শামসুর রাহমান

বিস্ময়কর কাব্যপ্রতিভা

মুহাম্মদ ইয়াকুব

শুক্রবার , ২৩ আগস্ট, ২০১৯ at ৫:১৫ পূর্বাহ্ণ
1175

কবি শামসুর রাহমান (২৩ অক্টোবর ১৯২৯ – ১৭ আগস্ট ২০০৬) আধুনিক বাংলা কবিতার একটি অপরিহার্য নাম। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে কেউ চেষ্টা করলেও শামসুর রাহমানের নাম বাদ দিতে পারবে না। ত্রিশের কবি স্বভাবের বিপরীতে এসে পঞ্চাশের দশকে যে কয়জন কবি বাংলা কবিতায় বাঁক পরিবর্তনের মিছিলে অগ্রগণ্য ছিলেন, শামসুর রাহমান তাদের মধ্যে অন্যতম এবং অগ্রজপ্রতীম। তিনি বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে নিজস্ব ফ্রেমে বেশ দক্ষতার সাথে সাজিয়েছেন। নগরের অলিগলি ঘুরে নাগরিক জীবনের সুখ-দুঃখ তিনি একনিষ্ঠতার সাথে কবিতায় এঁকেছেন। কবিতার পাশাপাশি উপন্যাস, প্রবন্ধ, আত্মজীবনীমূলক রচনা, অনুবাদ সাহিত্য এবং শিশু সাহিত্যেও তিনি মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন।
কবির মৃতদেহ ঠাণ্ডা হয়ে পড়ে থাকবে শহরের কোন নর্দমা ড্রেনে। কিন্তু আশাবাদী কবি ‘শান্ত রূপালী স্বর্গ শিশিরে’ স্নান করার কল্পনায় রত থাকেন। নাগরিক কবি শামসুর রাহমান নগরের চিরায়িত চিত্র এবং তাঁর কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন সাবলীলভাবে তাঁর কবিতায় প্রকাশ করেছেন, ‘হয়তো কখনো আমার ঠাণ্ডা মৃতদেহ ফের খুঁজে পাবে কেউ/শহরের কোনো নর্দমাতেই; – সেখানে নোংরা পিছল জলের/অগুনতি ঢেউ/খাবো কিছুকাল! যদিও আমার দরজার কোণে অনেক বেনামি/প্রেত ঠোঁট চাটে সন্ধ্যায়, তবু শান্ত রূপালি স্বর্গ-শিশিরে স্নান করি আমি’ (প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে – রুপাসি স্নান)। ‘রূপালি স্নান’ শিরোনামের এই কবিতাটিকে বলা হয় শামসুর রাহমানের আগমনী কবিতা। কবিতাটি বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত বিখ্যাত ‘কবিতা’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলো। এই কবিতার পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে তাঁর স্বকীয়তা ও নিজস্বতার অনন্য নির্দেশাবলী।
মানুষের যাপিত জীবনের বাস্তবতা কবিতায় আঁকাই একজন কবির প্রধান কাজ। কবি শামসুর রাহমান এক্ষেত্রে কোন কসুর করেননি। বিশেষ করে যখন অন্যের কথা কবি নিজের কাব্যভাষ্যে বয়ান করেন, তখন বর্ণনার ক্ষমতা দেখেই বুঝা যায় কবির কবিত্বশক্তির পরিমাণ। তিনজন কবর খননকারী ব্যক্তি কবর খোঁড়তে খোঁড়তে যে আলাপচারিতা করছে, তা তিনি শৈল্পীকভাবে উপস্থাপন করেছেন তাঁর ‘কবর খোঁড়ার গান’ কবিতায়। মরার পর মানুষের কোন মৌলিক পার্থক্য থাকে না। আমির – ফকির সব একাকার হয়ে যায়। কবি গোরখোদকদের মুখের কথা নিজের ভাষায় প্রকাশ করেছেন, ‘করোনা বেয়াদবি বান্দা তুমি/বাদশা নেই কেউ, গোলাম সব/বেগম চায় পেতে বাঁদির সুখ/আউড়ে গেছে কতো সত্যপীর’ (প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে – কবর খোঁড়ার গান)। বাঙালি জাতির উত্থান পতনের প্রতিটি সময়কে শামসুর রাহমান তাঁর কবিতায় ধারণ করেছেন। সঙ্গত কারণেই বাংলা কবিতার রাজা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাদ যাবার কথা নয়। তিনিই তো আমাদের সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের সাথে পরিচয় করিয়েছেন, ‘প্রতীকের মুক্ত পথে হেঁটে গেছি আনন্দের/মাঠে আর ছড়িয়ে পড়েছি বিশ্বে তোমারই সাহসে’ (রৌদ্র করোটিতে – রবীন্দ্রনাথের প্রতি)। কবি শামসুর রাহমান তাঁর অজস্র সৃষ্টিকর্মে কখনো আত্মতৃপ্তির ঢেকুর গিলেননি। তিনি ছিলেন সর্বদা সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কাঁপা, নতুন সৃষ্টিতে মুখর। প্রতি মুহূর্তে নূতন নূতন সৃষ্টির নেশা তাকে ব্যাকুল করে রাখতো, ‘প্রভু, শোনো, এই অধমকে যদি ধরাধামে পাঠালেই/তবে কেন হায় করলে না তুমি তোতাপাখি আমাকেই’ (বিধ্বস্ত নীলিমা-প্রভুকে)।
বাঙালির সকল গণতান্ত্রিক সংগ্রামে কবি ছিলেন সরব প্রতিবাদী। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে জনতাকে শামিল হবার উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে কবির টগবগে সাহসী উচ্চারণ, ‘জীবন মানেই/তালে তালে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মিছিলে চলা, নিশান ওড়ানো/অন্যায়ের প্রতিবাদে শূন্যে মুঠি তোলা’ (নিজ বাসভূমে – ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯)। একই কবিতায় ১৯৫২ সালের ভাষাশহীদ সালাম, জাব্বার, রফিক, বরকতের প্রসং্‌গ উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘তাই বুঝি ঊনিশশো ঊনসত্তরেও/আবার সালাম নামে রাজপথে, শূন্যে তোলে ফ্লাগ/বরকত বুক পাতে ঘাতকের থাবার সম্মুখে/সালামের বুক আজ উন্মথিত মেঘনা/সালামের চোখ আজ আলোকিত ঢাকা/সালামের মুখ আজ তরুণ শ্যামল পূর্ব বাংলা’ (নিজ বাসভূমে – ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯)। ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি নির্মাণের জন্য বাঙালির সংগ্রামের ইতিহাস অনেক পুরানো। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সংগ্রামে বারবার বাঙালির রক্তে সিক্ত হয়েছে এদেশের পবিত্র ভূমি, জীবন উৎসর্গ করেছেন অজস্র সোনার সন্তান, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা/তোমাকে পাওয়ার জন্য/আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায় /আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন’ (বন্দী শিবির থেকে – তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা)। মহান মুক্তিযুদ্ধে আমরা হারিয়েছি ত্রিশ লক্ষ বাঙালি। পাকিস্তানি হানাদাররা এই সবুজ-শ্যামল পবিত্র ভূমিটাকে বধ্যভূমিতে পরিণত করেছিলো। এদেশ যেন মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছিলো। সর্বসাধারণের বাঁচার সকল পথ রুদ্ধ করা হয়েছিলো। পশ্চিম পাকিস্তান হতে জাহাজ বোঝাই করে আসছিলো মারণাস্ত্র, ‘আমাদের মৃত্যু আসে প্লেনে চেপে জাহাজ বোঝাই করে’ (বন্দী শিবির থেকে – আমাদের মৃত্যু আসে)। কবিরা সর্বকালে অবহেলিত থাকেন। স্বৈরাচার এরশাদ সরকার কবিকে সম্পাদনার চাকরি ছাড়তে বাধ্য করেছিলো। কবি দুঃখবিলাসী চাদরে আবৃত হয়ে আক্ষেপ করছেন, ‘কবিকে দিও না দুঃখ, দুঃখ দিলে সে-ও জলে স্থলে/হাওয়ায় হাওয়ায়/নীলিমায় গেঁথে দেবে দুঃখের অক্ষর।’ (আমি অনাহারী – কবিকে দিও না দুঃখ)।
বর্তমান পৃথিবীতে মানুষ খুঁজে পাওয়াটা দুষ্কর। বর্ণবাদ, উগ্রবাদ, সাম্প্রদায়িকতায় ছেয়ে গেছে বসুন্দরা। কবি শামসুর রাহমান সমগ্র জীবন স্বপ্ন দেখেছেন একটি মানুষের বসবাসযোগ্য মানবতাবাদী পৃথিবী। কবিরা তো স্বপ্নকাতুরে, স্বপ্ন দেখবেনই। কবি পাঁচজন পথচারীর কাল্পনিক কথোপকথন ‘পান্থজল’ কবিতায় মালাবদ্ধ করেছেন ; হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমান আর পঞ্চমজন মানবতাবাদী। একে এক সবাই যখন নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে স্বীয় ধর্মের পরিচয়ে, তখন পঞ্চমজন পরিচয় দিলেন, ‘পঞ্চম পথিক খুব কৌতূহলবশে/কুড়িয়ে পতঙ্গ এক বলে স্মিত স্বরে,’আমি মানবসন্তান’ (এক ফোঁটা কেমন অনল – পান্থজন)। কবি শামসুর রাহমান তাঁর সৃষ্টিগুণে বাংলা সাহিত্যের একটি অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছেন। তাঁর বিস্ময়কর কাব্যশক্তি সমগ্র বাংলা সাহিত্যেই হাতে গুণা মাত্র কয়েকজনের ছিলো। কবি শামসুর রাহমান এ জাতির ভালোবাসার মিনার হিসেবে শির উঁচু করে থাকবেন অনন্তকাল।

x