মেয়েরা স্কুলে ভর্তি হচ্ছে, কিন্তু সবাই কি সমানভাবে এগোতে পারছে?

শ্রাবণী দাশ | শনিবার , ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১০:০৮ পূর্বাহ্ণ

এটা নিঃসন্দেহে অনেক খুশি হওয়ার মতো ব্যাপার যেবাংলাদেশে নারী শিক্ষায় গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের বিদ্যালয়ে ভর্তির হার অনেক বেড়েছে, কমেছে লিঙ্গভিত্তিক শিক্ষাবৈষম্য এবং পরিবার ও সমাজে মেয়েদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আগের তুলনায় অনেক বেশি স্বীকৃতি পেয়েছে। একসময় বাংলাদেশের মেয়েদের শিক্ষাকে বিলাসিতা হিসেবে দেখা হতো। মেয়ের ভবিষ্যৎ মানেই বিয়ে, সংসার ও সন্তান্তএই প্রচলিত ধারণার কারণে অসংখ্য মেয়ে বিদ্যালয়ের দরজা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারত না। কিন্তু সময় বদলেছে। রাষ্ট্রীয় নীতি, সামাজিক সচেতনতা, উপবৃত্তি, বিনামূল্যে পাঠ্যবই, নারীশিক্ষা বিস্তার এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশে মেয়েদের বিদ্যালয়ে অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াই কি শিক্ষায় সমান অগ্রগতির নিশ্চয়তা দেয়? বাস্তবতা বলছে, না। ভর্তি থেকে নিয়মিত উপস্থিতি, উপস্থিতি থেকে শ্রেণি উত্তরণ, মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করা এবং শেষ পর্যন্ত উচ্চশিক্ষায় পৌঁছানো্তপ্রতিটি ধাপেই মেয়েদের সামনে ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক বাধা রয়েছে।

বাংলাদেশ এডুকেশন স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩এর তথ্য একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। ওই বছরে মাধ্যমিক পর্যায়ে মোট ঝরে পড়ার হার ছিল ৩২.৮৫ শতাংশ। মেয়েদের ক্ষেত্রে এই হার ৩৪.৮৭ শতাংশ। অর্থাৎ প্রাথমিক পর্যায়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ শক্তিশালী হলেও মাধ্যমিক পর্যায়ে এসে তাদের ঝরে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

বাংলাদেশের ২০২৫ সালের বহুমুখী সূচকভিত্তিক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে সমন্বিত নিট উপস্থিতির হার ৮৫ শতাংশ হলেও নিম্নমাধ্যমিকে তা ৬০.১ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে মাত্র ৫০.৮ শতাংশ। একইভাবে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট বয়সী শিক্ষার্থীদের প্রায় একতৃতীয়াংশই বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে। অর্থাৎ বয়স ও শিক্ষার স্তর যত বাড়ে, ধারাবাহিকভাবে শিক্ষায় থাকার চ্যালেঞ্জও তত বাড়ে।

বাল্যবিবাহ: শিক্ষার পথে সবচেয়ে বড় সামাজিক দেয়াল

মেয়েদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ বাল্যবিবাহ। UNICEFএর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭.২ শতাংশের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়েছে। ১৫১৯ বছর বয়সী মেয়েদের ৩৮.৯ শতাংশ বর্তমানে বিবাহিত।

দারিদ্র্য ও শিক্ষার অদৃশ্য মূল্য

বাংলাদেশে শিক্ষায় সরকারি সহায়তা থাকলেও কিছু পরোক্ষ ব্যয় থাকে। বইখাতা, পোশাক, যাতায়াত। অর্থনৈতিক সংকটে অনেক পরিবার মেয়েদের ওপর ঘরের কাজের দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়। ছোট ভাইবোনের দেখাশোনা, রান্নাবান্না কিংবা পরিবারের আয় বৃদ্ধিতে সহায়তার জন্য মেয়েদের সময় দিতে হয়। ফলে একই শ্রেণিতে পড়লেও একজন মেয়ের পড়াশোনার জন্য যে সময় ও পরিবেশ রয়েছে, অন্যজনের তা নাও থাকতে পারে। এ কারণেই শিক্ষায় সমতা মানে শুধু স্কুলে বিনামূল্যে ভর্তি নয়; বরং দরিদ্র পরিবারের মেয়েটিকে এমন সহায়তা দেওয়া, যাতে তার পরিবার তাকে পড়াশোনা থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য না হয়।

শহরগ্রাম ও ভৌগোলিক বৈষম্য

শহুরে আর গ্রামের একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষার সুযোগ কাগজে একই হলেও বাস্তবে এক নয়। শহরে বিদ্যালয়ের সংখ্যা, পরিবহন, শিক্ষক, কোচিং, লাইব্রেরি ও ডিজিটাল সুবিধা তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেতে হয়; কোথাও নিরাপদ যাতায়াতের অভাবও রয়েছে। দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোতে সমস্যাটি আরও প্রকট। UNICEFএর হিসাবে, ২০২৪ সালে জলবায়ুজনিত সংকটে বাংলাদেশে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন শিশুর পড়াশোনা কোনো না কোনোভাবে ব্যাহত হয়েছিল। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন শিক্ষানীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কৈশোর, নিরাপত্তা ও মাসিক স্বাস্থ্য

মেয়েদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার ক্ষেত্রে কৈশোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। এই সময়ে শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি সামাজিক বিধিনিষেধও বাড়তে থাকে। অনেক পরিবার মেয়েদের একা দূরে যেতে দিতে চায় না। বিদ্যালয়ে নিরাপদ পরিবেশ, পর্যাপ্ত আলাদা শৌচাগার এবং মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সুযোগ না থাকলেও উপস্থিতি কমতে পারে। UNICEFএর একটি গবেষণাভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রায় একতৃতীয়াংশ কিশোরী মাসিকের সময় প্রতি মাসে কয়েক দিন স্কুলে যায় না। মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব, প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক সংকোচ এর পেছনে ভূমিকা রাখে। ফলে মেয়েদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে শুধু শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ করলেই হবে না; বিদ্যালয়কে মেয়েবান্ধব ও নিরাপদ করে তুলতে হবে।

ডিজিটাল বৈষম্য: নতুন সময়ের নতুন চ্যালেঞ্জ

ডিজিটাল প্রযুক্তি শিক্ষার ধরন বদলে দিয়েছে। অনলাইন শিক্ষা, ইন্টারনেট, ডিজিটাল কনটেন্ট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যৎ শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। কিন্তু এখানেও বৈষম্য রয়েছে। গওঈঝ ২০২৫ অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৭২.১ শতাংশ পরিবারের বাড়িতে ইন্টারনেট সুবিধা রয়েছে। কিন্তু ১৫২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে অন্তত একটি ICT দক্ষতা রয়েছে মাত্র ৩৭.৬ শতাংশের। অর্থাৎ ভবিষ্যতের শিক্ষা ও কর্মবাজারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রেও মেয়েদের একটি অংশ পিছিয়ে পড়ছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রত্যন্ত এলাকার মেয়েদের জন্য এই ব্যবধান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

পারিবারিক প্রত্যাশা: পরিবারের প্রত্যাশাই কি মেয়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে?

মেয়েদের শিক্ষা সম্পর্কে পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি তার শিক্ষাজীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক। অনেক পরিবার এখন মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত ও কর্মজীবী হিসেবে দেখতে চায়। কিন্তু একই পরিবারের প্রত্যাশার মধ্যে আবার দ্বৈততা দেখা যায়্তমেয়েকে পড়াশোনা করতে বলা হলেও তার ওপর ঘরের দায়িত্ব পালনের প্রত্যাশা থাকে; ভালো ফল করতে বলা হলেও বিয়ের উপযুক্ত বয়স নিয়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়।

অর্থাৎ ‘পড়াশোনা কর’ আবার ‘পরিবারের দায়িত্ব সামলাও’্তদুই প্রত্যাশা একসঙ্গে মেয়ের ওপর বর্তায়। দরিদ্র বা নিম্নআয়ের পরিবারে এই দ্বৈততা আরও প্রকট হতে পারে। পরিবারের আয় কম হলে মেয়ের পড়াশোনাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবর্তে তাৎক্ষণিক পারিবারিক শ্রমের বিকল্প হিসেবে দেখা হয়। বিপরীতে শিক্ষিত মাবাবার উপস্থিতি মেয়েদের বিদ্যালয়ে অংশগ্রহণ ও শিক্ষাগত অর্জন বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেল্তেবিশেষ করে মায়ের শিক্ষার প্রভাব মেয়েদের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে গবেষণায় দেখা গেছে।

গৃহস্থালির দায়িত্ব: বিদ্যালয়ের বাইরে আরেকটি ‘অদৃশ্য কর্মঘণ্টা’

মেয়েদের শিক্ষার পথে সবচেয়ে অবহেলিত বাধাগুলোর একটি হলো গৃহস্থালির দায়িত্ব। রান্না, ঘর পরিষ্কার, পানি আনা, ছোট ভাইবোনের দেখাশোনা, অসুস্থ সদস্যের পরিচর্যা্তএসব কাজের বড় অংশ মেয়েদের ওপর বর্তায়। ফলে বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে ও পরে তাদের যে সময় ব্যয় হয়, তা পড়াশোনার সময় কমিয়ে দেয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, মেয়েদের ওপর গৃহস্থালির কাজের অসম বোঝা তাদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও শিক্ষাগত অর্জনকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে পানি বা জ্বালানি সংগ্রহের মতো সময়সাপেক্ষ কাজ গ্রামীণ মেয়েদের জন্য শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি সংঘাত তৈরি করতে পারে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো্তমেয়েরা বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত হলেই যে তারা পড়াশোনায় অনাগ্রহী, তা নয়। অনেক সময় অনুপস্থিতির কারণ হতে পারে পরিবারের প্রয়োজন। তাই বিদ্যালয়ে উপস্থিতির পরিসংখ্যানকে পরিবারের শ্রমবণ্টনের বাস্তবতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করা জরুরি।

গ্রামীণ প্রেক্ষাপট: গ্রামের মেয়েদের বাস্তবতা কেন আলাদা?

গ্রামীণ এলাকায় মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ সমপ্রসারিত হলেও ভৌগোলিক দূরত্ব, দরিদ্রতা, নিরাপদ যাতায়াতের অভাব, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং সামাজিক রীতিনীতির মতো বিষয়গুলো শিক্ষার ধারাবাহিকতায় প্রভাব ফেলে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার সম্ভাবনা শহুরে শিক্ষার্থীদের তুলনায় অনেক কম্তগবেষণায় এমন প্রবণতা দেখা যায়।

বাংলাদেশের গ্রামীণ মেয়েদের ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধিকালে সমস্যাগুলো আরও জটিল হয়। মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার অসুবিধা, পর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকা এবং সামাজিক সংকোচ বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতির কারণ হতে পারে। বাংলাদেশের কিশোরীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মাসিক চলাকালে প্রতি মাসে কয়েক দিন বিদ্যালয়ে যায় না।

বিদ্যালয়ে উপস্থিতি: ভর্তি নয়, নিয়মিত উপস্থিতিই আসল সূচক

শিক্ষার সুফল পেতে নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি অপরিহার্য। অনিয়মিত উপস্থিতি হলে শিক্ষার্থী পাঠে পিছিয়ে পড়ে, পরীক্ষার ফল খারাপ হয় এবং একপর্যায়ে বিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি অনুপস্থিতি তাদের শিক্ষাজীবনকে বিয়ে বা অন্যান্য পারিবারিক দায়িত্বের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

এ কারণে ভর্তির হারএর পাশাপাশি উপস্থিতির হার, শিক্ষায় টিকে থাকার হার এবং শিক্ষা সম্পন্ন করার হার্তএই সূচকগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের ২০২৫ সালের বহুমুখী সূচকভিত্তিক জরিপে প্রাথমিক শিক্ষার সমাপ্তির হার ৮৩.৭ শতাংশ হলেও উচ্চমাধ্যমিক সমাপ্তির হার ৪৩.৯ শতাংশ। অর্থাৎ শিক্ষার উচ্চতর স্তরে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে ঝরে পড়ার সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।

উৎসাহ ও প্রেরণা: পরিবারের উৎসাহ কি মেয়ের আত্মবিশ্বাস বদলে দিতে পারে?

মেয়েদের শিক্ষায় অর্থনৈতিক সহায়তার পাশাপাশি মানসিক ও সামাজিক উৎসাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘তুমি পারবে’, ‘তোমার পড়াশোনা চালিয়ে যাও’, ‘তোমার মতামতের মূল্য আছে’্তএই ধরনের পারিবারিক উৎসাহ একজন কিশোরীর আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে পারে।

বিদ্যালয়ে শিক্ষকশিক্ষিকার উৎসাহও গুরুত্বপূর্ণ। মেয়েদের বিজ্ঞান, গণিত, প্রযুক্তি বা নেতৃত্বের মতো ক্ষেত্রে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মেয়েদের জন্য নিরাপদ, সম্মানজনক ও লিঙ্গসংবেদনশীল শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের বহু কিশোরী উচ্চশিক্ষা ও পেশাজীবনের স্বপ্ন দেখে; কিন্তু সামাজিক ও পারিবারিক সীমাবদ্ধতা সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

অব্যাহত শিক্ষা: মাধ্যমিকের পর কী?

মেয়েদের শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন তারা প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক, মাধ্যমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং সেখান থেকে উচ্চশিক্ষা বা দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যেতে পারবে।

মাধ্যমিকের পর মেয়েদের শিক্ষাজীবন থেমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বাল্যবিবাহ। বয়স বাড়ার সঙ্গে মেয়েদের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে শিশুবিবাহকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই কেবল মেয়েদের বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো নয়, তাদের দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাজীবন নিশ্চিত করাই নীতিনির্ধারণের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।

শিক্ষায় সমতা নিশ্চিত করতে কি করা প্রয়োজন?

প্রথমত, ভর্তি নয়, শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করাকে নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। মেয়ের শিক্ষাকে ব্যয় নয়, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।

তৃতীয়ত, দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি ও সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে হবে। দরিদ্রতার কারণে যেন কোনো মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ না হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

চতুর্থত, বিদ্যালয়ে নিরাপদ যাতায়াত, পৃথক ও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার, মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

পঞ্চমত, দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে বিকল্প ও ধারাবাহিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ কিংবা অন্যান্য দুর্যোগে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি না হয়।

ষষ্ঠত, মেয়েদের STEM বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত্তশিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো জরুরি।

সবশেষে, শিক্ষার সাফল্য শুধু পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে নয়; দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা দিয়েও মূল্যায়ন করতে হবে।

মেয়েদের শিক্ষায় বাংলাদেশের অগ্রগতি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু ভর্তি ও সমতার পরিসংখ্যানের আড়ালে শিক্ষার ধারাবাহিকতায় অসমতা রয়ে গেছে। পরিবার যদি মেয়ের শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়, গৃহস্থালির দায়িত্বে ছেলেমেয়ের মধ্যে ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করে, গ্রামীণ বিদ্যালয়ে নিরাপদ যাতায়াত ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ তৈরি হয়, নিয়মিত উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং শিক্ষক ও পরিবার মেয়েদের উচ্চশিক্ষার জন্য উৎসাহ দেয়্ততবেই এই অগ্রগতি টেকসই হবে।

অতএব, প্রশ্নটি শুধু ‘মেয়েরা বিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে কি না’ এখানে সীমাবদ্ধ না রেখে আরো বিস্তৃত আকারে চিন্তা করতে হবে। তথা– ‘তারা কি নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাচ্ছে?’ ‘তারা কি নিরাপদে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছে?’ ‘পরিবার কি তাদের স্বপ্নকে সমর্থন করছে?’ এবং শেষ পর্যন্ত তারা কি শিক্ষা সম্পন্ন করে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরা নির্ধারণ করতে পারছে?’

মেয়েদের শিক্ষায় প্রকৃত সমতা প্রতিষ্ঠার মানদণ্ড তাই শুধু ভর্তি নয়; বরং উপস্থিতি, উৎসাহ, শিক্ষায় টিকে থাকা, শিক্ষা সম্পন্ন করা এবং অব্যাহত শিক্ষা। মেয়েরা বিদ্যালয়ে প্রবেশের দরজা পেরিয়েছে; এখন প্রয়োজন তাদের জন্য এমন পথ তৈরি করা, যে পথে তারা থেমে না গিয়ে সমান সুযোগে সামনে এগিয়ে যেতে পারে।

লেখক: ডক্টর অব এডুকেশন (Ed.D.) গবেষক, যুক্তরাষ্ট্র

মেইল: srabani.ctg14@gmail.com>

পূর্ববর্তী নিবন্ধঅদম্য কন্যা নাধিরা আল হার্থির জীবন, সংগ্রাম এবং অমর অভিযাত্রা
পরবর্তী নিবন্ধপেকুয়ায় যানজট নিরসনে ফুটপাত দখলমুক্তে উচ্ছেদ অভিযান