মৃত্যুর নিপুণ শিল্প বিকীর্ণ আঁধারে

কাজী রুনু বিলকিস | শনিবার , ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২ at ৫:১৯ পূর্বাহ্ণ

মৃত্যু জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি। যে কোন মূহুর্তে যে কাউকে মৃত্যু তার শীতল পরশ বুলিয়ে দিতে পারে। মানুষের এই চিরতরে হারিয়ে যাবার ব্যাপারটা মেনে নেওয়া কষ্টকর। এটা স্বজনের কাছে যেমন, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা কাজের মাধ্যমে মানুষের আপন হয়ে উঠা, ভালোবাসা অর্জন করা কেউ হলে দেশের মানুষের কাছেও তা বেদনাদায়ক। আমরা এমন এক পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিবেশে বাস করছি যেখানে রাজনৈতিক মূল্যবোধ বলতে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভিধান বদলে গেছে। লড়াকু রাজনৈতিক নেতারা আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, জনগণ থেকে উঠে আসা নেতাদের অবর্তমানে যারা রাজনীতির হাল ধরবেন তারা জনগণের জন্য কতটা আর নিজের জন্য কতটা সেই নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বিগ্নতা আছে।
সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী গত ১১ সেপ্টেম্বর চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি জাতীয় সংসদের উপনেতা। আওয়ামী লীগের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য। ফরিদপুর দুই আসনের সংসদ সদস্য। না! উনি কোন সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাংসদ নন। প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ রাজনীতি করে জনগণের মধ্যে থেকে উঠে এসেছেন। তাঁর জন্ম ১৯৩৫ সালে। ১৯৫৬ সাল থেকে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। ১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কলকাতা গোবরা নার্সিং ক্যাম্পের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বিপর্যয়ের মুখে পড়ে আওয়ামী লীগ। সেই সংকটময় মূহুর্তে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। ১৯৭৬ সালে সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকেরও দায়িত্ব পালন করেন। ভাবনাটা এইখানে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এইরকম আর একজন নারী নেতৃত্ব তৈরি হওয়ার সুযোগ আছে কিনা! যেখানে সুস্থ রাজনীতির প্রতিযোগিতা নেই, ছাত্র রাজনীতির সুযোগ নেই। গণতন্ত্র প্রশ্নবিদ্ধ সেখানে নারী নেতৃত্ব তো দূরের কথা পুরুষ নেতৃত্বও তৈরি হওয়ার সুযোগ নেই। যে-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী, সাজেদা চৌধুরী, সাহেরা খাতুন এমনকী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও যে-রাজনীতি চর্চার সুযোগ পেয়েছেন। তার ছিটেফোঁটাও কি এখন আছে? উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদারীই এখন ছাত্র রাজনীতি। তাহলে জাতি কোন অন্ধকারের দিকে এগুচ্ছে? অসহিষ্ণু, হিংসা, বিদ্বেষের রাজনীতির মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠা প্রজন্ম থেকে আমরা কি আশা করতে পারি? বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ যাদের আমরা হারিয়ে ফেলছি তাঁদের বিকল্প পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। নতুন নেতৃত্ব তৈরি হওয়ার সুযোগ কমে আসছে। ব্যবসায়ীদের হাতেই রাজনীতি কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতি জনমানুষের কল্যাণে আসে না।
এই সেপ্টেম্বরে আরও দুজন নিখাঁদ দেশপ্রেমিক মানুষকে হারিয়েছি। চার তারিখে চলে গেলেন কীর্তিমান সুরকার, গীতিকার, প্রযোজক, পরিচালক গাজী মাজহারুল আনোয়ার। তিনি অসংখ্য গানের রচয়িতা। ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়, একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল এরকম অসংখ্য দেশের গান তিনি রচনা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কলমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অবিস্মরণীয় এই ব্যক্তিত্বকে মানুষ মনে রাখবে তাঁর গানের জন্য। তাঁর শিল্পের জন্য।
এই সেপ্টেম্বরের আট তারিখে রানী এলিজাবেথের প্রয়াণ দিনে চলে গেলেন জাতির বিবেকখ্যাত,অসাধারণ প্রতিভাবান প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর আলি খান।তিনি রাজনীতি এবং সমাজ সচেতন বুদ্ধিজীবী ছিলেন। তিনি দেশে সুশাসন ও গণতন্ত্রের জন্য কাজ করেছেন।
এসব দেশপ্রেমিক জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ মানুষগুলো হারিয়ে আমরা আমাদের অস্তিত্বের সংকটে পড়ছি।এমন করে মানুষের কথা বলার মানুষ কোথায়?