মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারপ্রধান হিসেবে এটিই তার প্রথম বিদেশ সফর, যা কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এ উপলক্ষ্যে মালয়েশিয়ায় কর্মরত এবং দেশটিতে যেতে আগ্রহী কয়েক লাখ বাংলাদেশি কর্মীর মধ্যে নতুন আশা সঞ্চারিত হয়েছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, বিএনপি সরকার গঠনের পর গুরুত্বপূর্ণ জনশক্তির বাজার আবারও উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কুয়ালালামপুর সফরে অভিবাসন–সংক্রান্ত বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হবে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও। গত এপ্রিলে মালয়েশিয়া সফর করেন আরিফুল হক চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। বাংলাদেশি শ্রমিক সরবরাহ বন্ধের সুযোগ নিচ্ছে নেপাল, ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমার। তারা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে নিজেদের কার্যক্রম বাড়ানো অব্যাহত রেখেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশের জন্য দুই বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ আছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। বাজারটি নিয়ে দেশের ভেতরে দুটি গ্রুপ পরস্পরকে ঘায়েল করছে। দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা হলেও সে বাজারে সফলতা আসেনি। ১৯৭৬ সালে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া শুরু করে। ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক গেছে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ। বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দুর্নীতির অভিযোগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে বন্ধ হয়ে যায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। ২০২২ সালের আগস্টে আবারও শ্রমবাজার খুলে দেওয়া হয়। সব এজেন্সির জন্য উন্মুক্ত রাখার আন্দোলন হলেও তা হয়নি শেষ পর্যন্ত। শ্রমিক নিয়োগের জন্য শেষ পর্যন্ত ১০০ এজেন্সির নাম চূড়ান্ত করে সরকার। বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার চতুর্থ জনশক্তি রপ্তানিকারক দেশ। বিভিন্ন সময়ে বন্ধ হওয়ায় সেখানকার বাজার বাংলাদেশের হাতছাড়া হয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মালয়েশিয়া সফরে আলোর রেখা দেখছে বাংলাদেশের শ্রমবাজার। দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে যে জটিলতা ও অনিশ্চয়তা ছিল, তা কেটে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে।
অভিযোগে প্রকাশ, নজরদারির মধ্যেও থেমে নেই বিদেশে মানবপাচার। ট্রাভেল এজেন্টরা মানবপাচারে বেশি জড়িত। লিবিয়া, ইতালি, ফ্রান্সসহ ইউরোপে চাকরি দেওয়ার কথা বলে লোকজনকে নেওয়া হচ্ছে। পাচারের কথিত রাজনীতিক, বেবিচক, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, বিভিন্ন এয়ারলাইন্স ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, ট্রাভেল এজেন্সির লোকজন জড়িত। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে, ‘কয়েক বছর আগেও অবৈধপথে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমাতে গিয়ে নৌকাডুবিতে বহু মানুষের প্রাণ গেছে। তখন মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের কারাগারেও স্থান হয় বহুজনের। অনেকে গহিন জঙ্গলে আফিম চাষের জন্য ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি হয়ে যায়। অনেককে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও ঘটে সে সময়। আবার ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়ায় যেতে পারলেও অনেককে নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। অবৈধ অভিবাসী হিসেবে অনেককে পালিয়ে বেড়াতে হয়। ধরা পড়ার পর ঠাঁই হয় কারাগারে। কাটাতে হয় মানবেতর জীবন।’ এ অবস্থা উত্তরণে সরকারের উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার। মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানিতে যে সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে, তার বাস্তবায়ন করতে হবে ও ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে। প্রয়োজনে নতুন নতুন ক্ষেত্র খুঁজে বের করতে হবে। দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে তার রপ্তানি বাড়াতে হবে। যত বেশি দক্ষতা আসবে আমাদের জনশক্তিতে, তত বেশি সুযোগ ঘটবে বাইরে পাঠাতে। তাতে প্রবাসী আয় বাড়বে এবং দেশের কোষাগার সমৃদ্ধ হবে। সরকারি পর্যায়ে জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার বলে আমরা মনে করি।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, এখন অর্থনীতি যে চাপের মধ্যে আছে এটা সবাই বুঝে। গুরুত্বপূর্ণ হলো– আগে আর্থিক খাতে দুর্বলতা ছিল এবং বৈদেশিক খাত শক্তিশালী ছিল। কিন্তু এখন বৈদেশিক খাতও দুর্বল হয়ে গেছে। অর্থাৎ অর্থনীতির দুই ইঞ্জিনের মধ্যে এক ইঞ্জিন একটু শক্তিশালী ছিল, এখন দু’টো ইঞ্জিনই দুর্বল হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে অর্থনীতিতে একটি সংকট বিকাশমান। এখন এটার সমাধান হলো– এই সংকটকে স্বীকার করে নিয়ে সর্বমুখী যথোপযুক্ত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাঁরা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়ার মূল কারণ দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধপরিস্থিতির কারণে সেখানকার শ্রমবাজার কিছুটা সংকুচিত, তাই মালয়েশিয়ার বাজার চালু করার দাবি উঠেছে। আশা করি, সরকার সফল হবেন।








