প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান শিবিরের তীব্র বর্ণবাদী ও মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারের মুখে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান থেকে সিনেট নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল–সায়েদ। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের ২৩৭ বছরের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। আগামী ৩ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেবেন আল–সায়েদ। ১৭৮৯ সালে সিনেটের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত আল–সায়েদের আগে কোনো মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হননি।
৪২ বছর বয়সী আল–সায়েদ এর আগে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন। তার বাবা মিশর থেকে আমেরিকায় চলে এসেছিলেন। আল–সায়েদের বড় হওয়া মিশিগানেই। নির্বাচনী রাজনীতিতে নামার আগে মূলত জনস্বাস্থ্য নিয়েই কাজ করেছিলেন তিনি। তার প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্স মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই–এর এজেন্ট হিসেবে কাজ করতেন। ট্রাম্প মনোনীত প্রার্থী হিসেবেই প্রচারে ঝড় তুলেছিলেন তিনি।
মিশিগান রাজ্যে এল–সাইদের এই জয়ের ফলে মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের সুবিধা পেল ডেমোক্র্যাটরা। তবে আল–সায়েদের সমর্থকদের কাছে এই জয় কেবল আইনসভার একটি আসন জয় করাই নয়, বরং তার চেয়েও বেশি কিছু।
প্রাইমারি নির্বাচনে (কে প্রার্থী হবেন, তা স্থির করতে ডেমোক্রেটিক পার্টির অভ্যন্তরীণ নির্বাচন) আল–সায়েদের কাছে হেরে গিয়েছিলেন হ্যালে স্টিভেনস। মধ্যবর্তী নির্বাচনের কয়েক দিন আগে হঠাৎই রাজনৈতিক ভোলবদল করে মিশিগানের রিপাবলিকান প্রার্থীকে সমর্থন করার কথা জানিয়েছিলেন তিনি। ডেমোক্র্যাট নেত্রীর সমর্থন সত্ত্বেও মিশিগান আসনটি ডেমোক্র্যাটদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে ব্যর্থ হলেন রিপাবলিকানেরা। এর আগে মিশিগানের সিনেটর ছিলেন ডেমোক্র্যাট নেতা সেন গ্যারি পিটার্স। তিনি অবসর নিয়েছেন।
আরব আমেরিকান ইনস্টিটিউটের (এএআই) নির্বাহী পরিচালক মায়া বেরি আল জাজিরা–কে বলেন, রিপাবলিকানরা আরব ও মুসলিমবিদ্বেষী প্রচারকে আল–সায়েদের বিরুদ্ধে প্রধান রাজনৈতিক কৌশল বানিয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ভোটারদের এই অন্ধ বিদ্বেষ প্রত্যাখ্যান আমাদের জন্য অত্যন্ত বড় ঘটনা। আব্দুল নামের প্রতিটি ছেলে, জয়নাব নামের প্রতিটি মেয়ে আর ববি নামের প্রতিটি শিশুর জন্যই এটি এক বিশাল বিষয়। কারণ, দিনশেষে আসল কথা হল, এই দেশ একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রকে সমর্থন করে কি না।’
এর আগে গত আগস্টে অনুষ্ঠিত তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রাইমারি নির্বাচনে জয় পান আল–সায়েদ। ওই নির্বাচনে তাকে হারাতে ৩ কোটি ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় করেছিল ইসরায়েলপন্থি প্রভাবশালী লবি গ্রুপ ‘আইপ্যাক’ (এআইপিএসি)। ইসরায়েলের নীতি ও গাজায় গণহত্যার প্রকাশ্য সমালোচক আল–সায়েদের বিরুদ্ধে এরপর ট্রাম্প ও রিপাবলিকানরা একের পর এক ভিত্তিহীন অপপ্রচার শুরু করে। তাকে এমনকি ‘জিহাদি’ ও ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’–এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলেও দাবি করা হয়। তবে ধর্মীয় বিদ্বেষের মুখেও জনস্বাস্থ্য বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা আল–সায়েদ সাধারণ মানুষের সংকট নিরসনের বিষয়গুলো নিয়েই প্রচারণা চালিয়ে গেছেন। তার প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল সবার জন্য সরকারি অর্থায়নে স্বাস্থ্যসেবা (মেডিকেয়ার ফর অল), নির্বাচনী রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব বন্ধ করা এবং জীবনযাত্রার চড়া ব্যয় কমানো। তাছাড়া, বিদেশি যুদ্ধের পেছনে তহবিল খরচ না করে স্থানীয় বিষয়গুলোর সমাধানে সেই অর্থ ব্যবহারের আহ্বান জানান তিনি।
জয় নিশ্চিত হওয়ার পর মিশিগানের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাতে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়েছেন সায়েদ। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মাইক রজার্সকে তীব্র কটাক্ষ করেছেন তিনি। আল–সায়েদ বলেন, ‘আমার জীবনকালে দেখা অন্যতম জঘন্য ও কুরুচিপূর্ণ প্রচারণায় সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল প্রতিদ্বন্দ্বীরা।’ তার সম্পর্কে ট্রাম্পের মন্তব্যগুলো ক্রমশ ‘আরও জঘন্য ও অমার্জিত’ হয়ে উঠেছিল দাবি করেন সায়েদ। যেসব অভিভাবক তার সন্তানদের কাছে ব্যাখ্যা করতে হিমশিম খান যে কেনও প্রেসিডেন্ট একজন মানুষের নাম নিয়ে উপহাস করেন, তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আগামীকাল তাদের জানিয়ে দিন যে, বাজে লোকগুলো হেরে গেছে। তারা এমন একটি আমেরিকা চায়, যা আমাদের কয়েকজনের জন্য খুবই সংকীর্ণ, কিন্তু আমরা জানি আমেরিকা আমাদের সবার জন্য যথেষ্ট বড়।’
এছাড়া তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে কটাক্ষ করেন। তার সঙ্গে সামপ্রতিক মাসগুলোতে সায়েদের বারবার বাগবিতণ্ডা হয়েছে। সে প্রসঙ্গে সায়েদ বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী আগামী জানুয়ারিতে আপনারই আমাকে শপথ পাঠ করাতে হবে। এই সুস্বাদু ও চমৎকার ট্র্যাজেডি বা পরিহাসের মধ্যে এক পরম আনন্দ রয়েছে। আপনি ভালো করেই জানেন এর অর্থ কী।’ ইসরায়েল প্রসঙ্গে সায়েদের ভাষ্য, মার্কিন নাগরিকরা চান তাদের করের টাকা যেন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই ব্যয় করা হয়। আমরা চাই না আমাদের টাকা কোনো বর্ণবাদী বা গণহত্যামূলক যুদ্ধে অপব্যয় হোক। প্রতিদ্বন্দ্বী রজার্সকে উদ্দেশ করে সায়েদের পরামর্শ, ‘অবসর জীবন উপভোগ করুন। প্রার্থনা করি আমাদের এই অঙ্গরাজ্যে যেন আপনার মত কাউকে আর কখনো দেখতে না হয়।’
ফঙ নিউজ বলছে, মিশগানে সায়েদের বিজয় ডেমোক্রেটিক রাজনীতিতে প্রগতিশীল ধারাকে পিছিয়ে দিতে রিপাবলিকান চেষ্টার ওপর বড় আঘাত বলে ধরা হচ্ছে। ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে প্রতিনিধি হ্যালি স্টিভেন্সকে চমকপ্রদভাবে হারানোর পর, রিপাবলিকানরা তাদের প্রচারে সায়েদকে বামপন্থার প্রতীক হিসেবেও তুলে ধরেছিল।











