শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের ভাবনা

ড. মো: সেকান্দর চৌধুরী

শনিবার , ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ at ৪:১৪ পূর্বাহ্ণ

আজ শোকাবহ ১৪ ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এ জাতির মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় যখন সুনিশ্চিত তখন বাঙালি বুদ্ধিজীবী নিধনের মাধ্যমে বিশ্ব ইতিহাসে ঘটে নৃশংসতম, বর্বরোচিত ও কাপুরুষতম হত্যাযজ্ঞ। ঐ দিন শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, আইনজীবী, শিল্পী, দার্শনিক ও রাজনৈতিক চিন্তকগণ এই সুপরিকল্পিত নিধনযঞ্জের শিকার হন। বাংলাদেশের মানুষকে মেধাশূন্য রাখার জন্য পরাজয়ের পূর্ব মুহূর্তে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের নিশ্চিহ্ন করার নীল নকশা (পোড়া মাটি নীতি) প্রণয়ন করেন পূর্ব বাংলার গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। পাক সামরিক জান্তাদের কাছ থেকে অস্ত্র সাহায্য লাভ করে তাদেরই ছত্রছায়ায় এদেশীয় দালাল ও মানবতার শত্রু আধা-সামরিক বাহিনী, আল-বদরের সশস্ত্র ক্যাডাররা এই হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করে। অবশ্য ১৯৭১ এর স্বাধীনতার উষালগ্নে ২৫ মার্চ কালো রাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদাররা নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের উপর। আর মাত্র এক দিন পর বাঙালি জাতি আমাদের বিজয় ও গৌরবের আটচল্লিশ বছর পূর্তি উৎসব পালন করবে। তার আগে যথাযথ মর্যাদায় স্বাধীনতা যুদ্ধে এই বুদ্ধিজীবীদের অবদানের কথা স্মরণ করতে হয়। বাঙালির কাঙ্ক্ষিত বিজয়ের ঊষালগ্নে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের কেন হত্যা করা হলো সে বিষয়ে কিছু আলোকপাত করা প্রয়োজন বলে মনে করি। বুদ্ধিজীবী বলতে সাধারণত সামাজিক ও রাষ্ট্রিক সঙ্কটকালে বৌদ্ধিক পরামর্শ দানের মাধ্যমে যথার্থ দিক নির্দেশনাকারী পণ্ডিতদের বোঝায়। অভিধানে বুদ্ধিজীবী ও বিদ্যৎ সমাজকে অনেকাংশে এক করে বোঝানো হয়েছে।The class consisting of the educated portion of the populalion as regarded as capable of forming public opinion. অর্থাৎ বুদ্ধিজীবী এমন একটি সম্প্রদায় যা জনসংখ্যার শিক্ষিত অংশ দ্বারা গঠিত হয় এবং যারা জনমত গঠনে সক্ষম। এও মনে করা হয় যে, বু্‌দ্িধজীবী সম্প্রদায় সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনে জনমত, রাজনীতি, ও মূল্যবোধকে প্রভাবিত করতে পারেন। প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক সময় পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে নানাভাবে বুদ্ধিজীবীদের আবির্ভাব ঘটে। সক্রেটিস, এরিস্টটল, প্লেটো ও কৌটিল্য ১৭৮৯ ফরাসি বিপ্লবেই বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের ভূমিকা লক্ষ করা যায়। এই বিপ্লবেই রুশো, ভলতেয়ার, মন্টেস্কু ও দিদেরো প্রমুখ বুদ্ধিজীবীরা অসামান্য অবদান রাখেন। ১৯১৭ সালে সংঘটিত রুশ বিপ্লবে এঞ্জেলস, তলস্তয় প্রমুখ বুদ্ধিজীবী/চিন্তাবিদগণ অনবদ্য ভূমিকা রেখেছেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের প্রভাব তো আছেই। ১৯২০ এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক সাহিত্য সমাজ গঠন করে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্প্রদায় বিকাশের জন্য ‘বুদ্ধির মুক্তি’Emancipation of the intellect প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৫২ সালের মাতৃভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটেও ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এবং এদেশের ছাত্র শিক্ষক বুদ্ধিজীবীরা ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ফরাসি বিপ্লবের মহানায়ক নেপোলিয়ন এবং রুশ বিপ্লবের মহানায়ক হলেন লেনিন, কিন্তু তাদের এই বিপ্লবকে সফলতা দানে উপর্যুক্ত বুদ্ধিজীবীরা অনবদ্য অবদান রাখেন। জাতীয় সংগ্রাম ও বিপ্লবের ইতিহাসে মহানায়ক ও জাতীয় নেতারাই বেশি ভূমিকা রাখে। আমাদের দেশের জাতীয় স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামে বাঙালি জাতির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতার সোপানে সমাজে জনমত ও রাজনৈতিক মূল্যবোধ তৈরি করতে ভূমিকা রেখেছেন- মুনির চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার, জহির রায়হান, মাহবুব উল আলম চৌধুরী ও আব্দুল গাফ্‌ফার চৌধুরী প্রমুখ লেখক নেতা বুদ্ধিজীবীরা। মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে বীর সেনানিরা হাতে সমরাস্ত্র নিয়ে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন আর লেখক-বুদ্ধিজীবীরা অস্ত্র হিসেবে কলম, বক্তব্য ও বাণীকে ব্যবহার করেছেন। অতএব, জাতীয় স্বাধীনতা বিজয়ের স্মারণী হিসেবে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানিদের কাতারে বুদ্ধিজীবীদের অবদানের কথা জাতির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকে। বুদ্ধিজীবীরা সম্মুখ সমরের যোদ্ধা না হয়েও কেন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা, আল-বদর হায়নাদের রোষানলের শিকার? বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে জনসচেতনার পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক চরিত্র বিরাজ করে। বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ ও বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে বুদ্ধিজীবীরা ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। বুদ্ধিজীবীদের সাংস্কৃতিক চরিত্রও সাম্প্রদায়িক মনোভাব মৌলবাদীদের মূল টার্গেটে পরিণত হয়। পাকিস্তানি জান্তাদের উদ্দেশ্য ছিল বুদ্ধি বৃত্তিক চর্চাকে দুর্বল করে বাঙালি জাতিকে মেধাহীন জাতিতে পরিণত করা এবং সে উদ্দেশ্য সফল করাই ছিল এই সমস্ত হত্যাযঞ্জের মূল পরিকল্পনা। কারণ মৌলবাদীরা মুক্ত-চিন্তা ও অসাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ করতে চায়। মধ্যযুগীয় যুদ্ধ ইতিহাসে ‘পোড়া মাটি নীতি’ কৌশল হলো শত্রুপক্ষের রসদ ধ্বংস করার জন্য পশ্চাদপদ পরাজিত বাহিনীর সম্মুখে সকল রসদ জ্বালিয়ে দেয়া। ’৭১-এর পরাজিত শত্রুরা অনেকটা পোড়া মাটির নীতির ন্যায় জাতিকে মেধাশূন্য করে দিতে শ্রেষ্ঠ সন্তানদেরকে বেছে বেছে হত্যা করে। আপাতদৃষ্টিতে বাঙালি জাতি তার শ্রেষ্ঠ সন্তান, বুদ্ধিজীবীদের হারালেও বিজয়ের ৪৮ বছরে এই জাতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। একদিকে স্বাধীনতার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় অনেকাংশে সফল হয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে দেশ মধ্য আয়ের দিকে এগুচ্ছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী এদেশের রাজাকার, হানাদার, যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানের ট্রাইব্যুনাল গঠন করে যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও রায় কার্যকর করা হচ্ছে। তবে এখনো, জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদীরা চক্রান্তে সক্রিয়। নানা কৌশলে তারা মুক্তিযুদ্ধের অর্জনসমূহ ধ্বংস করতে চায়। এক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে সজাগ থাকতে হবে এবং মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগকারী বুদ্ধিজীবীদের অবদানকে স্মরণীয় করতে হলে সর্বত্র মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তখনি হয়তো শহিদদের রক্তের ঋণের শোধ হতে পারে।
লেখক: ডিন, কলা ও মানববিদ্যা অনুষদ এবং অধ্যাপক,
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

x