রক্তের পাঠক, শত রোদনেও তোমাকে পাবো না

আবু মুসা চৌধুরী | শুক্রবার , ২০ মে, ২০২২ at ৯:০৭ পূর্বাহ্ণ

রক্তও পাঠ করা যায়। কেউ কেউ পারে। এ হলো এক গুহ্যক্রিয়া। সম্পর্কমার্গের সূত্র। নয়তো সে মৃত্যুর ক’দিন আগেই কেন বললো, ‘মুসার শরীর কাটলে যে রক্ত বেরুবে তা সাফারই রক্ত।’ এই লোহিত-শোণিত সম্পর্কের মিথষ্ক্রিয়ার নাম কি বন্ধুতা! হয়তো। আমার নিবাস থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বের চেয়ে সামান্য বেশি যার বাসা, দিনযাপন। হাফপ্যান্ট-এর বয়স পেরিয়ে একটু সাবালক হলে যখন মার্বেল, ঘুড়ি, সাতচাড়া, বোম্পাট-এর জগত; তখনই স্বতন্ত্র আঁকিয়ে বালকটির সঙ্গে গাঁটছড়া। আমি দু’একটা ছড়া লিখতে চেষ্টা করি, ছাপাও হয়। দৈনিক মিছিল, স্বাধীনতা, আন্দোলনে; তখন কী, কেন, কোথায় মনে নেই নজরুলের দাঢঢ়্য মুখাবয়বের স্কেচ দেখায়। বাহ্‌ পাড়তুতো ভাইটির মধ্যে একজন মনের মতো মানুষ পাওয়া গেলো। বললাম- চল্‌, সংকলন বার করি।
নাম কী ?
-সূর্যোদয়।
সাথে জোটালাম প্রবীরকেও (প্রখ্যাত শিল্পী প্রবীর দাশগুপ্ত)। তারপর সারা শহর ঢুুঁড়ে বিজ্ঞাপন কালেকশন। পেয়েও গেলাম। তখনকার আজিজ কোম্পানি, আজিম লিমিটেড, এলিট পেইন্ট, এলাহি বক্স (এখনকার জিইসি) এবং আরও আরও। লেখা সংগ্রহ চলছে। তারপর হায়দরী ভাই (শামসুল হক হায়দরী)- এর সহযোগে পত্রিকা প্রকাশ। সালটা ১৯৭৪। আমরা তখন নবম শ্রেণি। আমি কলেজিয়েট, সাফা ক্যান্টনমেন্ট।
তারপর ধীরে ধীরে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে এই বয়সে। আমার এই বন্ধুটি বিচিত্রগামী প্রতিভার অধিকারী। অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা চারুকলায়। কিন্তু কবিতা-গল্প লেখায়ও পারঙ্গম। গুণী সম্পাদক। সুদক্ষ অভিনেতা। এক কর্মিষ্ঠ জগৎ ছিলো ওর । সবসময় ব্যস্ত। কিছু না কিছু নিয়ে। অবশ্যই তা শিল্প-সংস্কৃতি। ছিলো অঢেল শ্রমনিষ্ঠ। পকেট উজাড় করে খরচ করতো। হয়তো বেহিসাবি। হয়তো সুবিবেচনাপ্রসূত নয়। অসম্ভব বন্ধুবৎসল। লোকজনকে ডেকে ডেকে চা-টা খাওয়ানো ছিলো ওর প্যাশন। মনে পড়ে অনেক আগের একটি অ্যাপিসোড….
সম্ভবত ৮৫-৮৬’র দিকে । বেলা দ্বিপ্রহর। বসে আছি আইস ফ্যাক্টরি রোডে ছিরাইয়ার দোকানে। রাস্তার ওপর দিয়ে ও গদাইলস্করি চালে হেঁটে যাচ্ছিলো। কাঁধে হ্যাভারস্যাক, হাতে ক্যানভাস। আমার দিকে চোখ পড়তেই হাত ইশারায় ডাকলো। বললো- চল্‌ ।
বললাম- কোথায় ?
-কক্সবাজার।
কী কক্সবাজার ! আমার পকেটে আছে খুচরা পয়সা। আর বাসায় চিন্তা করবে। কিছুই হবে না। ফোন করে দিবি।
অতঃপর এক কাপড়ে সুমদ্র-সমীপে। পৌঁছলাম অপরাহ্নে। উঠলাম লালদীঘি পাড়ের একটি হোটেলে। হোটেলের ম্যানেজার বখশী (সংবাদকর্মী নজরুল ইসলাম বখশী গত বছর করোনায় প্রয়াত)। লাগেজপত্র হোটেলে রেখে সরাসরি সমুদ্রে। সূর্যের রোদ পড়ে সমুদ্র ঝিকমিক করছে। যেন কাচের গুঁড়ো। অনেকক্ষণ বসে ছিলাম সৈকতে। তারপর লাগোয়া ঝুপড়ি হোটেলে কেঁচকি মাছ ভাজা দিয়ে মধ্যাহ্ন ভোজ। ঝুরঝুরে নরম চালভাজার মতো সেই কেঁচকি মাছের স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে। এরকম মজাদার উপাদেয় রান্না ইহজন্মে আর খাইনি। সামুদ্রিক বাতাসে খিদেও ছিলো। খেয়েছিও অঢেল। সন্ধ্যায় হোটেলে এলো রফিক ভাই (হোটেল মালিক), বকুল জসিমউদ্দিন বকুল শব্দায়ন আবৃত্তি সংসদের কর্ণধার)
রাতে আমার ‘বেড়া’ উঠলো। ওরা হোটেল চত্বরে ব্যাডমিন্টন খেলছিলো। সাফাকে বললাম, আমি আদিবাসী দ্রাক্ষারসের সেবা করবো। সে ভয় দেখালো। বললো, ব্যাটা-কোথায় পাবি? কিছুই চিনিস না, জানিস না। আমি নাছোড়। ঘ্যান ঘ্যান করতে লাগলাম। শেষ পর্যন্ত অপারগ হয়ে আমার হাতে তুলে দেয় ৫০ টাকা। আমিও রিকশাচালককে ম্যানেজ করে রাখাইন পল্লির মাচাসদৃশ্য বাংলো প্যাটার্নের এক বাড়ি থেকে নিয়ে এলাম। আসার পর উদ্ধার করলো আমার চৌদ্দগুষ্টি। বললো, ব্যাটা তোরে কাইটা রেখে দিলে কী করতি। এদিকে আমি মরি টেনশনে। আমার তো কাচুমাচু অমায়িক হাসি। গোসসা করে আমার আনীত উপাচার এক ফোঁটাও গ্রহণ করলেন না তিনি। এককভাবেই মোচ্ছব চললো আমার।
পরদিন গেলাম সকালে বিচে। নীল চোখের ডেনিশ যুবক ‘নীল’ পরিবেশিত নেপাল থেকে আনীত চরছ উপভোগ করলাম। গেলাম ‘অজ্ঞমেধা ক্যাং’-এ। সে বিশাল ক্যানভাসে ‘অজ্ঞমেধা ক্যাং’-নামে একটি পেইন্টিং করলো। রিয়েলেস্টিক উচ্চাঙ্গের কাজ। ছবিটি সম্ভবত কক্সবাজারের রফিক ভাইদের কাছে থাকবে। আমাদের বন্ধু স্বপন মজুমদারের অফিসেও একটি উঁচু মানের শিল্পকর্ম রয়েছে। এরকম ছড়ানো-ছিটানো ওর কাজ অনেকের কাছে আছে হয়তো।
সাফা বোধ হয় একটিই প্রদর্শনী করেছিলো। গত শতকের আশি দশকের শেষ পাদে। কক্সবাজার থেকে আসার পরে। অদ্ভুত প্রকাশকুুন্ঠ ছিলো সে। একটু কৌশলী হলে ওর ঝান্ডা উড়তো। ও ওসবের তোয়াক্কা করতো না। ভালো কবিতা লিখতো। ওর গল্পের উৎকর্ষতা উঁচুমানের। জীবনের শেষভাগে অতিপ্রাকৃত মেটাফিজিক্যাল-পরাবাস্তব ভরকেন্দ্রে আসীন ছিলো ওর রচনা। প্রেক্ষাপটে তা কাহিনি ছাপিয়ে এক সুদূর রহস্য ও অমীমাংসা কিংবা আচ্ছন্নতার আবেশ এনে দিতো। ওগুলো গ্রন্থিত হওয়া প্রয়োজন।
সাফায়েত খানকে নিয়ে লিখতে বসলে সাতখণ্ড রামায়ন হবে। আমার বাল্যবন্ধু শিল্পসখা। অকৃত্রিম রক্তের পাঠক চিরসখা বন্ধু হে আমার শত রোদনেও আর তোমাকে পাবো না। তোমার জন্য আমার এই কবিতা-
এই ক্ষার এই ক্ষুধা
প্রয়াত সাফায়াত খান স্মরণে

যে যাওয়ার সে চলে যায়।
শত রোদনেও ফিরিবে না খনক, কখনও
কবরগাত্রের গুল্ম-ঢিবি
মুদ্দাফরাশের মনও-

বাদাম পাতার মর্ম অনর্থক বলে যায়;
এই ক্ষার
এই ক্ষুধা
এই ভূ-মণ্ডলায়ন,
কী অর্থ বহন করে
মূক-মূঢ়-ক্লান্ত পরিজন !