শহীদ জননী জাহানারা ইমাম

কাজী রুনু বিলকিস

শনিবার , ২৯ জুন, ২০১৯ at ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ
39

রুমি বলে, ‘আম্মা দেশে এই রকম অবস্থায় তুমি যদি আমাকে জোর করে আমেরিকায় পাঠিয়ে দাও, আমি হয়তো যাব শেষ পর্যন্ত আমার বিবেক চিরকালের মত অপরাধী করে রাখবে আমাকে। আমেরিকা থেকে হয়তো বড় ডিগ্রি নিয়ে এসে বড় ইঞ্জিনিয়ার হব কিন্তু বিবেকের ভ্রুকুটির সামনে কোনদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না তুমি কি তাই চাও আম্মা? জাহানারা ইমাম দুই চোখ বন্ধ করে বললেন, না তা চাইনে। ঠিক আছে তোর কথাই মেনে নিলাম। দিলাম তোকে দেশের জন্য কোরবানী করে। যা তুই যুদ্ধে যা। এভারে মায়ের কাছ থেকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি আদায় করেছিলেন জাহানারা ইমামের বড় ছেলে রুমী। সে সময় আমেরিকান স্কলারশিপ নিয়ে রুমির ইলিনর ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে অধ্যয়ন করার কথা। সে সুযোগকে পায়ে দলে মুক্তিযুদ্ধকে বেছে নিয়েছিলেন। রুনী গেরিলা যুদ্ধের পথিকৃৎ ক্র্যাচ প্লাটুন এর অন্যতম সদস্য শহীদ শফি ইমাম রুমী। দেশের জন্য উৎসর্গ করা তাঁর বড় সন্তান শহীদ হওয়ার পর তিনি হয়ে উঠেন মুক্তিকামী মানুষের কাছে শহীদ জননী। জাহানারা ইমাম শুধু তার সন্তানকে হারান নি হারিয়েছেন তাঁর স্বামীকেও। ২৬ শে জুন শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁকে পরম শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় অবরুদ্ধ ঢাকায় তাঁর দৈনন্দিন দিনলিপিটি হয়ে উঠে মুক্তিযুদ্ধের এক অসামান্য দলিল। তেমনি বাংলা সাহিত্যের বিজয় তোরণ। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট, ব্যক্তির অবস্থান এবং পারিবারিক আবহের মধ্য দিয়ে যুদ্ধাক্রান্ত পুরো দেশের অবস্থা তিনি তুলে ধরেন একাত্তরের দিনগুলোতে। এছাড়াও রয়েছে আরও কিছু উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ গজ কচ্ছপ, সাতটি তারার ঝিকিমিকি, নিঃসঙ্গ পাইন ক্যান্সারের সঙ্গে বসবাস, প্রবাসের দিনগুলি, অন্য জীবন। এসব গ্রন্থগুলো তাঁর সাহিত্য প্রতিভার উজ্জ্বল ও বর্ণিল স্বাক্ষর। তবে যে গ্রন্থটি তাঁর জীবন থেকে নেওয়া সেটি হয়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের অমর কাব্য গাথা। জাহানারা ইমাম শুধু শহীদ জননী নন, নন শুধু শহীদ জায়া। মুক্তিযুদ্ধকে তিনি ধারণ করেছিলেন জীবনে ও মরণে। ৭৫ সালের পর দীর্ঘ সময় ধরে মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে এক ধরনের খেলা শুরু হয়। শুরু হয় পাকিস্তানি চেতনায় পুনর্বাসন। ঘাতক চক্র মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়।
আমাদের এত বড় অর্জনকে ধূলিসাৎ করে দেওয়ার চক্রান্ত শুরু হয়। ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা বিরোধিতা ও গণহত্যার প্রতীক গোলাম আযমকে (জামায়াত ইসলামীর আমিরকে) স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হলে বিক্ষুব্ধ দেশবাসীর সাথে তিনিও রাস্তায় নেমে আসেন এবং ১৯৯২ সালে গঠিত হয় তাঁর নেতৃত্বে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। অসুস্থ শরীর নিয়ে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত ছুটে বেড়িয়েছেন। সত্যি কথা বলতে গেলে তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুনরুদ্ধার করেছেন, মানুষকে তিনি জাগিয়ে তুলেছিলেন।
জাহানারা ইমাম ১৯২৯ সালে ৩ মে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের রক্ষণশীল বাঙালি মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জাহানারা ইমামের পিতা সৈয়দ আব্দুল আলী ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। মাতা সৈয়দা হামিদা বেগম। জাহানারা ইমাম মাধ্যমিক পাস করেন ১৯৪২ সালে। ১৯৪৪ সালে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন ১৯৪৫ সালে ভর্তি হন কলকাতার লেডি ব্রোবোর্ন কলেজে সেখান থেকে তিনি বি.এ পাস করেন ১৯৪৭ সালে। ১৯৬০ সালে বি এড ডিগ্রি অর্জন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে সার্টিফিকেট ইন এডুকেশন ডিগ্রি অর্জন করেন ১৯৬৪ সালে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে ১৯৬৫ সালে বাংলায় এম এ পাস করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তিনি ঢাকা সিদ্বেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটেও তিনি খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯২ সালে ২৬শে মার্চ গণ আদালতের মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দ্দী উদ্যানে একাত্তরের নরঘাতক গোলাম আযমের ঐতিহাসিক বিচার অনুষ্ঠান করেন। গণ আদালতে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দশটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপিত হয়। ১২ জন বিচারক সমন্বয়ে গঠিত গণআদালতের চেয়ারম্যান জাহানারা ইমাম গোলাম আযমের ১০টি অপরাধ মৃত্যুদণ্ডযোগ্য বলে ঘোষণা করেন। মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য জাহানারা ইমাম নিজেও সর্বদা সক্রিয় ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জীবনে স্বাধীনতা বিরোধী ধর্মান্ধ ঘাতক-দালালদের পর্যায়ক্রমিক পুনর্বাসনে অপমানিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি বিভিন্ন সভা সমিতিতে বক্তৃতা করে এবং লিখে জনসচেতনতা গড়ে তোলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পক্ষের মানুষদের একত্র করতে না পারলে বিরোধী দুষ্ট চক্রকে প্রতিরোধ করা যাবে না। তিনি ছিলেন মূলত সাংস্কৃতিক অঙ্গনের তারপরেও তিনি অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিলেন। ১৯৯৪ সালের ২৬ শে জুন আমেরিকার মিসিগান স্টেটের ডে ট্রয়টে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর জীবনাবসান ঘটে। দীর্ঘ ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে ১৯৯৬ সালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ ফেরার পেছনে জাহানারা ইমামের অবদান অনস্বীকার্য। ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাক বা না থাক মানুষের হৃদয়ে তিনি চিরদিন অমর হয়ে থাকবেন। দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের নায়ক ছিলেন তিনি। আমরা ভুলতে বসেছিলাম আমাদের মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধকে তিনিই ফিরিয়ে আনলেন এই অমর কাব্য গাথাকে।

x