চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া উপজেলা সদর বটতলী স্টেশন অংশ প্রশস্ত করে চার লেনে উন্নীত হলেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সুফল। যানজট নিরসন ও নিরাপদ যোগাযোগের প্রত্যাশায় নির্মিত এই সড়কের বাস্তব চিত্র এখন ভিন্ন। মহাসড়কের একাংশ দখল করে বসেছে হকাররা, গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশে এখনো শেষ হয়নি সড়ক সমপ্রসারণের কাজ। এর সাথে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত ও অসম্পূর্ণ ড্রেনেজ ব্যবস্থা। সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা, বাড়ছে জনদুর্ভোগ। ফলে প্রতিদিন যানজট, বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে পথচারী, শিক্ষার্থী, স্থানীয় বাসিন্দা ও দূরপাল্লাসহ বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রীদের। কার্যকর তদারকি, নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার অভাবে বটতলী স্টেশনে অবৈধ দখল ও অব্যবস্থাপনা দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
সওজ সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের চন্দনাইশ স্টেশন, লোহাগাড়া উপজেলা সদর বটতলী স্টেশন ও পদুয়া স্টেশনে মহাসড়ক প্রশস্তকরণ ও উভয় পাশে ড্রেনের কাজ করেছে মাসুদ হাইটেক নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। উক্ত কাজের বরাদ্দ ছিল ১০ কোটি টাকা। এছাড়া চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া অংশে প্রশস্তকরণ কাজ চলছে ৩ প্যাকেজে। এরমধ্যে প্যাকেজ–১ সাতকানিয়া রাস্তার মাথা থেকে লোহাগাড়ার রাজঘাটা ব্রিজ এলাকা পর্যন্ত ৮.৪ কিলোমিটার। উক্ত প্যাকেজের কাজ করছে এম এ এইচ কনস্ট্রাকশন। যার বরাদ্দ ৩৫ কোটি টাকা। প্যাকেজ– ২ লোহাগাড়ার রাজঘাটা থেকে চুনতির মিঠার দোকান এলাকা পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার। উক্ত প্যাকেজের কাজ করছে এম এ কনস্ট্রাকশন। যার বরাদ্দ ৩৪ কোটি টাকা। প্যাকেজ– ৩ চুনতির মিঠার দোকান থেকে জাঙ্গালিয়া এলাকা পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার। উক্ত প্যাকেজের কাজ করছে এম এ এইচ কনস্ট্রাকশন। যার বরাদ্দ ৩০ কোটি টাকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা সদর বটতলী স্টেশন অংশ প্রশস্ত করে চার লেনে উন্নীত করা হলেও এর প্রকৃত সুফল মিলছে না। সড়কের বর্ধিত অংশ দখল করে বসেছে ভাসমান দোকানপাট, আবার ওই অংশকে অস্থায়ী স্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহার করছে বিভিন্ন যানবাহন। ফলে চার লেনের সড়ক কার্যত আগের দুই লেনের অবস্থাতেই রয়ে গেছে। সংকুচিত হয়ে পড়েছে যান চলাচলের জায়গা। এর প্রভাবে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রী, পথচারী ও স্টেশনে আসা সাধারণ মানুষ। অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও সড়কের স্বাভাবিক ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে চার লেনে উন্নীত করার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।
এছাড়া স্টেশনের স্কুল রোডের মাথা থেকে উত্তর দিকে প্রায় একশ মিটার অংশ এখনো রহস্যজনকভাবে আগের অবস্থাতেই রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় স্টেশনের অন্যান্য অংশ প্রশস্ত করা হলেও গুরুত্বপূর্ণ এই অংশটির সমপ্রসারণ কাজ এখনো করা হয়নি। ফলে বটতলী স্টেশনের ব্যস্ত এলাকায় তৈরি হয়েছে সরু সড়কের ‘বোতলনেক’।
অন্যদিকে বটতলী স্টেশন এলাকায় ড্রেন নির্মাণেও রয়েছে চরম অব্যবস্থাপনার চিত্র। সড়কের দুই পাশজুড়ে পূর্ণাঙ্গ ড্রেন নির্মাণ করা হয়নি। যেখানে ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে, সেসব অংশও দীর্ঘদিন খোলা অবস্থায় পড়ে ছিল। পানি নিষ্কাশনের কার্যকর সংযোগ ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই ড্রেনে পানি জমে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, খোলা ড্রেনের উপর দোকানিরা নিজেদের উদ্যোগে কাঠের তক্তা বসিয়ে অস্থায়ী চলাচলের ব্যবস্থা করেছেন। প্রতিদিন শত শত পথচারী ও ক্রেতা এসব ঝুঁকিপূর্ণ কাঠের উপর দিয়ে চলাচল করছেন। দুর্বল কাঠের তক্তা ভেঙে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সরেজমিনে দেখা যায়, বটতলী স্টেশন এলাকায় চার লেনের মহাসড়কের বর্ধিত অংশের বড় একটি অংশ এখনো স্বাভাবিকভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সড়কের পাশে ও বর্ধিত অংশে বসেছে অস্থায়ী দোকানপাট, বিভিন্ন যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকছে স্ট্যান্ড হিসেবে। ফলে প্রশস্ত সড়ক থাকা সত্ত্বেও যানবাহন চলাচল করছে সীমিত জায়গা দিয়ে। ব্যস্ত সময়ে এই এলাকায় সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট। পাশাপাশি খোলা ড্রেন, অস্থায়ী কাঠের ঢাকনা এবং অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা দোকানপাট পথচারীদের চলাচলে তৈরি করছে ঝুঁকি। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় উন্নয়ন প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
স্টেশনে আসা একাধিক ক্রেতা ও পথচারী জানান, বটতলী স্টেশনের বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রশস্তের পর চার লেনের সড়ক হওয়ার পরও হকারদের দখল, যানবাহনের অবৈধ পার্কিং ও অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে যানজটে আটকে পড়তে হয় দীর্ঘক্ষণ। উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল পেতে হলে দ্রুত সড়ক দখলমুক্ত করা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঠিক করা ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ–সহকারী প্রকৌশলী মো. শহিদুল আলম জানান, বটতলী স্টেশন অংশে মহাসড়ক প্রশস্ত করে চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে। তবে সড়কের উপর ভাসমান দোকান বসা ও যানজট নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের। স্টেশন এলাকায় ড্রেন নির্মাণের অবশিষ্ট কাজ নতুন প্রকল্প অনুমোদিত হলে সম্পন্ন করা হবে। এছাড়া সড়ক প্রশস্তকরণের যে সামান্য অংশ এখনো বাকি রয়েছে, সেটিও পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করা হবে।
লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বায়েজীদ বিন আখন্দ জানান, বটতলী স্টেশন এলাকায় মহাসড়ক দখল ও যানজটের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সাথে সমন্বয় করে সড়কের অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও জনদুর্ভোগ কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া মহাসড়কের মাঝখানে ডিভাইডার স্থাপনের বিষয়টিও পরিকল্পনায় রয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন বা বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে এ কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।












