রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামার জীবন ছিল দারিদ্র্য ও সাদাসিধে জীবন যাপনের অনন্য উদাহরণ। দুনিয়াবি সম্পদ ও ভোগ–বিলাসকে উপেক্ষা করে তিনি পরকালীন সফলতার জন্য জীবন অতিবাহিত করেছেন। নবীজির যাপিত জীবনের চিত্র। প্রিয় নবী। শেষ নবী। শ্রেষ্ঠ নবী, মুহাম্মদ মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাই ওয়া সাল্লাম। তাহার দৃষ্টান্ত তিনি নিজেই। অনুপম চরিত্রের অধিকারী। আল্লাহ নিজেই সাক্ষ্য দিয়েছেন ‘নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী। (সুরা কলাম: আয়াত: ৪)। রাসুল (দ.) ইরশাদ করেন আমি প্রেরিত হয়েছি উচ্চ নৈতিকতা সমৃদ্ধ আখলাক পূর্ণ করার জন্য। মানবতার মুক্তিদূত হজরত মুহাম্মদ (দ.) ছিলেন আদশের্র্র প্রতীক। মহান আল্লাহর ইবাদত আর মানুষকে দ্বীনের প্রতি আহ্বানই ছিল তার দৈনন্দিন কাজ। নবীজি (দ.) নিজে আমল করার মধ্য দিয়ে সাহাবিদের শিখিয়েছেন কীভাবে আমল করলে আল্লাহকে পাওয়া যাবে পরকালে চির শান্তির ঠিকানা জান্নাত পাওয়া যাবে। মানুষ মাত্রই অনুকরণ প্রিয়। তাই কথা, কাজ, চলাফেরায়, এমনকি পোশাক–পরিচ্ছদের ক্ষেত্রেও একজন মানুষ তার প্রিয় ব্যক্তিত্বের কাউকে অনুসরণ করতে পছন্দ করেন। প্রত্যেকেই কাউকে না কাউকে অনুসরণ করে চলেন। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপই হয় কারও না কারও অনুসরণ–অনুকরণে। সুন্দর–সুশৃঙ্খল এবং পরিপাটি জীবনাচার, পৃথিবীর ইতিহাসে এমন একজন অনুসরণীয় শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হচ্ছেন আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। যে কথা প্রায় ১৪০০ বছর আগে পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেছেন তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে তাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের মধ্যে (জীবনীতে) তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ। (সুরা আহজাব : ২১)
এখানে নবীজি (দ.)-এর যাপিত জীবনের ছোট একটি চিত্র তুলে ধরা হলো :
মধ্যরাতে ঘুম থেকে ওঠা: রাসুলুল্লাহ (দ.)মধ্যরাতে ঘুম থেকে উঠতেন। ঘুম থেকে উঠে ‘আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি আহয়ানা বাদামা আমাতানা ও ইলাইহিন নুশুর’ এ দোয়া পডতেন। তিনি কোনো স্বপ্ন দেখলে সাহাবায়ে কেরামকে তা শোনাতেন। সাহাবায়ে কেরামের স্বপ্নও শুনতেন।
প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণ : প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণে জুতা পরিধান করে তিনি বাথরুমে যেতেন। তখন মাথা ঢেকে রাখতেন। বাম পা দিয়ে প্রবেশ করতেন। প্রবেশের আগে এই দোয়া পাঠ করতেন ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল খুবুসি ওয়াল খাবায়িস’।
শেষ রাতে তাহাজ্জুদ আদায় : শেষ রাতে প্রথমে ওজু করতেন। তখন এই দোয়া বারবার পড়তেন আল্লাহুম্মাগফিরলি জাম্বি ওয়া ওয়াসসিলি ফি দারি ওয়া বারিকলি ফি রিজকি অর্থাৎ হে আল্লাহ! তুমি আমার গুনাহ মাফ করে দাও ও আমার রিজিকে বরকত দাও এবং আমার বাসস্থান প্রশস্ত করে দাও। ওজু শেষে আকাশের দিকে তাকিয়ে কালিমা পড়তেন। এরপর তিনি তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতেন। ৪, ৬, ৮ বা কখনো ১২ রাকাত আদায় করতেন। হজরত বেলাল (রা.) ফজরের আজান দিলে দুই রাকাত সুন্নত ঘরে আদায় করতেন। ফরজ নামাজ মসজিদে আদায় করতেন।
ঘরোয়া কাজে অংশগ্রহণ : ইচ্ছা ও আগ্রহ নিয়ে তিনি ঘরের কাজকর্মে অংশগ্রহণ করতেন। ঘর পরিষ্কার করতেন গৃহপালিত পশু–পাখিদের খাবার দিতেন। নিজ হাতে বকরির দুধ দোহন করতেন। কাপড়, জুতা সেলাই করতেন। বাজার করতেন। এক কথায় ঘরোয়া কাজে তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহযোগিতা করতেন।
রুচিসম্মত পোশাক পরিধান : রাসুলুল্লাহ (দ.)-লম্বা জামা পরিধান করতেন। তার জামার হাতাও কবজি পর্যন্ত লম্বা থাকত। জামা পরিধানের সময় ডানদিক থেকে এবং খোলার সময় বাঁ দিক থেকে শুরু করতেন। তিনি জুমার দিন নতুন পোশাক পরিধান করতেন। সাদা পোশাক বেশি পরিধান করতেন। পাগড়ি পরতেন। পাগড়ির নিচে টুপিও পরতেন আবার কখনো শুধু টুপি পরতেন।
দোয়া পড়ে খাবার খেতেন : রাসুলুল্লাহ (দ.) ঠাণ্ডা ও মিষ্টিপানীয় পছন্দ করতেন। ডান হাতে ধরতেন। বিসমিল্লাহ বলে বসে বসে পান করতেন। অল্প অল্প করে দুই–তিনবারে পান করতেন। হাত ধুয়ে মাটিতে বসে দস্তরখানায় খাবার খেতেন। বিসমিল্লাহ বলে সামনের দিক থেকে খাবার নিতেন। খাবার শেষ হলে আঙুল চেটে খেতেন এবং কোনো খাবার পাত্রে অবশিষ্ট রাখতেন না। নিজ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসে একত্রে খাবার খেতেন। খাওয়া শেষে এই দোয়া পডতেন ‘আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি আতয়ামানা ওয়াসাকানা ওয়াজাআলানা মিনাল মুসলিমিন’ অর্থাৎ সব প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদের খাবার খাইয়েছেন, পানি পান করিয়েছেন এবং মুসলমান বানিয়ে জন্ম দিয়েছেন।
সুগন্ধি ও তেল ব্যবহার : রাসুলুল্লাহ (দ.)রায়হান মেশক এবং উদের খুশবু পছন্দ করতেন। গোসলের পর ও রাতে সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। মাথায় ও দাড়িতে তেল ব্যবহার করে তা চিরুনি দিয়ে আঁচড়াতেন।
ডান পথে হাঁটতেন : সবসময় ডান পথ ধরে হাঁটতেন। কোথাও গমনকালে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে রওনা করতেন। উঁচু স্থানে আরোহণে ‘আল্লাহু আকবার’ এবং নিচে নামার সময় ‘সুবাহানআল্লাহ’ বলতেন। তিনি হাঁচির পর ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলতেন এবং হাঁচির জবাব দিতেন।
রোগীর সেবা করতেন : নিজ এলাকায় কেউ অসুস্থ হলে তিনি হেঁটে তার বাড়ি যেতেন। অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করে রোগীর সেবাযত্ন করতেন এবং কপালে হাত রাখতেন। সান্তনা দিয়ে তার আরোগ্যের জন্য দোয়া করতেন। অমুসলিম রোগীদেরও সেবা করতেন।
নবীজির হাস্য–রসিকতা : রাসুলুল্লাহ (দ.)মাঝেমধ্যে বাস্তবতার নিরিখে কৌতুক করতেন। তিনি একদা এক সাহাবিকে বললেন ওহে দুই কানওয়ালা। তিনি জনৈক বৃদ্ধা মহিলাকে বললেন কোনো বৃদ্ধা মহিলা জান্নাতে যাবে না। এ কথা শুনে বৃদ্ধা কাঁদতে শুরু করল। রাসূলুল্লাহ (দ.)বললেন বৃদ্ধারা যুবতী হয়েই জান্নাতে যাবে।
পরিচ্ছন্নতায় গুরুত্বারোপ : পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অঙ্গ বলেছেন নবীজি (দ.)। তিনি নিয়মিত গোসল করতেন এবং সাহাবিদের পরিচ্ছন্নতার প্রতি গুরুত্বারোপ করতেন। তিনি নাক পরিষ্কার করতেন বাঁ হাতে। প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের পর বাম হাতে পানি খরচ করতেন।
স্বীকৃতি : খাদিজা (রা.) সম্পর্কে রাসূল (দ.) বলেন মানুষ যখন আমাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে তখন সে আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে মানুষ যখন আমাকে বঞ্চিত করেছে তখন সে তার সম্পদ দ্বারা আমাকে সমৃদ্ধ করেছে আল্লাহ আমাকে তার গর্ভ থেকে সন্তান দিয়েছেন যখন আল্লাহ অন্য স্ত্রীদের সন্তান থেকে আমাকে বঞ্চিত করেছেন।
খুনসুটি : মহানবী (দ.) তাঁর আচার–আচরণে স্ত্রীদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতেন। তাদের সঙ্গে নানা খুনসুটিও করতেন। আয়েশা (রা.)থেকে বর্ণিত আছে আমি ও রাসুলুল্লাহ (দ.)একই পাত্র থেকে গোসল করতাম যা আমাদের মধ্যে থাকত। তিনি আমার চেয়ে অগ্রগামী হলে আমি বলতাম আমার জন্য রাখুন! আমার জন্য রাখুন! আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে তিনি বলেন আমি হাড় থেকে গোশত কামড়ে নিতাম। তারপর আমি যেখানে মুখ রাখতাম আল্লাহর রাসুল (দ.) সেখানে তার মুখ রাখতেন। অথচ তখন আমি ঋতুমতী ছিলাম। আমি পাত্র থেকে পানি পান করতাম। তারপর তিনি সে স্থানে মুখ রাখতেন যেখানে আমি মুখ রাখতাম। রাসুল (দ.)কখনো তাঁর স্ত্রীদের শারীরিক বা মানসিকভাবে আঘাত করেননি।
মুচকি হাসি: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুচকি হাসি হাসতেন। এ হাসি অনেক উপকার বয়ে আনে। হাদিসে এসেছে–হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন সৎ আমলের কোনো কিছুকেই তুচ্ছ মনে করো না যদি তা (সৎ আমলটি) তোমার নিজের ভাইয়ের সঙ্গে মুচকি হাসি দিয়ে মিলিত হওয়ার দ্বারাও হয়। মুসলমানের জন্য এটাও একটা সদকা।
কাউকে অবহেলা না করা : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো কাউকে অবহেলা করতেন না। কারো মর্যাদা বিনষ্ট হোক এটা তিনি কামনা করতেন না। সবার প্রতি তিনি উদার ছিলেন। বিশেষ করে তাঁর কাছে আসা সব ব্যক্তিকেই তিনি সমাদর করতেন। গুরুত্ব দিতেন। তাদের কথা শুনতেন। সুতরাং কাউকেই অবহেলা করা ঠিক নয়।
হে আল্লাহ! আমাকে দরিদ্র অবস্থায় বাঁচিয়ে রাখুন, দরিদ্র অবস্থায় মৃত্যু দিন এবং কিয়ামতের দিন দরিদ্রদের দলভুক্ত করে উঠিয়ে দিন। হজরত আয়েশা (রা.)যখন জিজ্ঞাসা করলেন, কেন তিনি এমন প্রার্থনা করছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন দরিদ্ররা ধনীদের চেয়ে চল্লিশ বছর আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (তিরমিজি) তিনি আরও বলেন দরিদ্র প্রার্থনাকারীকে ফিরিয়ে দিও না যদি কিছু না থাকে একটি খেজুরের টুকরা হলেও দিয়ে দিও। একটিই মানুষ, একটিই তাঁর জীবন, একটিই কাহিনি সেই মক্কার কুরাইশ পরিবারে জন্ম, আল–আমিন উপাধি, সিরিয়ায় বাণিজ্য, হেরা পর্বতের ধ্যানমগ্নতা, মক্কার দাওয়াত, তায়েফের ক্ষত, মদিনায় হিজরত, বদরের যুদ্ধ, বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে ঊর্ধ্বগমন, আবার মক্কায় ফেরা, বিদায় হজ। আমাদের সবার উচিত হবে শ্রেষ্ঠ রাসূলের জীবন অনুসরণ করে আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি অর্জন করা, অসহায়দের সেবায় এগিয়ে যাওয়া, প্রতিবেশির খোঁজ নেয়া, অনাহারীর মুখে খাবার তুলে দেয়া, বস্ত্রহীনদের গায়ে বস্ত্র পরিয়ে দেয়া। তিনি দুনিয়া ও আখেরাতের সবচেয়ে ধনী ছিলেন, তারপরও তিনি দারিদ্রতার জীবন যাপনই পছন্দ করতেন। তার ধন সম্পদ সবকিছু আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে ফেলতেন। তিনি শুধু আল্লাহর উপরই ভরসা করতেন। তাই আমাদেরও নবীর আদর্শ মত জীবন যাপন করতে হবে। যাদের সচ্ছল আমরা যদি শুধু ব্যক্তিগত স্বার্থকে না দেখে সবার কথা ভাবি তাহলে এদেশে যেমন থাকবে না কোনো অভাবী তেমনি দেশের সকল প্রকার অপরাধও অনেকটা কমে যাবে। আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে বিশ্বনবীর আদর্শ অনুসরণ করে জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমিন। লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট।












