বলেন, কায়রো থেকে দেশে ফেরার পথে ২/১ দিনের জন্য পাকিস্তানের সিরিকোট যেয়ারতের উদ্দেশ্যে যাত্রাবিরতি দিই। সাথে অধ্যক্ষ জসিম উদ্দিন আজহারী।
এখানকার মেহমানের আতিথেয়তা সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। যেমন–আমরা সিরিকোট একস্থানে গমন করি। হযরত তাহের শাহ গাড়ি নিয়ে নিজে গিয়ে আমাদের জন্য বাহিরে অপেক্ষায় থাকেন।
আমরা হুজুর কেবলার ঘরে প্রবেশ করলে হযরত তাহের শাহ আমাদের বিছানা পুনঃ নিজ হাতে সাজিয়ে দেন। ওয়াশ রুম ঠিক আছে কিনা চেক করেন। হযরত তাহের শাহ অথবা তাঁর ছাহেবজাদা কাশেম শাহ নিজের হাতে কাঁধে মাথায় নিয়ে আমাদের কাছে খাবার নিয়ে আসেন। খাবার খাওয়া শেষ হলে খাবার নিজে নিয়ে যেতেন। কাজের লোকজন অন্য কাজ করবে কিন্তু মেহমানদারী করবে না।
একালে তরিকত জগতে বুঝে আসে না যে বাস্তবতা কি কতটুকু। যেহেতু দেশে ঐ পরিবেশ অনেক আগে উঠে গেছে। এখন পীর, পীরজাদারা সম্মান পেতে চায়, মূল্যায়ন পেতে চায়, আসন পেতে চায়। আর সিরিকোটি সিলসিলার লোকজন থেকে শুনতেছি তার উল্টো বা ব্যতিক্রম।
বস্তুতঃ হযরত শাহ মাওলানা সৈয়দ আহমদ সিরিকোটি (রহ.) ১৯২০ সাল থেকে ইয়াঙ্গুনের বিখ্যাত বাঙ্গালী সুন্নি জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব ছিলেন। তিনি সিরিকোট থেকে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে যাতায়াত করতেন। ইয়াঙ্গুনে তিনি তরিকতের খেদমত করতে থাকেন। এখানে দৈনিক আজাদীর প্রতিষ্ঠাতা আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ারসহ অনেকে হযরত সিরিকোটি (রহ.)’র নিকট মুরিদ হন। সেই সময় চট্টগ্রামের সাথে ইয়াঙ্গুনে সাগরপথে যাতায়াতে নিবিড় সম্পর্ক ছিল।
ইয়াঙ্গুনের প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী ছিলেন ফটিকছড়ির আবদুল বারী চৌধুরী। তারই মেয়ে বিয়ে করেন শিল্প জগতের বিখ্যাত ব্যক্তি ও মন্ত্রী এ, কে খান। এই বিয়ে হয় ইয়াঙ্গুনে বিশাল আয়োজনে। হযরত সিরিকোটি ইয়াঙ্গুন থেকে চট্টগ্রাম যাওয়া–আসাকালীন আলহাজ্ব আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ারের আতিথেয়তা গ্রহণ ও তরিকতের খেদমত করে যান। কোহিনুর ইলেকট্রিক প্রেসের উপরের তলায় অবস্থান নিতেন।
তিনি ১৯৩৬ সাল থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ব্যাপক সফর করেন তরিকতের খেদমতে। ১৯৪০ এর দশকে চট্টগ্রামে মুরিদদের সাথে নিয়ে স্থায়ীভাবে ইয়াঙ্গুন ত্যাগ করেন। সেই হতে সিরিকোট থেকে নিয়মিত চট্টগ্রাম সফর করতে থাকেন।
হযরত সিরিকোটি (রহ.) ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা ও চট্টগ্রামে আসা–যাওয়া করেন। ১৯৪৫ ও ১৯৪৮ সালে হজব্রত পালন করেন। ১৯৬১ সালে হযরত শাহ মাওলানা সৈয়দ আহমদ সিরিকোটি (রহ.) ইন্তেকাল করেন। এতে তরিকতের হাল ধরেন তারই মহান পুত্র হযরত তৈয়ব শাহ (রহ.)। তাঁর নির্দেশে ১৯৭৪ সালে ১২ রবিউল আউয়াল মাসে প্রথম চট্টগ্রামে জুলুসের আয়োজন করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৮০ সাল থেকে ৯ রবিউল আউয়াল ঢাকায় এবং ১২ রবিউল আউয়াল চট্টগ্রামে জশনে জুলুস ঈদে মিলাদুন্নবী আয়োজিত হয়ে আসছে।
হযরত তৈয়ব শাহ বাংলাদেশে সর্বশেষ সফর করেন ১৯৮৬ সালে। হযরত তৈয়ব শাহ ১৯১৬ সালে পাকিস্তানে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৯৩ সালের ৭ জুন সোমবার ৭৭ বছর বয়সে পাকিস্তানে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মহান দুই পুত্র পীর তাহের শাহ, পীর ছাবের শাহ।
বস্তুত হযরত শাহ মাওলানা সৈয়দ আহমদ সিরিকোটি (রহ.) কাদেরিয়া তরিকায় অতীব আশেক হয়ে সুন্নি আকিদা পোষণ করেন। চট্টগ্রাম অঞ্চলে ষোলশহর জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা, সংলগ্ন মহিলা মাদ্রাসা ও ঢাকা মোহাম্মদপুর কাদেরিয়া কামিল মাদ্রাসায় হাজার হাজার ছাত্র–ছাত্রী অধ্যয়নরত। সাথে চন্দ্রঘোনা, হালিশহর অন্যান্য স্থানে তাদের প্রতিষ্ঠানাদি রয়েছে। এতে বুঝা যায় তারা বিভিন্নভাবে দ্বীনের খেদমত করছেন।
অপরদিকে ১৯৬০ এর দশকে ছাত্র জীবনে গারাংগিয়া হযরত বড় হুজুর কেবলার নিকট মুরিদ হওয়ার সৌভাগ্য হয় আমার। আমার পীর ছাহেবের ইন্তেকালের দীর্ঘ ২৫ বছর পর ৪৩২ পৃষ্ঠাব্যাপী তাঁর জীবনীগ্রন্থ লেখার সৌভাগ্য হয়। এতে উল্লেখ করি সাবেক অধ্যক্ষ ও জমিয়তুল ফালাহ এর খতিব মাওলানা জালাল উদ্দিন আল–কাদেরী, হাটহাজারী শেরে বাংলা আজিজুল হক (রহ.), শত বছর হায়াতপ্রাপ্ত আল্লামা নুরুল ইসলাম হাশেমীর সাথে গারাংগিয়া হযরত বড় হুজুরের নিবিড় সম্পর্ক ছিল। আগেকার আমলে প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথির সিস্টেম ছিল না। সভাপতি অতঃপর ওয়ায়েজ এ রকম রেওয়াজ ছিল। গারাংগিয়া হযরত বড় হুজুর কেবলা সভাপতি উনারা ৩ জন ওয়ায়েজ ছিলেন।
বস্তুত গারাংগিয়া, চুনতী, হালিশহরসহ বৃহত্তর চট্টগ্রামে আজমগড়ী সিলসিলার বিশালত্ব রয়েছে। আমরা আজমগড়ী সিলসিলা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত। আমরাও সুন্নি মতাদর্শী। মাত্র ১৫/২০ বছরের ব্যবধানে স্মার্টফোন মোবাইল তাসাউফ তরিকত ও আমাদের হানাফী মাজহাবকে ম্লান করে দিচ্ছে। আহলে হাদীসের যে হারে প্রচারণা বাড়ছে, জানি না তাসাউফ ও মাজহাবের অবস্থা কি এসে দাঁড়ায়। বিষয়টি নিয়ে ভাববার সময় এসে গেছে মনে করি।
লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, কলামিস্ট।












