আমরা যদি কল্পনা করি মানব সভ্যতার দুটো পা–একটি বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (Science and Technology) এবং অপরটি কলা ও মানববিদ্যা (Arts and Humanities). যদি একটি পা হটাৎ করে বেশী লম্বা হয়ে যায় অর্থাৎ প্রভুত উন্নত সাধিত হয় এবং অন্য পায়ের তেমন অগ্রগতি না হয়। তাহলে মানব সভ্যতা ভারসাম্য হীন হয়ে পড়ে এবং সামনে অগ্রসর হতে গেলে মানব সভ্যতা উষ্টা খেয়ে পড়ে চিরতরে ধংস হয়ে যেতে পারে। তাহলে মানব জীবন ও বিজ্ঞানের মধ্যকার সম্পর্কের বিশ্লেষণ অথবা মানব জীবনের উপর বিজ্ঞানের প্রভাব এবং তারই কারণে মানবিক মূল্যবোধগুলোর যে বিড়ম্বনাকর অবস্থা আজ পরিলক্ষিত হচ্ছে এরই প্রেক্ষিতে বিষয়টি অতি গুরুত্বপূর্ণভাবে আলোচনার দাবী রাখে। বিগত শতকে কয়েকদশকে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রকৌশলবিদ্যার যে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে তারই ফলশ্রুতিতে সর্বক্ষেত্রে বিজ্ঞান আগুনের লেলিহান শিখার মতো প্রসার লাভ করেছে। সমাজ পরিবর্তনে আধুনিক বিজ্ঞানের ক্ষমতা সর্বপ্রথম সাধারণ মানুষ আনবিক বোমার দুঃখজনক প্রদর্শনীর মাধ্যমেই পরিচিতি লাভ করে। তখন থেকে মানুষ বুঝতে পারল বিজ্ঞানের অগ্রগতি মানব জীবনের সর্বক্ষেত্রে পরিবর্তন আনয়ন করছে–যে পরিবর্তন মানবিক মূল্যবোধ ও রুচির ক্ষতি সাধন করছে এবং সে পরিবর্তনের গতি ত্বরান্বিত হওয়ায় ঐতিহ্যবাহী জীবনের ভাবধারা, চিন্তার ধারাবাহিকতা ও পদ্ধতি রক্ষা করা মানুষের একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা হয়ে পড়েছে। সুতরাং জীবনের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে নিত্তনৈমিত্তিক প্রাকৃতিক পরিবর্তনের সাথে নিজেকে সুষ্ঠুভাবে খাপ খাওয়ানো। বর্তমান বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য হচ্ছে এ পরিবর্তনের ধারাকে সর্বতোভাবে সুযোগ–সুবিধা প্রদান করা। এই পরিবর্তন পদ্ধতি ও পরিবর্তিত অবস্থার সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য মানুষকে সক্ষম করে তোলা বিজ্ঞানের শিক্ষা হওয়া একান্ত বাঞ্ছনীয়। মানব জীবনকে সুন্দর, গৌরবময়, উদ্দেশ্যবহ, তাৎপর্যপূর্ণ ও সার্বিক সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানোর জন্য মানুষের অবশ্যই একথা বিশ্বাস করতে হবে, পরিবর্তন জীবনের জন্য এবং পরিবর্তন পরিবর্তনের জন্য নয়–যেমন পাশ্চত্যের বস্তুবাদী বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন।
একটু বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে, জীবনের সর্বক্ষেত্রে যেমন– তত্ত্বগত, ব্যবহারিক, পার্থিব, অপার্থিব, বস্তুতাত্ত্বিক, আধ্যাত্মিক, বস্তুগত উপাদান ও শক্তিসমূহের উন্নতির মাধ্যমে জাতীয় সংস্কৃতি ও ব্যক্তিগত চরিত্রের উন্নতি সাধন করা। এটা করার একমাত্র উপায় হচ্ছে–মানববিদ্যা, কলা, বিজ্ঞান ও প্রকৌশলবিদ্যা। সাধারণত: মানববিদ্যা ও কলা ব্যক্তির আধ্যাত্মিকতার এবং বিজ্ঞান ও প্রকৌশলবিদ্যা বস্তুর উন্নতি সাধন করে। শিক্ষা–দীক্ষা হচ্ছে সামাজিকরণের একটি প্রাচীনতম সর্বজন স্বীকৃত পদ্ধতি যা মানুষের মূল্যবোধ ও জীবন পদ্ধতিকে অত্যন্ত বিকশিত ও সুদৃঢ় করে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার ফলে সৌন্দর্য সর্বতোভাবে বৃদ্ধি পায় এবং মার্জিত ও গতিময় হয়। যদি মানুষ প্রভু এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যাকে ভৃত্য হিসেবে পরগণিত করা হয় এবং তার উপর ভিত্তি করে একটি পদ্ধতি বিকাশ লাভ করে তবেই কেবলমাত্র প্রকৃত ও প্রয়োজনীয় ভারসাম্য রক্ষা পায়। অন্যথায় নাস্তিক্যবাদী বস্তুতন্ত্র ও ভারসাম্যহীন পারমানবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা কেবলমাত্র মানুষকে আত্মঘাতী পথে পরিচালিত করবে যা সমগ্র বিশ্বের শান্তি, স্থায়িত্ব ও মানবিক মূল্যবোধ সমূহের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
আজকের চলমান বিশ্বে বৈজ্ঞানিক উন্নতি ও প্রযুক্তিক অগ্রগতির কারণে আধ্যাত্মিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, বস্ততাত্তিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এমনকি সর্বক্ষেত্রে আধুনিকীকরণের রীতিনীতি সর্বজন স্বীকৃত রীতিনীতি হিসেবে প্রবর্তিত হয়ে আসছে। এ পদ্ধতির ফলশ্রুতিতে সমাজে পরিবর্তনের ধারা প্রবাহিত হচ্ছে। অগ্রগামী পাশ্চাত্যই এ পদক্ষেপ স্থাপনকারী এবং পরিবর্তন সূচক প্রাচ্যের দেশসমূহ হচ্ছে তার অনুকরণকারী। প্রাচ্যের নিরীহ, সমৃদ্ধ, গৌরবময় ও দীর্ঘ ঐতিহ্যবাদী পরিবর্তনশীল সামাজের সবচেযে বড় সংকট হচ্ছে তাদের স্বীয় সমৃদ্ধশালী আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারকে হারিয়ে, ভাল–মন্দ যাচাই না করে পাশ্চাত্যের উন্নতি, অগ্রগতি ও আধুনিকতাকে গ্রহণ করা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার অগ্রগতির কারণে বস্তুতাত্ত্বিক পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। তাকে বাদ দিয়ে আধ্যাত্মিক উন্নতির স্থায়িত্বকে নিশ্চিতকরণ–এখন একটা বিরাট সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে জীবন ও বিজ্ঞান উভয়ের আধুনিকীকরণ অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়েছে।
মানুষের মৌলিক প্রয়োজন সম্পর্কে বলতে গেলে আমাদের বস্ততাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক উভয়দিককে স্মরণ রাখতে হবে। মানব জীবনকে সমৃদ্ধশালী করার জন্য উভয়দিকের ভারসাম্য রক্ষা করে আধ্যাত্মিকতাকে ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে। মানব জীবন সদা পরিবর্তনশীল, কিন্তু এর মৌলিক মানবীয় মূল্যবোধগুলো যেমন– প্রেম, প্রীতি, ভালবাসা, স্নেহ, মায়া, মমতা, সহানুভূতি, বদান্যতা, মানবতা, সততা, সরলতা, ন্যায়–নিষ্ঠা, সাধুতা, ভ্রাতৃত্বতা, সাহস, স্বাধীনতা, সৌন্দর্য, মহানুভবতা, পরোপকারিতা, বিশ্বস্ততা ইত্যাদি চিরন্তন এবং এগুলো মানব জীবনের একদিকে নয় বরং সর্বক্ষেত্রে বিকশিত হয়ে মানুষকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা ‘সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ’ হিসেবে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করে।
উন্নতমানের ভারসাম্যপূর্ণ নিপুন শিক্ষা–দীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যাকে যদি জীবন ও এর মৌলিক মূল্যবোধের আজ্ঞাবহ করে একটি সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যায় তবে জীবনের গুণাগুণ গুলো বা সুকুমার বৃত্তিগুলো অধিকতর সমৃদ্ধশালী হয়ে প্রস্ফুটিত হবে। জাতীয় রীতিনীতি অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় আদর্শে অবশ্যই আধ্যাত্মিক শক্তিকে বস্তুতাত্তিক শক্তির উর্ধ্বে প্রাধান্য দিতে হবে। আজকের বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হচ্ছে মানব জীবনের সর্বস্তরে অর্থাৎ ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে মানব জাতির চিরন্তন আদর্শকে বাস্তব উপস্থাপনার মাধ্যমে প্রয়োগ করা।
এ মহাবিশ্ব কি যে কোন মুহূর্তে বিনা নোটিশে স্তব্ধ হয়ে যাবে? হতেও পারে। কারণ মারাত্মক বোমা এখন মানুষের হাতে। যে জানে এই পাপী সভ্যতা আত্মহত্যা করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এখন সেই বড় নিরাপত্তাহীন। আজ পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই মারাত্মক বিপদ। কারণ তার সব কিছু নির্ভর করছে হয়তো বা একটি কমিটি অথবা একজন প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর সিদ্ধান্তের উপর। তা আরও নির্ভর করছে একজন বোমারু অথবা সৈনিকের ইচ্ছা, অনিচ্ছা, ভূল–ভান্তি ইত্যাদির উপর। যদি কোন প্রকারে অপরপক্ষ প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ পায় তবে এই গ্রহটি বিস্ফোরিত হয়ে জীবন ও অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো আকাশে মিশে যাবে। পৃথিবীকে দৃঢ়ভাবে কঠিন আবরণে আচ্ছাদিত করে রাখলেও পঞ্চাশ হাজার বছরের সভ্যতাকে পাঁচ মিনিটের কম সময়ে ধুলিস্যাৎ করে দিতে পারে।
সে যাই হোক, এই মারাত্মক অবস্থাকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়? ভাল বিবেকের মাধ্যমে? অথবা আন্তর্জাতিক শান্তি, ন্যায় বিচার বা ভ্রাতৃত্ববোধের প্রতি সম্মান প্রদশৃন করে?
এমনিভাবে কখনও তা হতে পারে না। কারণ বিশ্বাসঘাতকদের এ ধরনের কোন প্রকার বিবেচনা বা সৌজন্যবোধ নেই। তাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সমযগুলো আত্মপুজায় ব্যয় হয়ে থাকে। আবেগের বশতবতী হয়ে তারা আঘাত করলেও সাথে সাথে তারা প্রতিশোধের ভয়ে ভীত থাকে। সর্বশক্তিমান আল্লাহকে অশেষ ধন্যবাদ এই জন্য যে, তিনি একাধিক পারমাণনবিক শক্তির প্রতিভূ সৃষ্টি করে তাদের পরস্পরের জন্য ভয়ংকর করে দিয়েছেন। এছাড়া আরও একটা বিপদ হচ্ছে–আভ্যন্তরীণ শ্বেত পোকা অর্থাৎ পরাশক্তির গুপ্তচর বা লেজুড় শক্তি।
মানুষ যদি অস্ত্র প্রসারে অত্যন্ত পরিণামদর্শী না হয় তবে নিশ্চিতরূপে এ বিশ্বে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধবে। মানুষে–মানুষে, জাতিতে–জাতিতে শোষণের যে বিষবাস্প ছড়ানো হচ্ছে তাতে মানুষ তার সবকিছু হারিয়ে ফেলবে। অত্যাচার, অনাচার, দুর্নীতি, বেকারত্ব, অজ্ঞতা, যৌন অরাজকতা ও ধনপূজা মানব জীবনকে অত্যন্ত মারাত্মক শোচনীয় অবস্থায় এনে ফেলেছে। বস্তুতান্ত্রিক বিলাসিতা মানুষকে পঞ্চেন্দ্রিয়ের দাস করে ফেলেছে এবং আত্মার অনুভূতি, মনের শান্তি ও সুকুমার বৃত্তিগুলো সে হারিয়ে ফেলেছে। প্রকৃতপক্ষে মানুষ স্বর্গীয় আভাচ্যুত হয়ে স্নায়ুবিক দুর্বলতা, রক্তচাপ ও জীবনের ভারসাম্য হীনতায় ভুগছে। ফলে আনন্দ ও নিরাপত্তার অনুভূতি সে হরিয়ে ফেলছে।
মানুষ চাঁদকে জয় করেছে; কিন্তু সে তার নিকটতম ও নিকৃষ্টতম শত্রু ‘শয়তানকে’ জয় করতে পারিনি। যতই মানুষ দূরত্ব, প্রকৃতি ও মহাবিশ্বের ওপর বেশী নিয়ন্ত্রণ লাভ করছে ততই বেশী সে ছোটখাট অভ্যন্তরীণ থেকে কুটনৈতিক সমস্যার মধ্যে পরিবেষ্টিত হচ্ছে। সে এখন বিশ শতক শেষ করে একুশ শতকে এসে পৌঁছেছে। গত শতকের সেরা উপহার হিসেবে মানুষ পেয়েছে উড়োজাহাজ, সিনেমা, রেডিও, টেলিভিশন, আনবিক ও সৌরশক্তিদ্বয়, চন্দ্রাভিযান ও কম্পিউটার। এগুলোর সাথে সে আরও পেয়েছে দুটো মহাযুদ্ধ, ডজন খানেক ছোট বড় যুদ্ধ এবং হিরোসিমা, ভিয়েতনাম, ফিলিস্তিন, আরাকান ও কাশ্মীরের মতো কিছু ট্রাজেডী। গত একশ বছরে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রকমের অসংখ্য অপরাধ, বিবাহ বিচ্ছেদ, পিতাবিহীন এমনকি মাতাবিহীন সন্তান জন্ম, যৌন অনাচার, আত্মহত্যা, অর্থনৈতিক নৈরাজ্য, অনাকাঙ্খিত বিপ্লব, দুর্ভিক্ত, বন্যা, মারাত্মক ব্যাধিসমুহ এবং হয়নি এমন কিছু নেই। বস্তগত দিক থেকে বিশ শতকের মানুষের চেয়ে একুশ শতকের মানুষের অনেক বেশী উন্নতি লাভ করেছে সত্য, কিন্তু সে কি তার প্রপিতামহের চাইতেও বেশী সুখী, স্বাস্থ্যবান এবং নিরাপদ জীবনের অধিকারী?
আজকের মানুষ ভাল করেই জানে যে, সে নিজে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে মহাবিপদের সম্মুখীন। কিন্তু সে কি নিজেকে এই ভয়ানক ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে পারবে, যা সে নিজেই সৃষ্টি করেছে? সে যাই হোক, অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে সেই ভয়ংকর ধ্বংলীলার মোকাবিলা করার জন্য বহু পদক্ষেপ গ্রহণ করছে যদিও তা আজ পর্যন্ত তেমন ফলপ্রসু হয়নি।
একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে অন্য একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের হুকুমে তার সামরিক বাহিনী গ্রেফতার করে সে দেশে নিয়ে গেছে। সারা বিশ্ব তা শুধু তাকিয়ে দেখল। তেমন কোন প্রতিবাদ হয়নি। আধুনিক পারমাণবিক শক্তির মোড়লীপনার জঘন্যতম উদাহরণ এটা। ইরান–ইসরায়েল যুদ্ধ মানব জাতিকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে। ইসরায়েল সমগ্র বিশ্বের জন্য, মানব জাতির জন্য এবং মানব সভ্যতার জন্য ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম অভিশাপ। এটা থেকে এ বিশ্বকে বাঁচাতে হলে মানববিদ্যা চর্চা এবং এর গবেষণায় মানব জাতিকে অধিকতর মনোযোগী হতে হবে এবং তার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করতে হবে।
লেখক : শিক্ষাবিদ; উপাচার্য, বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়










