আকাশে তুলার মতো মেঘ, ফুলে ফুলে ছেয়ে যাওয়া কাশবন–শরৎকালে বাংলার এই অপরূপ রূপ দেখে যুগে যুগে মুগ্ধ হয়েছেন কবি–সাহিত্যিকেরা। এমন রূপের পাশাপাশি শরৎ এলে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে শুরু হয় নানা ঐতিহ্যবাহী উৎসব। দুর্গাপূজা, নৌকাবাইচ, বেইড়া ভাসান, লোকজ মেলা, ঘুড়ি উৎসব মন কাড়ে এই ঋতুতে।
আশ্বিন মাসে অনুষ্ঠিত হয় বাংলার হিন্দু সমপ্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। এ দেশের গ্রাম থেকে শহর–যেখানেই হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের বসবাস, সেখানেই দুর্গোৎসব হয়ে থাকে। এই শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে সুনামগঞ্জ জেলার কমবেশি কিছুদিনের জন্য অবসর খুঁজে পান। তখনই তারা সাধারণত গ্রামের আসরে ঢপযাত্রার অনুষ্ঠান করে থাকেন। গবেষকদের ভাষ্যমতে, ঢপ বা কীর্তন মূলত রাধাকৃষ্ণলীলার কাহিনীনির্ভর পরিবেশনা।
কিন্তু বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে দেখা যায় ভিন্ন ধরনের উৎসব। এ অঞ্চলে ঢপযাত্রার আসরে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের কাহিনির পাশাপাশি অন্যান্য হিন্দু–পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত, মনসামঙ্গলের কিছু জনপ্রিয় কাহিনী মঞ্চস্থ হয়। পাশাপাশি স্থানীয় কিছু লোকপুরাণের কাহিনীও মঞ্চস্থ হয়ে থাকে।
দুর্গামণ্ডপের সামনেই ঢপযাত্রার অভিনয় সবচেয়ে বেশি হয়। ঢপযাত্রা পরিবেশনার জন্য ছয় ইঞ্চি সমান মাটি উঁচু করে মঞ্চ তৈরি করা হয়। মঞ্চের চারদিকে মাটিতে পাটি, টুল, বেঞ্চ বা চেয়ারে বসে দর্শক ঢপযাত্রা অনুষ্ঠান উপভোগ করে। প্রধান চরিত্রগুলো যাত্রাশিল্পীদের মতো ‘রয়েল ড্রেস’ পরে মঞ্চে অভিনয় করে থাকেন। তবে, অন্যান্য চরিত্রের অভিনেতারা সাধারণ পোশাক পরেই অভিনয় করেন। আসরে পুরুষেরাই নারী সেজে অভিনয় করে থাকেন।
ঢপযাত্রার দলের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন ম্যানেজার এবং আসর পরিচালনা করেন পালা পরিচালক। তবে নির্ধারিত চরিত্রের অভিনেতারা মঞ্চে প্রবেশ করে অভিনয় শেষে আবার সাজঘরে ফিরে যান।
ঢপযাত্রার আসরে সাধারণত বাদ্যযন্ত্র হিসেবে হারমোনিয়াম, করতাল, মৃদঙ্গ, ক্লাওরিনেট প্রভৃতি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ঢপযাত্রার আসরে রামায়ণ, মনসামঙ্গল ও স্থানীয় পৌরাণিক আখ্যান পরিবেশনায় সাধারণত সংলাপভিত্তিক অভিনয়ের আধিক্য দেখা যায়। সঙ্গে গান ও নাচের ব্যবহার দেখা যায়।
সাধারণ যাত্রার আসরের মতো ঢপযাত্রার আসরেও লিখিত পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করা হয়। এ ক্ষেত্রে অভিনেতার মুখস্থ যাত্রার আসরের মতোই মঞ্চের এক পাশে বসে একজন প্রম্পটারকে লিখিত পাণ্ডুলিপি থেকে প্রম্পট করতে দেখা যায়। আসরের শুরুতেই নির্ধারিত পালার কেন্দ্রীয় চরিত্র মঞ্চে আগমন করেন এবং নিজ চরিত্রের পরিচয় দিয়ে তিনি মঞ্চ থেকে প্রস্থান করেন। এরপর বন্দনা বা প্রার্থনাপর্ব উপস্থাপন করা হয়। এ পর্বে একজন অভিনেতার প্রার্থনাবাণীর মধ্যে দুর্গাপূজা দুর্গার আবির্ভাব ঘটে। এরপর একে একে মঞ্চে আসে অসুর, বাঘ, গণেশ প্রভৃতি চরিত্র। এই দুর্গামূর্তি চারদিকে অবস্থান নেওয়া দর্শকের দিকে ঘুরে ঘুরে তার রূপ দেখাতে থাকে। এরপর সদল–বলে দুর্গামূর্তি প্রস্থান করলে মূল পালা শুরু হয়।
২.
জলের পীর খোয়াজ খিজিরকে স্মরণ করে ভাদ্র মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার, পূর্ণিমা বা মাসের শেষদিন অনুষ্ঠিত হয় বেইড়া ভাসান। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের লোকায়ত পীরদের মধ্যে গাজী পীর, মানিক পীর, মাদার পীর ও একদল পীরের নামের পাশাপাশি জলের পীর খোয়াজ খিজিরের নামটিও অত্যন্ত জনপ্রিয়। অনেকে পবিত্র কোরআনের সূরা কাহফে উল্লিখিত হযরত মুসা (আ.) ও খিজির (আ.)-এর আখ্যান থেকে খোয়াজ খিজিরের পুরাণ উদ্ভবের অনুমাণ করেছেন। সে যা–ই হোক, প্রতিবছর ভাদ্র মাসের বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের মানিকগঞ্জ, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও মুন্সিগঞ্জ অঞ্চল জলের পীর খোয়াজ খিজিরকে স্মরণ করে বেউড়া ভাসান উৎসব পালিত হয়ে থাকে।
বেইড়া ভাসান উৎসবে জলের পীর খোয়াজ খিজিরকে স্মরণ করে সাধারণত পাঁচটি কলাগাছ কেটে একসঙ্গে জোড়া লাগিয়ে একটি ভেলা তৈরি করা হয়। ভেলাটির ওপর বাঁশের চটা দিয়ে একটি ছোট ঘরের কাঠামো তৈরি করে তাতে বিভিন্ন রঙের কাগজ দিয়ে সাজানো হয়। এরপর ভেলার ওপর ঘরের মধ্যে দুধ, কলা, পায়েস প্রভৃতি ভোগ দিয়ে প্রদীপ জ্বালানো হয়। এরপর ভেলাটির সামনে ভক্তরা বিভিন্ন ধরনের মানতের সামগ্রী দান করেন। সেসময় ভেলার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন ঢাকি ঢাক বাদ্য করতে থাকেন। ভক্তদের মানত বা ‘হাজত শোধ’ শেষ হতে সময় যখন ঘনিয়ে আসে, তখন খোয়াজ খিজিরের পূজারি ভেলাটি মাথায় নিয়ে নদীর দিকে রওনা হন। তাঁর পেছনে তার বাজাতে বাজাতে ঢাকিরা অগ্রসর হতে থাকেন, সঙ্গে থাকেন ভক্তরাও। নদীর ঘাটে পৌঁছে আরেকটি প্রদীপ জ্বালিয়ে ভেলার ঘরে দিয়ে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। ফিরে এসে খোয়াজ খিজিরের পূজারি উপস্থিত সব ভক্তকে শিরনি খাবার দেন। এরপর শেষ হয় বেইড়া ভাসানের অনুষ্ঠান। পরে রাতব্যাপী ধূপ–ধোঁয়ার আবহে চলতে থাকে খোয়াজ খিজিরের নামে বন্দনা গানের অনুষ্ঠান।
৩.
কারাম এক ধরনের বৃক্ষপূজাকেন্দ্রিক উৎসব। ভাদ্র ও আশ্বিন মাসের বিভিন্ন সময়ে এ দেশের অন্তত আটটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তা কারাম উৎসব পালন করে থাকে। কারাম পালনকারী আটটি জাতিসত্তা হলো–ওরাওঁ, সাঁওতাল, দেশোয়ালী, ভূমিজ, ঘাটোয়াল, কর্মকার, কালিন্দী, জঙ্গলী।
এসব জাতিসত্তার বৃক্ষদেবতা হচ্ছেন ধারাম–কারাম বা ধরম–করম। এসব বৃক্ষদেবতার জন্যই হলো এ–উৎসব। ভাদ্র–আশ্বিন মাসের নির্দিষ্ট দিন স্নান করে নদী বা যেকোনো ধরনের জলাশয় থেকে একটি বাঁশ বা বেতের পাত্রে বালু নিয়ে আসে আদিবাসী এসব মানুষ। সেই বালুতে ধান বা অন্য শস্যের বীজ ছিটিয়ে দেওয়া হয়। এরপর পাঁচ থেকে ছয় দিন তাতে সকাল–সন্ধ্যা পানি ঢালা হয়। এতে বীজপাত্রে চারা গজিয়ে ওঠে।
চারা গজিয়ে ওঠার মধ্যে কারাম পুজারী পূজার প্রসাদ নিয়ে নাচ–গান করতে করতে নির্দিষ্ট একটি কারাম গাছের কাছে যান। সেখানে তিনি গাছকে উৎসবে নিমন্ত্রণ করে আসেন। একদিন পরে নিমন্ত্রণ করে আসা কারাম গাছের ডাল কাটতে নাচ–গান করতে করতে আবার রওনা হন। এবং এক এক কোপে ধারাম–কারামের প্রতীক হিসেবে দুটি ডাল কেটে আনেন।
ফিরে আসার পথে ডালটি হাতে নিয়ে সারা পথ নাচ–গান করতে থাকেন।
তারপর ডালটি বাড়ির বাইরের উঠানে পুঁতে দিয়ে পূজা করা হয়। পূজা আর ‘কিছা’ বা কিচ্ছা শেষে সেই ডাল ঘিরে সারা রাত ঝুমুর নাচ–গান চলে। পরদিন পাড়ার ভক্তরা মিলে সেই কারাম ডাল নিয়ে পাড়ার বাড়ি বাড়ি ঘুরে নাচ–গান করেন।
সবশেষে কারাম ডাল নিয়ে নাচতে নাচতে নদীর পানিতে বিসর্জন দেওয়া হয়।
রাজশাহী, দিনাজপুর ও নওগাঁ জেলার ওরাঁও ও সাঁওতালদের কারাম তিন ধরনের–রাজ কারাম, দশ কারাম ও নিজ কারাম। ওই এলাকায়
সব ওরাঁও সমপ্রদায় ভাদ্র মাসের একটি নির্দিষ্ট দিনে রাজ কারাম করে থাকে। দশ কারাম একটি নির্দিষ্ট এলাকার গুটিকয়েক পড়শিরা মিলেমিশে করে। আর সচ্ছল কোনো পরিবার যখন এককভাবে কারামের আয়োজন করে, তখন তাকে নিজ কারাম বলে।
এছাড়া মৌলভীবাজার, সিলেট ও হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন চা–বাগানে বসবাসরত দেশোয়ালী, ভূমিজ, ঘাটোয়াল, কর্মকার, কালিন্দী ও জঙ্গলিরা কারাম পূজাকে ‘করমা পূজা’ বা ‘করম পূজা’ নামে উদযাপন করে থাকে। চা–বাগানের কারাম পূজা মূলত বোনেরা ভাইদের মঙ্গলের জন্য উদযাপন করে থাকে। তাদের কারাম পূজার একটি জাগরণী গানে বলা হয়, ‘করম কাটি গেলি রে ভাইয়া টিলার উপরে। নাগ ছাপ ডুবে দিলো খোপা ভিতরে।’











