চারদিকে সবুজ ফসলের মাঠ। মাঝে এক টুকরো জমিতে টানানো হয়েছে সুরক্ষা নেট। নেটের ভেতরে মাচায় ঝুলে আছে হলুদ আর সবুজ রঙের তরমুজ। বাম্পার ফলন হওয়ায় ক্ষেতে ব্যস্ত সময় পার করছেন চাষি নূর উদ্দিন। তার এই সফলতা এখন রাঙ্গুনিয়ার কৃষক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা ইউনিয়নের উত্তর পোমরা গ্রামে গতানুগতিক কৃষির ধারা পাল্টে এবার গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষে বাজিমাত করেছেন কৃষক মো. সেলিম ও নূর উদ্দিন। এর আগে এই অঞ্চলে বিক্ষিপ্তভাবে গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষ করে আরও কয়েকজন চাষি লাভবান হলেও, এবার আধুনিক প্রযুক্তি ও নিরাপদ বালাই ব্যবস্থাপনার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তারা।
সরেজমিনে জানা যায়, চট্টগ্রাম কৃষি অঞ্চলের টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা কৃষি অফিসের সার্বিক সহযোগিতায় এক কানি জমিতে ‘বিগবাইট’ ও ‘সূর্যডিম’ জাতের গ্রীষ্মকালীন তরমুজের এই প্রদর্শনী প্লটটি তৈরি করা হয়। আধুনিক ও নিরাপদ চাষাবাদ নিশ্চিত করতে এই প্লটে ব্যবহার করা হয়েছে উন্নত জাতের বীজ, সুষম সার, জৈব বালাইনাশক, ক্ষতিকর পোকা দমনে হলুদ আঠালো ফাঁদ ও ফেরোমন ফাঁদ এবং গাছের গোড়ার আর্দ্রতা রক্ষায় মালচিং পেপার। সর্বোপরি আধুনিক এই প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগই তরমুজের এমন চমৎকার ফলন নিশ্চিত করেছে।
সফলতার পেছনের গল্প বলতে গিয়ে কৃষক নূর উদ্দিন জানান, তার বহুমুখী ফসলের আবাদ রয়েছে। তবে ইউটিউবে গ্রীষ্মকালীন তরমুজের চাষ দেখে তিনি এমন লাভজনক আবাদে উদ্বুদ্ধ হন। পরবর্তীতে উপসহকারী কৃষি অফিসার দিলুয়ারা বেগমের নিবিড় পরামর্শ ও দিক নির্দেশনায় তিনি এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। বীজ রোপণের মাত্র ৪০ দিনের মাথায় ক্ষেতে ফল ধরতে শুরু করে। বর্তমানে ক্ষেতে কয়েকশ তরমুজ প্রায় পরিপক্ব হয়ে উঠেছে, যা আর মাত্র ১৫–২০ দিনের মধ্যেই বাজারজাত করা সম্ভব হবে। এছাড়া সব মিলিয়ে এক হাজারটি তরমুজের ফলন আসবে বলে প্রত্যাশা তার।
খরচ ও লাভের হিসাব কষে এই কৃষক জানান, কৃষি অফিস থেকে সার ও বীজ সহায়তার কারণে তার মূল খরচ হয়েছে কেবল পরিচর্যা ও মজুরি বাবদ মাত্র ১৫ হাজার টাকা। তবে সব ঠিকঠাক থাকলে উৎপাদিত তরমুজ বিক্রি করে আয় এক লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করছেন তিনি। তবে বাজারে যেন বাইরের তরমুজের ভিড়ে স্থানীয় কৃষকরা কম দামের শিকার না হন, সে বিষয়ে নিয়মিত বাজার তদারকির দাবি জানান তিনি। নূর উদ্দিনের এই সাফল্য দেখে এলাকার অন্য কৃষকরাও উৎসাহিত হয়েছেন এবং আগামীতে তারাও এই লাভজনক চাষে নামার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
এদিকে কৃষকদের এই উদ্যোগকে আরও বেগবান করতে মাঠপর্যায়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে কৃষি বিভাগ। সমপ্রতি এই প্রদর্শনী প্লট পরিদর্শনে যান উপজেলা কৃষি অফিসার মো. বেলাল হোসেন। পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, আমরা কৃষকদের খোরপোশ কৃষি বা গতানুগতিক ধারা থেকে বের করে বাণিজ্যিক কৃষিতে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি, যেন তারা প্রকৃত অর্থেই লাভবান হতে পারেন। যে কৃষকরা গ্রীষ্মকালীন তরমুজ বা অন্য কোনো উচ্চমূল্যের ফসল ফলাতে চান, কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তাদের নিয়মিত কারিগরি প্রশিক্ষণ ও সর্বাত্মক উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।












