মানবতার আশ্রয়কেন্দ্রে অপরাধের চাষাবাদ

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী | শনিবার , ১৪ মে, ২০২২ at ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ

১১ মে ২০২২ গণমাধ্যম সূত্রমতে, ‘বাংলাদেশের ভেতরে স্বাধীন রাষ্ট্রের পরিকল্পনা ও হাজার কোটি টাকার অস্ত্র আনছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী’ শিরোনামে সংবাদ পরিবেশনের জন্য একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার কার্যালয় বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা। অস্ত্র চালানের মূলহোতা রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী নবী হোসেনের পক্ষ থেকে এই হুমকি দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে আরও প্রকাশিত যে, উখিয়ার ২২ নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানরত নবী বাহিনীর কাছে অর্ধশতাধিক ভারী ও অত্যাধুনিক অস্ত্র এসেছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। ১৪ আর্মড পুলিশের অধিনায়ক এসপি নাইমুল হক’র বক্তব্য অনুসারে, নবী হোসেন ও মাস্টার মুন্না দুজনই বড় মাপের সন্ত্রাসী ও মোস্ট ওয়ান্টেড। এই ধরনের ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের লক্ষ্যে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের নানামুখী তৎপরতায় শুধু কক্সবাজার-বাংলাদেশ নয়; পুরো দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সমগ্র নাগরিকের হৃদয়ে অদৃশ্য-অজানা রহস্যাবৃত আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে প্রবল জনশ্রুতি প্রচলিত। দীর্ঘকাল চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যর্থতা এদের অধিকতর জঘন্য অপরাধ সংঘটনে উৎসাহিত করছে কিনা তার বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ অত্যাবশ্যক।
বিশ্ববাসীসহ দেশের আপামর জনগণ সম্যক অবগত আছেন, বাংলাদেশ সরকার বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার উদার মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে গণহত্যা থেকে রোহিঙ্গাদের প্রাণরক্ষায় এদেশে সকল সুযোগ-সুবিধাসহ নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় এটি সুস্পষ্ট; কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফ থানা এলাকায় আশ্রিত ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সময়ের আবর্তনে কদর্য অপরাধপ্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতি নগণ্য ঘটনা থেকে ভয়াবহ সংঘর্ষে জড়াচ্ছে রোহিঙ্গারা। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড-হত্যা- ডাকাতি- অপহরণ- মুক্তিপণ আদায়- আধিপত্য বিস্তার- চাঁদাবাজি- পূর্ব শত্রুতার জের- মাদক- অস্ত্র ও মানবপাচারসহ বহুমাত্রিক অপরাধের অভয়ারাণ্য হয়ে উঠেছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো। ইয়াবা চালান- মজুত ও লেনদেনের নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে এসব ক্যাম্প। গড়ে উঠেছে ছোট ছোট সন্ত্রাসী বাহিনী ও অস্ত্র তৈরির কারখানা। এসব সন্ত্রাসী বাহিনী রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও আশেপাশের এলাকায় নির্বিঘ্নে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এমনকি বিরোধে জড়িয়েছে এলাকার স্থানীয় জনসাধারণের সাথেও।

জেলা পুলিশের ভাষ্যমতে, রোহিঙ্গারা খুন, ডাকাতি, চুরি, ধর্ষণ, ইয়াবা-মানবপাচার, নির্যাতন, ফসলি জমি দখলসহ ১৭ ধরনের অপরাধে জড়িত। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটিজিত স্টাডিজের (বিআইআইএসএস-বিস) মহাপরিচালক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, ‘বিশ্বব্যাপীই শরণার্থীরা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তারা মানব-মাদকপাচারসহ নানা অপরাধ করে থাকে। আবার স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রের সদস্যরা এদের আর্থিক প্রলোভন বা মোটিভেট করে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীতে পরিণত করে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেটা ভিন্ন সেটা হলো এরা ইয়াবা কারবারেও জড়িত। কারণ এদের উৎস দেশ (মিয়ানমার) এবং ক্যাম্পগুলো মাদক চোরাচালান রুটের খুব কাছাকাছি। তাই তাদের অপরাধ পুরোপুরি দমন করা সম্ভব না হলেও আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’

টেকনাফ-উখিয়া এলাকার স্থায়ী বাসিন্দাদের মতে, ছাগল-মুরগি ও মোবাইল ফোন চুরি থেকে শুরু করে এমন কোনো অপকর্ম নেই রোহিঙ্গারা করছে না। তারা ফসলি জমি, ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তি নষ্ট করছে। ফলশ্রুতিতে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এনজিওরা রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছাসেবী নামে তুলনামূলক কম বেতন/চুক্তিভিত্তিক শ্রমে খাটাচ্ছে। গত দুই বছরে হঠাৎ করে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় কিছু সংখ্যক মানুষ লাভবান হলেও বিপাকে স্থানীয় বেশিরভাগ জনগোষ্ঠী। ২০১৮ সালে প্রকাশিত বেসরকারি সংস্থার গবেষণা অনুসারে, রোহিঙ্গাদের কারণে ৪৩ শতাংশ স্থানীয় জনগোষ্ঠী বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মারাত্মক বিপর্যয় ঘটেছে কক্সবাজারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও আইনশৃঙ্খলাসহ স্থানীয় অর্থনীতিতে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও অভিযানেও রোহিঙ্গাদের নানাবিধ অরাজকতা প্রতিহত করা অনেকটা দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিশাল আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নানামুখী অপকর্ম কক্সবাজারসহ পুরো অঞ্চলকে দুর্বিষহ ও বিপর্যস্ত করে চলেছে। তাদের এমন হীন-সহিংস কর্মকাণ্ড প্রশাসনের পাশাপাশি এলাকার স্থায়ী বাসিন্দাদেরও উদ্বেগ-উৎকন্ঠার কারণ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশের পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে ২০২১ সালের ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত টেকনাফ ও উখিয়া থানায় ৮৯ জন রোহিঙ্গা খুন হয়েছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৮০টি। হতাহতের ঘটনা ছাড়াও বিভিন্ন সময় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো থেকে দেশী-বিদেশি অস্ত্র উদ্ধার করা অব্যাহত রয়েছে। কক্সবাজার জেলা পুলিশের হিসাব অনুযায়ী ২০১৮ সালে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে টেকনাফ ও উখিয়া থানায় অস্ত্র মামলা হয়েছিল ১৩টি। ২০১৯ ও ২০২০ সালে হয়েছে যথাক্রমে ১৭টি ও ২৭টি। ২০২১ সালের অক্টোবর পর্যন্ত হয়েছে ১৫টি অস্ত্র মামলা। উল্লেখিত সময়ে তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১৪টি দেশীয় পিস্তল, ৪৪টি এলজি, তিনটি বিদেশি পিস্তল, ৩০টি একনলা বন্দুক, ২৫টি দেশি বন্দুক, ৪টি পাইপগান এবং প্রচুর পরিমাণ ধারালো অস্ত্রসহ সর্বমোট ১২৩টি অস্ত্র। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির মধ্যেও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কী করে অস্ত্র আসছে সেটি বড় মাপের জিজ্ঞাসা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, ভারত ও মিয়ানমারের অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে আসা অস্ত্র যাচ্ছে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের কাছে। তবে এসব অস্ত্রের প্রধান উৎস মিয়ানমার।

রোহিঙ্গাদের মধ্যে অস্ত্রের বিস্তার নিয়ে সম্মানিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে বিভিন্নভাবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিবেশ অস্থির করার জন্য এখানে অস্ত্র আসছে। অস্ত্র নিয়ে তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে বিভিন্ন গ্রুপ মারামারি করছে। ৩০ এপ্রিল ২০২২ গণমাধ্যমে প্রকাশিত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীগোষ্ঠী কর্তৃক হাজার কোটি টাকার অস্ত্র আনার খবর উদ্বেগ-উৎকন্ঠার মাত্রা প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। ২৩ অক্টোবর ২০২১ গণমাধ্যম সূত্রে রোহিঙ্গা শিবিরে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে ২৩ অক্টোবর ২০২১ পর্যন্ত উল্লেখ্য দু’টি থানায় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ১ হাজার ৩৬৮টি মামলা হয়েছে। এগুলোতে আসামি করা হয় ২ হাজার ৩৭৮ জনকে। যাদের মধ্যে ১ হাজার ৭৫৫ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, মূলত অস্ত্র-মাদক-ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ-অবৈধ অনুপ্রবেশ-অপহরণ-পুলিশের উপর হামলা-ডাকাতি ও ডাকাতির প্রস্তুতি-হত্যা এবং মানবপাচারের অপরাধে এসব মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ৭০৬টি মাদক মামলা। ২০১৭ সাল পরবর্তী সময়কাল থেকে ক্যাম্পগুলোতে মাদক অপরাধ বেড়েই চলেছে। ২০১৮ সালের মে মাসে দেশব্যাপী শুরু হওয়া মাদকবিরোধী অভিযানে কক্সবাজারে বিভিন্ন বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়া ২৭৯ জনের মধ্যে ১০৯ জন রোহিঙ্গা। নিহতদের মধ্যে ৩ জন ছিল রোহিঙ্গা নারী। ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে অস্ত্র-মাদক-মানব পাচার রোধে মিয়ানমার সীমান্তে গুলি চালানো হবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ইয়াবা কারবারের পাশাপাশি সম্প্রতি আশ্রিত রোহিঙ্গারা অনেকে জড়াচ্ছেন সর্বনাশা মাদক আইস ব্যবসায়। কক্সবাজারের স্থানীয় কিছু ব্যক্তির যোগসাজসে তারা বিভিন্ন উপায়ে দেশে আইসের চালান আনছে। গোয়ান্দা সূত্র মতে, নাফ নদী ও টেকনাফের সমুদ্রসীমানার দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত দিয়ে মাছ ধরার ট্রলারে আসছে আইস। এদেশে থাকা রোহিঙ্গা মাদক কারবারিরা মিয়ানমারের কারবারিদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে। মিয়ানমারের মোবাইল নেটওয়ার্ক কক্সবাজার শহরের কলাতলী বিচ পর্যন্ত কাজ করায় এক্ষেত্রে দুই পক্ষই মিয়ানমারের সিম ব্যবহার করে। ফলে দেশে আসা মাদকের চালান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে ধরা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ১৬ অক্টোবর ২০২১ ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে আইসের সবচেয়ে বড় পাঁচ কেজির চালান ধরা পড়ে। এসময় দুইজন মাদক কারবারী র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়। গোয়েন্দাদের মতে, এই চক্রে প্রায় ছয়জন প্রধান হোতা রয়েছে। গত ৮ মে নাফ নদী সীমান্ত হয়ে মাদকের চালান নিয়ে সাঁতার কেটে আসার সময় বিজিবি সদস্যরা অভিযান চালিয়ে ১ কোজি ৬০ গ্রাম আইস ও ১০ হাজার পিস ইয়াবাসহ এক রোহিঙ্গাকে আটক করে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রমতে, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে টার্গেট করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে মানবপাচারকারী চক্র। যাদের মূল টার্গেট হলো অবিবাহিত রোহিঙ্গা নারী। ক্যাম্পের অভ্যন্তরে নানান নির্যাতনের শিকারে পরিণত হওয়া এসব রোহিঙ্গা নারীদের অধিকাংশকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হচ্ছে। জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় এক লাখের ওপরে রোহিঙ্গা বসবাস করছে। যাদের মধ্যে রোহিঙ্গা নারীর সংখ্যা অতি নগণ্য। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মাঝিদের বর্ণনামতে, মালয়েশিয়ায় বসবাসরত পুরুষ রোহিঙ্গারা স্থানীয় মেয়েদের বিয়ে করতে না পারায় সেখানে রোহিঙ্গা নারীর সংকট তৈরি হয়েছে। এই সুযোগটি ব্যবহার করে দালাল চক্রের সদস্যরা ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে নারীদের প্রলোভন দেখাচ্ছে। যেহেতু এখানে সবাই খুব কষ্টে থাকে, তাই একটু ভালো থাকার আশায় রোহিঙ্গা নারীরা সহজেই দালালদের ফাঁদে পড়ে মালয়েশিয়ায় যেতে রাজি হয়ে যায়।
অনিয়ন্ত্রিত অপরাধ, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব ও নিরাপত্তার অভাবে সব সময়ই রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দারা আতঙ্কে দিনযাপন করছে। বেশিরভাগ রোহিঙ্গাদের অভিমত হচ্ছে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) সশস্ত্র দলগুলোর তৈরি করা ত্রাসের রাজত্বের কারণে সম্প্রতি ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তার পরিবেশ অত্যন্ত নাজুক। উখিয়ার ৭নং ক্যাম্পের একজন বাসিন্দা বলেন, ‘আমরা নিজেদের জীবন বাঁচাতে দেশ ছেড়ে এখানে এসেছি। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, আমাদের ভাগ্যের খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। এখানেও আমরা সারাক্ষণ ভয়ে আছি। সূর্য ডোবার আগেই আমি আমার দোকান বন্ধ করে ঘরে ফিরে যাই। সন্ধ্যা নেমে আসার পর অপরাধী দলগুলো টহলে বের হয় এবং ক্যাম্প একটি ভয়ংকর রূপ ধারণ করে।’ বাসিন্দাদের মধ্যে ভরসার এতটাই অভাব যে, তারা পাশের বাড়ির প্রতিবেশীর সঙ্গেও খুব একটা কথা বলে না। বাসিন্দারা আরও জানায়, ক্যাম্পের সব জায়গায় অপরাধীরা আছে এবং তারা রোহিঙ্গাদের চলাফেরার ওপর নজর রাখে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কারো নেই। দিনের বেলায় সব কিছু শান্ত মনে হলেও সূর্যাস্তের পর পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়।

রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ সংকটে রূপান্তরিত। ক্যাম্পের ভেতরে একটি পক্ষ অপরপক্ষকে কাফের বা বিশ্বাসঘাতক হিসেবে সন্দেহ করে। ক্যাম্পের অভ্যন্তরে অনেকে আছে যারা মিয়ানমার বাহিনীর কাছে তথ্য পাচার করে। তৎপর সশস্ত্র গোষ্ঠীর কথা না শুনলে পরিণতি হয় খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এই সশস্ত্র গোষ্ঠী ক্যাম্পের ভেতর তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়। স্থানীয় প্রশাসনের এক কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, ‘ক্যাম্পের ভেতরে একটি কথা প্রচলিত আছে, ক্যাম্প দিনের বেলায় বাংলাদেশের আর রাতের বেলায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর। এটা এখন ওপেন সিক্রেট। এই সশস্ত্র গোষ্ঠী চায় না যে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যাক। তারা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে রেখে তাদের কর্মকান্ড চালিয়ে যেতে চায়। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেবার পর সে গোষ্ঠী অনেক রোহিঙ্গাকে ভয়ভীতি দেখিয়েছে যাতে তারা ফিরে যেতে রাজি না হয়।’ অতিসম্প্রতি সমুদ্রসৈকত ও আশেপাশের এলাকায় অবস্থান নিয়ে রোহিঙ্গারা পর্যটকদের উৎপাত করার অভিযোগে ৪৭৬ রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে। আটকদের বেশির ভাগই হচ্ছে শিশু। রোহিঙ্গাদের এই অবাধ চলাফেরা পর্যটন নগরী খ্যাত কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প বিকাশে নবতর অন্তরায় রূপে আবির্ভূত হয়েছে। সামগ্রিক দৃশ্যপট নিবিড় পর্যালোচনায় আশু-স্বল্প-দীর্ঘমেয়াদী প্রায়োগিক পরিকল্পনা ও কূটনৈতিক বিচক্ষণতায় সার্থকতা-সফলতা অর্জনে ব্যত্যয় ঘটলে দেশ অপরিমেয় দুর্ভেদ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে- নিঃসন্দেহে তা বলা যায়।

লেখক : শিক্ষাবিদ, সাবেক উপাচার্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়