মালজোড়া গান এখন বিলুপ্তপ্রায়

কিশোরী হৈমন্তী টুম্পা | শুক্রবার , ২২ এপ্রিল, ২০২২ at ৬:০৭ পূর্বাহ্ণ

কবিগানের বেশিরভাগ পর্যায় বাদ রেখে কেবল দুই কবিয়ালের তর্কাতর্কি ও প্রশ্ন উত্তর অংশটিকে বাউলতত্ত্ব ধারায় পরিবেশনের মধ্য দিয়েই ‘মালজোড়া বাউল গান’ তৈরি হয়। যেমন- কুস্তি খেলায় একজন মাল বা কুস্তিগীর প্রতিপক্ষের হাত ধরে আটকিয়ে, হারানোর মধ্য দিয়ে বিজয় অর্জন করেন অনুরূপভাবে মালজোড়া বাউল গানেও একপক্ষ তার প্রতিপক্ষকে ‘ধরাট’ বা প্রশ্নবানে পরাস্ত করে বিজয় নিশ্চিত করেন।
এই গানের ক্ষেত্রে ‘ধরাট’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
ধরাট শব্দটি ধরা শব্দ থেকে সৃষ্টি। এক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্ধী এক বাউল অপর বাউলকে প্রশ্নবানে ধরে আটকিয়ে পরাস্ত করার প্রয়াস থেকেই ধরাট শব্দের নামকরণ।
ময়মনসিংহের নেত্রকোণা অঞ্চলের বিখ্যাত বাউল সাধক ‘রশিদউদ্দিন’ মালজোড়া গানের প্রবর্তন করেন। মূলত ত্রিশ শতকের গোঁড়া থেকেই অত্রাঞ্চলে মালজোড়া গানের প্রচলন হয়। ‘মালজোড়া গান’ বা ‘মালজোড়া বাউল গান’ মূলত বাউলের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তর্কমূলক গান। হাজার হাজার দর্শক শ্রোতাদের উপস্থিতিতে সপ্তাহ বা মাসব্যাপী মালজোড়া গানের আসর বসতো। এর পূর্বে বাউল গান ছিল বৈঠকী রূপে।
মালজোড়া বাউল গান মূলত কবিগানের বিবর্তিত রূপ। কবিগান সাধারণত রাধাকৃষ্ণ, হর-গৌরী, রাম-সীতা প্রভৃতি ধর্মীয় বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো, আর পালাগানের কাহিনিতে সমাজের সকল প্রভাবের উর্দ্ধে স্থান পেয়েছিল ‘মানব প্রেম’, তদ্রুপ মালজোড়া বাউল গানেরও মূল প্রাধান্য ছিল ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ এই তত্ত্বে। কবিগানের আংশিক গায়ন পদ্ধতি এবং পালাগানের মানবতা মূলত প্রাধান্য পেয়েছে মালজোড়া বাউল গানে। কবিগানের আংশিক গায়ন পদ্ধতি ও পালাগানের মানবতাবোধের উত্তরসূরি হল ‘মালজোড়া বাউল গান’।
শরিয়ত, মারিফত, সৃষ্টিতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব, মহানবীর জীবন, হাসরের মাঠ প্রভৃতি বিষয়ে বাউলরা মালজোড়া গান পরিবেশন করতেন। যে- কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে চলে দুই বাউলের প্রশ্ন উত্তরের তর্কাতর্কি যুদ্ধ।
কার্তিক থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত শুকনো মৌসুম। এই সময়ে অত্রাঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন পীরের ভক্তগণ নিজ নিজ গ্রামে অথবা কয়েক গ্রামের যৌথ প্রয়াসে এলাকায় মালজোড়া বাউল গানের আসর আয়োজন করতেন।
মালজোড়া বাউল গানে প্রথমে একটি তত্ত্বভিত্তিক গান পরিবেশিত হতো। পরিবেশিত তত্ত্বগানের শেষের সুরেই শ্রোতাদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে প্রতিদ্বন্ধী বাউলের জন্য ধরাট (প্রশ্ন) উপস্থাপন করা হতো। সুর এবং তাল অপরিবর্তিত থাকতো।
বাউল রশিদউদ্দিন ও বাউল চান খাঁ পাঠান একসাথে মালজোড়া গানের আসর করতেন। তাঁদের আসরের কিছু অংশ নিচে উপস্থাপন করা হল,
আসরের শুরুতে বাউল চান খাঁ একটি তত্ত্বগান দিয়ে শুরু করেন, গানটি হল-
‘প্রভু এ বিশ্ব ভূমন্ডল সৃজিয়াছ সকল
তবু কেন ধরাতলে থাকো লুকি দিয়া’।
উক্ত তত্ত্বগানের পর দর্শক শ্রোতাদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে বাউল রশিদউদ্দিনকে ধরাট দেন। তা হল-
‘ওরে গুণধন
এই সমস্ত ছেড়ে দিয়া ত্রিপদীতে দাও বাজাইয়া
করি একটু রসের আলাপন
প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে আমি করি জিজ্ঞাসন
সুন্দর করে দাও বুঝাইয়া সৃষ্টির বিবরণ’।
বাউল চান খাঁ পূর্বের গানের কিছু অংশ গেয়ে নিজের আসর গ্রহণ করেন। এরপর আসরে উঠেন বাউল রশিদউদ্দিন, উনি দর্শক শ্রোতাদের গানের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি দেহতত্ত্ব গান গেয়ে শুরু করেন তাঁর উত্তর,
‘অন্তরে অন্তরে সবে চিন্তা করে
প্রভু সাঁই পরোয়ারে কি খেল খেলায়’।
এই গানটি শেষ করে বাউল চান খাঁ এর দেয়া ধরাটের উত্তর প্রদান করেন।
‘পাঠান সাহেবের কথা শুনে ভয় হইল আমার মনে
কেমন ভাবে করে জিজ্ঞাস
ওরে গুণধন’।
‘তিনি জিজ্ঞাসা করিলেন সৃষ্টির বিবরণ, প্রথম স্রষ্টা ফেরেশতাদের হুকুম করিলেন, তোমরা পানির উপর মৌজা কর। ফেরেশতারা মৌজা করেন এবং তাঁদের মৌজায় পানিতে ঢেউ খেলতে লাগে এবং এ ঢেউ থেকে হাওয়ার সৃষ্টি হয়, আর ঢেউয়ের পরস্পরের সংঘর্ষে সৃষ্টি হয় আগুন। ফেরেশতাদের মৌজায় সৃষ্টি হওয়া ঢেউ হতে ফেনা বা বিম্বু পানিতে ভাসতে থাকে এবং এ বিম্বুতে আগুনের তাপে একটি লাসার মতো পর্দাথ জন্ম নেয়। এই লাসা কঠিন হয়ে মাটিতে পরিণত হয়।’
বাউল রশিদউদ্দিন তাঁর উত্তর শেষে বাউল চান খাঁ এর উদ্দেশ্য আরেকটি ধরাট দিয়ে, পূর্বের সুরের মূল গানের কিছু অংশ গেয়ে নিজ আসন গ্রহণ করেন।
এই মালজোড়া গানের আসরে বিচারক হিসেবে উপস্থিত থাকতেন তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন অঞ্চলের পীরগণ। পরবর্তীকালে গ্রামের গুরুজন এই দায়িত্ব পালন করতেন।
তৎকালীন সময়ে মালজোড়া গান নেত্রকোণা ছাড়াও আশেপাশের অঞ্চলে জনপ্রিয়তা অর্জন করে রশিদউদ্দিনের শিষ্যদের মাধ্যমে। সেই সময়ের বাউল সাধক রশিদউদ্দিন, চান খাঁ, জালালউদ্দিন, উকিলমুন্সি, বাউল শাহ্‌আব্দুল করিম, ইদ্রিস বাউল প্রমুখদের বিশেষ অবদান ছিল মালজোড়া গান প্রচার, প্রসার ও জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে।
এখন সময়ের পরিবর্তনের সাথে এই আসর বিলুপ্তপ্রায়।