রবীন ঘোষ : কেউ থাকে না আমার কান্নায়

অভীক ওসমান | বৃহস্পতিবার , ২০ অক্টোবর, ২০২২ at ৬:০৪ পূর্বাহ্ণ


করোনাকাল থেকে বেশ প্যানিক ও বিছিন্ন জীবনকাল কাটাচ্ছি। শুক্রবার তরুণ রাতে অশোক সাহার ফেসবুক স্ট্যাটাসে জানতে পারলাম রবীন ঘোষ মারা গেছেন। আমি বিপন্ন বোধ করি। নব্বই দশকের তরুণ বেলায় চৌরঙ্গী সতীর্থ সুকণ্ঠ আবৃত্তিকার রবীন ঘোষ তৎকালীন ঘনিষ্ঠতায়, মাইকেলের পংক্তিটা মনে পড়ে গেল ‘কেমন ধরিব পরান তোমা বিহনে’।

সমাজ সচেতন সাংবাদিক রমেন দাশ গুপ্ত ফেসবুকে লিখেছেন, ‘মৃত্যু এতো শান্ত ও স্নিগ্ধ’। “মৃত্যু কি সহজ, কি নিঃশব্দে আসে অথচ মানুষ চিরকালই জীবন নিয়ে গর্ব করে’ (সমরেশ মজুমদার)। ফাউজুল কবির তাঁর ঘনিষ্ঠদের একজন, বলেছেন, ‘বিদায় বন্ধু বিদায়’।

সর্বভারতীয় বিপ্লব তীর্থ ধলঘাটে রবীন ঘোষের জন্ম। তাঁর পিতা ধনা ঘোষ সামন্ত জন একই সাথে ব্যবসায়ী ছিলেন। শিপ রিসাইক্লিং ব্যবসার পথিকৃত ছিলেন। তারা মূলত নালাপাড়া নিবাসী ছিলেন। ‘যা ছিলাম যা আছি’ নামে ফেসবুকে একটা চলমান কলাম লিখছিলেন। তাঁর বাবা ধনা ঘোষ স্থানীয় সরকারি প্রতিনিধি ছিলেন। কবি আশীষ সেন জানাচ্ছেন, ‘বাবার মতো সাহসী ও জেদী ছিলেন’ ।

নব্বই দশকের সূচনা লগ্নে আমরা যখন চৌরঙ্গী সংস্কৃতি পরিবার গড়ে তুলি তখনই রবীন ঘোষের সাথে পরিচয়। মূলত চৌরঙ্গীর গীতি নকশার ধারা বর্ণনায় আবৃত্তিতে এম ই এস কলেজের অধ্যাপক হামিদা চৌধুরী, রবীন ঘোষ, টেঙটাইল ইঞ্জিনিয়ার অঞ্জন চৌধুরী ও আমি অভীক ওসমান মুখ্য ভূমিকা পালন করতাম।
চৌরঙ্গীর পর তিনি সমকাল করতেন। আমাদের জীবন যৌবন রাজনীতি সংস্কৃতির রাজধানী আন্দরকিল্লাহর মোড় ছাড়েননি। আমাদের মতোই রবীন সুনীল নাথের পাঠক আড্ডায় যেতেন। জলযোগের আড্ডায় মধ্যমনি ছিলেন।

রবীন মুক্তিযোদ্ধা কানুনগোপাড়া কলেজের ছাত্র রাজনীতি সচেতন ছিলেন। তাঁর ফেসবুকে ৭১ পূর্ব জাতীয়তাবাদ, অধ্যাপক পুলীন দে, শিক্ষক অমলেন্দু বড়ুয়ার প্রতি শ্রদ্ধা ছিলো। ড. অনুপম সেন, অরুণ দাশগুপ্তের সাথে সখ্য ছিলো। অপ্রিয় সত্য কথা বলতেন।

সুত্র জানাচ্ছে, পারিবারিক জটিলতায় তিনি মানসিক যন্ত্রণায় ছিলেন। মৃত্যুর আগের দিন তাঁর মৎস চাষ দেখার জন্য কর্ণফুলী ব্রিজ ঘাট পর্যন্ত গিয়েছিলেন। অসুস্থতাবশত বাসায় আসেন ও বমি করেন। এরপর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

রবীন ঘোষ ভালো গদ্য, গল্প, পদ্য, স্মৃতিকথা লিখতে পারতেন। কিন্তু তাঁর কোনো বই নেই। পাঠক রবীন ঘোষের পদ্য প্রদর্শনী পেশ করছি।

১.কষ্ট কিছু নষ্ট নয় ভ্রষ্ট পথে চলে/ কষ্ট কিছু ভ্রুণে মরে সুখ পাখিরা এলে / কষ্ট কিছু আগুন জ্বালে ধিকি ধিকি জলে/ কষ্ট কিছু কিছু রক্তে নাচে প্রতি পলে পলে।
২.আমার মা সফেদা তলায় ঢুকে পড়লেন যেদিন / বুকে আমার আগুন জ্বললো / জ্বলল দিনের পর দিন / থেমে রইলো জীবন চাকা: থামলো কালের গাড়ি / আমি রইলাম ঠাঁই দাঁড়িয়ে।

১৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় আন্দরকিল্লাহর মোড়ে গিয়েছিলাম। সিটি কর্পোরেশনের মোড়ে ঠোঁটে সিগারেট নিয়ে রবীন দাঁড়িয়ে থাকতো চা দোকানে। রবীন দা কেমন আছেন? বলবেন, ‘চা খাবেন?’ এ ধরনের ভরাট কণ্ঠে সকাল ১১ টায়, দুপুরে, তরুন রাতে আর কেউ বলবে না।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক, নাট্যজন

পূর্ববর্তী নিবন্ধসময়ের ভাবনা
পরবর্তী নিবন্ধমোখতার আহমদ : একজন সৎ রাজনীতিকের প্রতিকৃতি