শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি

নানা আয়োজনে তিন পার্বত্য জেলায় ২৫ বছর উদযাপন

আজাদী ডেস্ক | শনিবার , ৩ ডিসেম্বর, ২০২২ at ৯:১৩ পূর্বাহ্ণ

গতকাল ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির ২৫ বছর উদযাপন করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। নানা আয়োজনে এ বছর তিন পার্বত্য জেলায় দিবসটি উদযাপন করা হয়। শান্তি চুক্তির ফলে উন্নয়ন আর অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে বক্তারা স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানান। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, অনতিবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নে রোডম্যাপ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। গতকাল সকালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি উপলক্ষে খাগড়াছড়ির মহালছড়ির করল্যাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত সমাবেশে দলের শীর্ষ নেতারা এ দাবি করেন।

দলের কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক সম্পাদক সুদর্শন চাকমা বলেন, আমাদের বক্তব্য হচ্ছে চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। আজকে আমরা প্রতিবাদের সাথেই চুক্তির বর্ষ পূর্তি উদযাপন করতে যাচ্ছি। ২৫ বছরেও সরকার পার্বত্য চুক্তি অবাস্তবায়িত অবস্থায় ফেলে রেখেছে। যেটা অত্যন্ত দুঃখজনক। পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে চুক্তি বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ এই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা হোক। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক বিমল কান্তি চাকমা বলেন, ‘চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো সমাধান করতে হবে। ভূমি সমস্যার স্থায়ী সমাধান হলে পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।’

সমাবেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার সম্পাদকসুধাকর ত্রিপুরা তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের দুর্নীতি ও নির্বাচন না হওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন জেএসএস’র কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক প্রণব চাকমা, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ পিসিপির কেন্দ্রীয় সভাপতি সুজন চাকমা, কেন্দ্রীয় যুব সমিতির সভাপতি জ্ঞান চাকমা প্রমুখ। এছাড়া নানা আয়োজনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২৫ বছর উদযাপন করেছে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ। সকালে শান্তি চুক্তির বর্ণিল শোভাযাত্রা বের করে খাগড়াছড়ি রিজিয়ন ও জেলা পরিষদ। শহরের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে শোভাযাত্রা টাউন হল প্রাঙ্গণে শেষ হয়। সেখানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিল্পীরা নৃত্য পরিবেশন করেন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, খাগড়াছড়ির রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আব্দুল বাতেন, খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার নাইমুল হক প্রমুখ। সভায় সভাপতিত্ব করেন খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মংসুইপ্রু চৌধুরী অপু। এ সময় বক্তারা বলেন, শান্তি চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ের সংঘাতময় পরিস্থিতির নিরসন হয়েছে।

আমাদের রাঙামাটি প্রতিনিধি জানান, গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাঙামাটির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির মাঠে রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ শান্তি চুক্তির বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এতে সভাপতির বক্তব্যে পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অং সুই প্রু চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শান্তি চুক্তি সম্পাদন করে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষকে অনেক ভালো রেখেছেন। আমরা শিক্ষায় এগিয়েছি। পাহাড়ে শিক্ষার হার জাতীয় হারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। স্বাস্থ্য সেবা আজকে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি দীপংকর তালুকদার এমপি। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন রাঙামাটি রিজিয়নের রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমতাজ উদ্দিন, রাঙামাটি বিজিবি’র সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তরিকুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মীর আবু তৌহিদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী মুছা মাতব্বর।

সভায় পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অংসুই প্রু চৌধুরী বলেন, শান্তি চুক্তির কারণে আমরা পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি। আমরা উন্নয়ন পেয়েছি। আমরা আজ অনেক দূর এগিয়ে গেছি। পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আরো বলেন, মেডিকেল কলেজ, প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় করা হয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন করা হয়েছে। এরপরেও কেন এত গোলাগুলি সেই প্রশ্ন যদি করা হয় তাহলে আপনারা কি জবাব দিবেন। জনসংহতি সমিতি, রাঙামাটি জেলা কমিটি : পাহাড়ি জনগণ দেশের কোনো ক্ষতি করবে না বলে মন্তব্য করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহসভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ঊষাতর তালুকদার।রাঙামাটিতে পার্বত্য শান্তি চুক্তির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি রাঙামাটি জেলা কমিটির আয়োজনে গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। গতকাল শুক্রবার সকালে দিবসটি উপলক্ষ্যে কুমার সুমিত রায় জিমনেসিয়াম প্রাঙ্গণে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ঊষাতন তালুকদার বলেন, রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিক ভাবে সমাধান করতে হবে। জোর করে অস্ত্র দিয়ে এসব সমস্যার সমাধান করা যাবে না।

সংগঠনটির জেলা সভাপতি গঙ্গা মানিক চাকমার সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম আদিবাসী ফোরামের সভাপতি প্রকৃত রঞ্জন চাকমা, এমএন লারমা মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের সভাপতি বিজয় কেতন চাকমা, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম, সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের সহসভাপতি ভবতোষ দেওয়ান ও পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মণি চাকমা প্রমুখ।

আমাদের বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, নানা আয়োজনে বান্দরবানে পার্বত্য শান্তি চুক্তির ২৫তম বর্ষ পূর্তি উদযাপন করা হয়েছে। ‘সমপ্রীতির বন্ধন অটুট রাখি সমৃদ্ধ বান্দরবান গড়ি’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে গতকাল সকালে বান্দরবানে জেলা প্রশাসন চত্বর থেকে একটি শোভাযাত্রা বের করা হয়।

শোভাযাত্রাটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। শোভাযাত্রায় মারমা, চাকমা, বম, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, খুমীসহ পাহাড়ের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নারীপুরুষ অংশ নেন। এদিকে স্থানীয় রাজার মাঠে সেনাবাহিনীর বান্দরবান জোনের উদ্যোগে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও গরীব অসহায়দের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়। পরে অরুনসার্কি টাউন হল মিলনায়তনে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন বান্দরবান ৬৯ সেনা রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জিয়াউল হক।