লটারি

ফারজানা রহমান শিমু

মঙ্গলবার , ৩ মার্চ, ২০২০ at ১০:২১ পূর্বাহ্ণ
82

“হ্যালো, আমি কাস্টমার কেয়ার থেকে রফিকুল হাসান বলছি। হ্যালো।”
“জ্বি বলুন, আমি শুনতে পাচ্ছি।”
“আপনি কি মোবাইলে কোন বোনাস পেয়েছেন?”
“কই নাতো।”
“আচ্ছা ঠিক আছে। এ বছর লটারির মাধ্যমে আপনার মোবাইল নম্বরটি প্রাইজ পেয়েছে। আপনি একটি গাড়ি পেয়েছেন।”
মাজেদ আলীর মোবাইল ধরা হাতটি অজান্তে কেঁপে উঠল, বুকের ভেতরে কিছু যেন লাফ দিয়ে উঠল। আশ্চর্য কণ্ঠে সে বলল, “গাড়ি!” অপর প্রান্তের লোকটি নির্দ্বিধায় বলল, জি। তবে গাড়ি না নিয়ে নগদ ১৩ লাখ টাকাও নিতে পারেন।” উত্তেজনা দমাতে না পেরে মাজেদ আলী কাঁপা কণ্ঠে বলল, “১৩ লাখ!” মৃদু হেসে তাকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে রকিবুল হাসান বলল, “১৩ লাখ। আপনি ভাগ্যবান। অবশ্য টাকা নেবেন না গাড়ি—“উত্তেজনায় খৈ ফুটল মাজেদ আলীর কন্ঠে, “কিন্তু গাড়ি রাখবো কোথায়? আমার ঘর ছোট, বাইরে জায়গাও বেশি নেই। তাছাড়া গ্রামের রাস্তাও ভালো না। টাকাগুলো নিলে ঘরটা—“ধৈর্য্য ধরে তার কথা শুনল অপর প্রান্তের মানুষটা। এরপর বেশ আন্তরিক কণ্ঠে বলল, ‘আপনার যেটা ভালো মনে হয়। এবার আমার কথা মন দিয়ে শোনেন। এ কথা সবাইকে বলে বেড়ালে শত্রু বাড়বে। জানেনতো আজকাল মানুষ কেমন! তাই কাউকে কিছু বলবেন না। প্রথমে আমি একটা বিকাশ নম্বর দিচ্ছি। ওটাতে ২০০ টাকা বিকাশ করবেন। এরপর বাকিটা পরে বলবো। আর হ্যাঁ, শত্রু বাড়াবেন না, চাচা।”
লাইন কেটে যাওয়ার পরও কিছুক্ষণ বিহ্বল হয়ে রইলো মাজেদ আলী। স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক সে। দুই ছেলে মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেয়ে যায়। মোবাইলে খুব বেশি টাকাও ভরে না। আজকালতো জরুরি কথা বলার আগেই টাকা শেষ হয়ে যায়।
বেশিরভাগ সময় টাকাই থাকে না তার মোবাইলে। আর সে কিনা…পরক্ষণে ভাবে, আল্লাহ চাইলে কিনা দিতে পারে! আছরের আযান হতেই মাজেদ আলী মসজিদের পুকুরে ওজু করে নেয়। আছরের নামাজ শেষে দুই রাকাত নফল নামাজও পড়ে। এরপর বাজারের দিকে পা বাড়ায়।
রকেট সায়েন্স নিয়ে বিশ্ব যখন তোলপাড়, নিরীহ মাজেদ আলী তখন মতি মিয়ার দোকানে বিকাশে ২০০ টাকা পাঠাতে ব্যস্ত। তার গাম্ভীর্য লক্ষ্য করার মতো, মতি মিয়া জানতে চাইল, “টাকা কারে পাঠান, ছার?” মাজেদ আলী হড়বড় করে বলে উঠে, ‘দরকারে।” সন্ধিগ্ন হয়ে উঠে মতি মিয়ার মন। মাজেদ স্যারের এমন ভাবভঙ্গি আর কখনো দেখেনি সে, মতি আবার বলে উঠে, “তাতো বুঝলাম, ছার। দরকার ছাড়া কেউ কি বিকাশ করে? কিন্তু পাঠান কারে? “মাজেদের অস্বস্তিবোধ রাগে পরিণত হয়। গজগজ করে বলে, ‘এত কথার কি দরকার মতি? কাজ সারো।” আশেপাশের ২/৪ জন মানুষও তখন মাজেদের দিকে তাকিয়ে। বুকটা কেঁপে উঠে তার। মনে মনে বলে, “হে আল্লাহ মালিক আমাকে বাঁচাও। শত্রুর ভয়ে হনহন করে সে হাঁটতে থাকে বাড়ির দিকে। শুক্কুরের দোকানে তখন জিলাপি ভাজা হচ্ছিল। জোলেখার জন্য এক ঠোঙ্গা গরম জিলাপি নিতে ভোলেনা সে।
জোলেখার হাতে জিলাপি দিয়েই ভেতরের রুমে গিয়ে বসে মাজেদ আলী। বাইরে থেকে এলে হাত মুখ ধুয়ে দাওয়ায় বসা তার নিত্যদিনের অভ্যাস। কিছুটা অবাক হলেও জোলেখা নীরবে গরম চায়ের কাপ তুলে দেয় স্বামীর হাতে। আপন মনে মুড়ি ভাজা ও জিলাপি খেতে থাকে মাজেদ। অন্যদিনের মতো ছেলেমেয়ের কথাও জানতে চায়না। জোলেখা প্রশ্ন নিয়ে তাকিয়ে থাকে স্বামীর মুখের দিকে। চা-নাস্তা শেষ করে ধীরে ধীরে মুখ খোলে মাজেদ আলী।
খানিকটা ফিসফিসিয়ে সে বলতে শুরু করে, ‘বুঝলে জোলেখা, আমি একটা গাড়ি পেয়েছি। উত্তেজনার চোটে জোলেখার মুখ থেকে বেরিয়ে যায়, “কি?” মাজেদ গলা নামিয়ে বলে, ‘ইশশ আস্তে বলো। আমি সত্যি একটা গাড়ি পেয়েছি। মোবাইল কোম্পানি থেকে আমাকে ফোন করে বলেছে লটারিতে আমার নম্বর উঠেছে। তাই পুরস্কার হিসেবে আমাকে একটা গাড়ি দেয়া হবে। আর যদি গাড়ি না নিই, তবে ক্যাশ টাকা দেবে।” ইতিমধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে জোলেখার শিরায় শিরায়। সেও গলা নামিয়ে প্রশ্ন করে, ‘কত?” বউয়ের সাথে রসিকতার সুযোগ ছাড়ে না মাজেদ। জবাব না দিয়ে বলে উঠে, ‘বলোতো দেখি কত”। জোলেখা তখন বেড়ার ফাঁক ফোকরে চোখ-বুলিয়ে জবাব দেয়-“৫০ হাজার, না না ১ লাখ? একচোট হেসে মাজেদ বলে, ‘ধুর পাগলি! ১ লাখ টাকায় গাড়ি পাওয়া যায়? ১৩ লাখ টাকা, ‘জোলেখা বিস্ময়ে হতবাক। এত টাকা! মাজেদ সাবধান করে দেয় জোলেখাকে। ‘এ কথা কাউকে বলো না কিন্তু। আগে টাকাগুলো পেয়ে নিই।” “উত্তেজনার ধকল সামলে জোলেখা বলে, “গাড়ি না নিয়ে টাকা নিবেন?” মাজেদ একটু হেসে বলে, “গাড়িটাও নিতে পারি, নিলে হয়ত সম্মান বেড়ে যাবে। কিন্তু টাকা পেলে আমাদের সোহেল ও ময়নাকে ভালো স্কুলে পড়াতে পারবো। বাড়িটা ঠিক করে নেব। কিছু জায়গা কিনে বর্গাও দিতে পারব।” জোলেখাও মনে মনে একমত হয় আর ভাবে, ভালো কোন গয়নাগাটি নেই তার। এবার হয়তো কিছু বানিয়ে নেয়া যাবে।
সে রাতে ভালো ঘুম হয়না স্বামী-স্ত্রী’র। মনে তাদের নানা রকম ভাবনা। বড় ঘর, জমি জিরাত, বাচ্চাদের পড়াশোনার আরও কত কি! মাজেদ আলীর মনে পড়ে যায় সখিনার কথা। একই সাথে খেলতে খেলতে বড় হলো, অথচ তার আর্থিক দুরবস্থার জন্য সখিনার বাবা মেয়ে দিলো না তার ঘরে। আজও মন পোড়ে তার, সখিনাও নীরবে কাঁদে। অবশ্য জোলেখাও খারাপ না। মুখ ফুটে চায় না কিছুই। বিয়ের সময় তেমন কিছু দেয়নি জোলেখার বাবা, দিতে পারেনি, তাই হয়তো মুখ ফুটে কিছু বলে না সে।
দেখতে দেখতে দু’দিন পেরিয়ে গেল। বেপারী পাড়া থেকে লক্ষ্মী বেড়াতে এলো। লক্ষ্মী আর জোলেখার বেশ সদ্ভাব। জোলেখা বউ হয়ে আসার পর লক্ষ্মীটা আশেপাশে থাকত বেশি। এরপর বেপারী পাড়ার রাহুলের সাথে বিয়ে হওয়াতে দূরে চলে যায় সে। ভরদুপুরে ছেলে-মেয়ে যখন ভাতঘুমে লেপ্টে আছে, দুই বান্ধবী তখন পুকুরঘাটে কলকল করছে। এক পর্যায়ে ১৩ লাখ টাকার খবরটাও বলা হয়ে যায়। লক্ষ্মীর হাত চেপে ধরে জোলেখা দিব্যি দিয়ে বলে কথাটা যেন কাউকে না জানায়। সেদিন সন্ধ্যায় আবার ফোন বাজে। আরেকটি নম্বর থেকে বলে উঠে রকিবুল হাসান, ‘চাচা মিয়া, কেমন আছেন?” মাজেদ আলী গদগদ কণ্ঠে বলে, ‘ভাল আছি, বাবা। আপনারা সব ভালোতো?” হাসান বলে, “আছি কোনরকম, চিন্তা শুধু একটাই, টাকাটা আপনাকে কেমনে পৌঁছে দেব।” থতমত খায় মাজেদ। প্রশ্ন করে, ‘কেন? কোন সমস্যা? “অপর প্রান্ত থেকে বলে, ‘না, না, তবে একটা নিয়ম আছে তো চাচা। অনেক টাকার ব্যাপার। ফরম ফিলাপ করতে হবে। আপনার নাম, পেশা, ঠিকানা লাগবে। আপনার ছবি লাগবে।” একগাল হেসে মাজেদ বলে, ‘সব পাঠিয়ে দেব”। হাসান বলে, “১৩ লাখ টাকার মামলাতো, চাচা, ফরম ঠিক মতো ফিলাপ না হলে কোথায় কোন দোষ ধরে আর টাকাটা পেয়েও হারান।” একমত হয়ে মাজেদ জানায়, “তাতো ঠিক”। এবার শেষ অস্ত্রটা ছাড়ে হাসান” এসবের সাথে ফরমের ৫০০০ টাকা বিকাশ করতে হবে।” সামান্য থমকে যায় মাজেদ আলী। ৫০০০ টাকা! মাসের শেষ দিকে এত টাকা সে পাবে কোথায়? হাসান বলতেই থাকে, “১৩ লাখ টাকা আমি বাপের জন্মেও দেখিনি। আমি যদি লটারি পেতাম, দরকারে ৫০ হাজার টাকাও যোগাড় করে নিতাম। বাপরে, ১৩ লাখ! তো চাচা, কাল এই নম্বরে টাকা পাঠালে আমি ফরম হাতে নিয়ে আপনাকে ফোন দেব। আর হ্যাঁ, কাউকে কিছু বলেন নিতো?” দোদুল্যমান মাজেদ আলী সচকিত হয়ে বলে, “না, না, কাউকে বলিনি। “হাসান বলল, ‘আর মাত্র ২ দিন। টাকা হাতে নিয়ে একটা মেজবানী দিয়েন, চাচা। আমিও খেতে আসব।” মাজেদ আলী পুনরায় উৎফুল্ল হয়ে বলে, “আচ্ছা।”
রাতে মাটির ব্যাংক ভেঙে ২৭০০ টাকা পাওয়া গেল। খরচের ৯০০ টাকা মিলে মোট ৩৬০০ টাকা হলো। এখন উপায়? মাজেদ আলী ও জোলেখা বিব্রত ভঙ্গিতে টাকাগুলোর সামনে বসে আছে। হঠাৎ মাজেদের চোখ যায় জোলেখার আংটির দিকে। একটুও দ্বিধা না করে সে বলে, “আংটিটা নিয়ে যাই, টাকা পেলেই ছাড়িয়ে আনব।” অকারণে জোলেখার শরীরটা একটু কেঁপে উঠে। তার মুখ দেখে শ্বশুর এই আংটি দিয়েছিল। আজ পর্যন্ত কখনো সে খোলেনি এই আংটি। কিন্তু লাখ টাকা বলে কথা! জোলেখা ধীরে ধীরে আংটি খুলে তুলে দেয় মাজেদের হাতে।
স্কুল ছুটির পরই মাজেদ স্যাকড়ার দোকানে ছুটে যায়। ওদিকে এত বড় খবরটা লক্ষ্মী আর হজম করতে পারে না। রাহুল নিতে এলেই গড় গড় করে সব বলে দেয়। একজন স্কুল শিক্ষকের নির্বুুদ্ধিতায় রাহুল ভীষণ অবাক হয়। এরপর তাড়া দিয়ে বলে, ‘লক্ষ্মী, ফোন দাও মাজেদ ভাইকে।” দুর্ভাগ্যবশত : মাজেদের নম্বর লক্ষ্মীর নতুন মোবাইলে নেই। উপায়ান্তর না দেখে সে রাহুলকে অনুরোধ করে। রাহুল স্কুলের পথ ধরে, কিন্তু সে পৌঁছার অনেক আগে বেরিয়ে গেছে মাজেদ আলী। অগত্যা লাল চানের ফোন ফ্যাক্সের দোকানে ঢু মারে রাহুল। মাজেদকে পায়না সে। জোর কদমে যখন মতির দোকানে পৌঁছে, শুনতে পায় মতি প্রশ্ন করছে, “কারে পাঠান ছার?” ততক্ষণে ৫০০০ টাকা বিকাশের মাধ্যমে রকেট গতিতে পৌঁছে যায় তথাকথিত রকিবুল হাসানের নম্বরে। সেই সাথে জোলেখার আংটি আর মাজেদের ১৩ লাখ টাকার স্বপ্ন প্রতারণার জালে আটকা পড়ে ক্রমাগত ছটফট করতে থাকে।