লোকসাহিত্যের গবেষক মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীন

সৈয়দ খালেদুল আনোয়ার

শুক্রবার , ১৮ অক্টোবর, ২০১৯ at ৩:৩৭ পূর্বাহ্ণ
38

বাংলা লোকসাহিত্যে মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীন একটি অনিবার্য নাম। তিনি গ্রাম বাংলার পথে প্রান্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য লোকগীতি, কাহিনি,ধাঁধা ইত্যাদি সংগ্রহ করে সেগুলোকে সাহিত্যের দরবারে মর্যাদার আসনে অভিষিক্ত করেন। গ্রাম বাংলার লোকসাহিত্যের আবেদনকে সবার হৃদয়ে পৌঁছে দিয়ে মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীন যে অসাধারণ কাজ সম্পন্ন করেছিলেন তা তাঁকে জাতির স্মরণের আকাশে নক্ষত্রের মতো দেদীপ্যমান করে রাখবে। জ্ঞান তাপস ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন, পল্লীর ঘাটে, মাঠে পল্লীর আলো বাতাসে, পল্লীর প্রত্যেক পরতে পরতে সাহিত্য ছড়িয়ে আছে। কিন্তু বাতাসের মধ্যে বাস করে যেমন আমরা ভুলে যাই যে, বায়ু সাগরে আমরা ডুবে আছি,তেমনি পাড়াগাঁয়ে থেকে আমাদের মনেই হয় না যে এখানে কতো বড় সাহিত্য ও সাহিত্যর উপকরণ ছড়িয়ে আছে। গ্রামবাংলার এই লুকানো সম্পদ সম্পর্কে আর দশজন না জানলেও মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীন জানতেন। গ্রামবাংলার মূল্যবান লোকসংস্কৃতির সুর তাঁর মনের প্রতিটি তন্ত্রীতে যেনো ঝংকৃত হতো। সে কারণে তিনি গভীর আন্তরিকতা নিয়ে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন গ্রামবাংলার আবহমান লোকগীতি সংগ্রহের কাজে। তিনি যেনো গ্রামবাংলার হারানো মনিক কুড়ানোর জন্যে জন্মেছিলেন। জীবনের অন্তিমলগ্ন পর্যন্ত মনসুর উদ্দীন এই মহান ব্রতই পালন করে গেছেন।
স্কুল ছাত্র থাকাকালে মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীনের সাহিত্যজীবনের সূচনা হয়। সাহিত্যে কিভাবে উৎসাহিত হলেন সে সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রবাসীতে রবীন্দ্রনাথের প্রকাশিত লালন ফকিরের গান দেখে আমি লালনগীতি সংগ্রহে প্রবৃত্ত হই। আমাদের গ্রামে একটি মুদির দোকান ছিল। দোকানের সামনে একটি বাঁশের বেঞ্চ ছিল। সেখানে প্রায়ই গ্রামের বাউল-বৈরাগীদের আড্ডা বসতো। প্রেমদাস বৈরাগী নামে এক বৈঞ্চব সেখানে গান গেয়ে পয়সা নিতেন। তখন আমার বয়স তের কি চৌদ্দ। আমি তখন খলিলপুর হাই স্কুলের ৮ম শ্রেণির ছাত্র। আমার প্রথম সংগৃহিত গানটি মনে নেই। তবে চরণটি উল্লেখ করছি, ফকির, কাগজ মন তোর গেলো হুজুরে ্ত-। এই গানটি প্রথম প্রকাশ হয় আমি যখন প্রবেশিকা পরীক্ষা পাস করে ইন্টারমিডিয়েট পড়তে এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হই। কবি জসীম উদদীনের একটি পল্লী গানও এই সংখ্যায় ছাপা হয়। এটা আমার বড়ই আশ্চর্য লাগে।
মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীনের কর্মজীবনের অধিকাংশ অতিবাহিত হয় শিক্ষকতার ক্ষেত্রে। সিলেট মুরারীচাঁদ কলেজে অধ্যাপনা কালে মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীন করাচিতে অনুষ্ঠিত অল পাকিস্তান হিস্ট্রি কনফারেন্সে একটি প্রবন্ধ প্রেরণ করেন। প্রবন্ধের বিষয়বস্তু ছিলো বাঙালি মুসলমানদের লোকগীতি। তাঁর এই প্রবন্ধ কনফারেন্সে উচ্চ প্রসংশিত হয়। পরে তাঁকে কনফারেন্সে যোগদানের আমন্ত্রণ জানানো হয়। এক পর্যায়ে সরকারি তথ্য বিভাগে প্রচার অফিসার পদে দায়িত্ব পালনের জন্যে মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীনের ডাক পড়ে। সরকারি পরিচালনায় ‘মাহে নাও’ বাংলা পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পিত হয়। পত্রিকার দায়িত্ব পালনকালে মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীন লন্ডনে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল ফোকলোর কনফারেন্সে যোগদান করেন। কনফারেন্সে তিনি নিজের প্রবন্ধ পাঠ করেন এবং অন্যদের প্রবন্ধের ওপর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নেন। লন্ডন থেকে ফেরার কিছুদিন পর তাঁকে ঢাকা কলেজে বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে বদলি করা হয়। ঢাকা কলেজে থাকাকালে তিনি কলেজের সাহিত্যমনা ছাত্রদের নিয়ে গঠন করেন ‘বাংলা সাহিত্য সমিতি’। ১৯৫৩ সালে তিনি অন্নদা শংকর রায় কর্তৃক শান্তি নিকেতনে আয়োজিত সাহিত্য সভায় অংশ নেন। সাহিত্য সভায় তাঁর পঠিত প্রবন্ধটি সবার মনোযোগ আকর্ষণ করে। ১৯৫৯ সালে তিনি এই কলেজ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। অধ্যাপক মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীন লোকসাহিত্য গবেষণায় আজীবন নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন। সাহিত্যের এক বিশাল দিগন্ত তিনি আমাদের জন্যে উন্মোচিত করে দিয়ে গেছেন। মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীনের লোকগীতি সংকলন ‘হারামণি’ (১৪ খন্ড) বাংলাসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। লোকসাহিত্যের এই দুর্লভ মণি তিনি নিরলস প্রচেষ্টায় সংগ্রহ না করলে আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হয়তো কালের সাগরে হারিয়ে যেতো। ‘হারামণি’ গ্রন্থে তিনি পাঁচ হাজার লোকগীতি সংকলিত করেছেন। হারামণির প্রথম খণ্ড ১৯৩০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয়। হারামণির জন্যে মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে পেয়েছিলেন উচ্চপ্রশংসা। উল্লেখ্য, হারামণির প্রথম খণ্ডের ভূমিকা লিখেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামও হারামণির জন্যে মুনসুর উদ্দীনকে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে চিঠি লিখেছিলেন।
‘বাংলাসাহিত্যে মুসলিম সাধনা’ (৩ খণ্ড) মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীনের আরেকটি মহান কীর্তি। গ্রন্থটির ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন, আমার মনে প্রশ্ন জাগে যে, মুসলমানরা বংলাসাহিত্যে কি কিছুই দান করিয়া যান নাই? এই বিষয়ে সন্ধান করিতে থাকি। বিশেষ করিয়া বটতলা(কলকাতা) হইতে কিছু কিছু মুসলমানের পুঁথি সংগ্রহে প্রবৃত্ত হই। কালক্রমে বিশাল মুসলিম সাহিত্য সাধনার অজ্ঞাত খনির আবিষ্কার করিতে সক্ষম হই। সেই সক্ষম প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ বাংলাসাহিত্যে মুসলিম সাধনার জন্ম। মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীন জরীন কলম এই ছদ্মনামে একটি উপন্যাস রচনা করেন। উপন্যাসটির নাম সাতাশে মার্চ। তিনি শিশুসাহিত্যেও অবদান রেখেছেন। তাঁর শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে শিরনি, আগরবাতি, মুশকিল আসান, শিরোপা, হাসির অভিধানচ ইত্যাদি। তাঁর অন্যান্য সাহিত্য অবদানের মধ্যে ধানের মঞ্জরী (প্রবন্ধ), আওরঙ্গজেব (অনুবাদ), ইরানের কবি, হযরত মুহম্মদের জীবনী ও সাধনা, মুসলিম বৈষ্ণব কবিতা বাউল গান, হযরত মুহম্মদের হিতজ্ঞান বাণী, শতগান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীনের সংগৃহীত অনুলিখিত বহু লোকজ গল্প কলকাতা ও ঢাকার বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এসব গল্পের কিছু নিয়ে প্রকাশনা সংস্থা মুক্তধারা ফুল্লুরী নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর অধ্যাপক মনসুর উদ্দীন ও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন যৌথভাবে বাংলাদেশ লোকসংগীত সমিতির পক্ষে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিসংগ্রাম বিষয়ক এক হাজার পল্লীগীতি ও লোকগীতি সংগ্রহ করেন। এই গানগুলোর মধ্য থেকে সত্তরটি গান নিয়ে স্বাধীনতা দিনের গান নামে একটি সংকলন প্রকাশিত হয়।
মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীন দেশের অনেক সাহিত্য সংস্কৃতি সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদ অলংকৃত করেছিলেন। আন্তর্জাতিক অনেক সংগঠনও তাঁর প্রতিভার মূল্যায়ন করে। তিনি আন্তর্জাতিক লোকসংস্কৃতি পরিষদ, লন্ডনের সদস্য ছিলেন। আন্তর্জাতিক ফোকলোর পরিষদ নিউইয়র্কের তিনি ছিলেন লিয়াজোঁ অফিসার। নিরলস সাহিত্য সাধনার জন্যে অধ্যাপক মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীন লাভ করেছিলেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মান ও পুরস্কার। মনসুর উদ্দীনের অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডক্টরেট উপাধি প্রদান করে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লোকসাহিত্য বিষয়ক রচনা প্রতিযোগিতায় ১৯২৬ সালে তিনি আশুতোষ পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ১৯৬৪ সালে লাভ করেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। ১৯৮৩ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি লাভ করেন স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে জাতীয় অধ্যাপকের মর্যাদা প্রদান করেন।
লোকসাহিত্যের মহীরুহ মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীন আজ আমাদের মাঝে নেই। ১৯৮৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি এই নশ্বর পৃথিবীর মায়া ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন। বাংলা পল্লী সাহিত্যের যে মণিকাঞ্চন আমাদের অযত্ন অবহেলায় হারিয়ে যেতো তা উদ্ধারের জন্যে মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীন এগিয়ে এসেছিলেন ত্রাণকর্তার ভূমিকা নিয়ে। তাঁর অবদানে বাংলা লোকসাহিত্য আজ বিশ্বসাহিত্যের আসরে সমুজ্জ্বল।
আমাদের জন্যে বিপুল হারামণির সন্ধান দিয়ে মুহাম্মদ মনসুর উদ্দীন নিজেই যেনো হারামণি হয়ে চলে গেলেন। বাংলাসাহিত্যর ইতিহাসে এবং এই সাহিত্যের পাঠকহৃদয়ে তাঁর নাম চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে উৎকীর্ণ থাকবে।

x