মাদক মামলার আসামিদের জন্য জঙ্গল সলিমপুরে আলাদা কারাগার করা হবে বলে জানিয়েছেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। তিনি বলেন, আমাদের জেলের যে কাঠামো তাতে মাদক মামলর আসামিদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই। জঙ্গল সলিমপুরে নতুন কারাগার করার যে পরিকল্পনা ও আলোচনা চলছে সেখানে মাদক সংক্রান্ত আসামিদের জন্য আলাদা একটি কারাগারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যাতে তারা সাধারণ কয়েদিদেরকে আবার ওই ব্যবসার মধ্যে নিতে না পারে। কারণ আমরা যারা জেল খেটেছি তারা জানি, জেলখানার ভেতরের অবস্থাটা কি রকম, এটা বাইরে থেকে বা যারা কারাবরণ করেননি তারা বুঝতে পারবেন না। দেখা যায়, কোনো ভালো ছেলে মারামারি বা অন্য সাধারণ মামলায় কারান্তরীণ হয়েছে, পরে বের হয় একটা মাদক চক্রের সাথে জড়িয়ে যায়। এ জায়গায় আমাদের আরো অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে।
তিনি গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের মাদকবিরোধী সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। চট্টগ্রাম পুলিশ লাইন সিভিক সেন্টারে ‘মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে সম্মিলিত অঙ্গীকার’ প্রতিপাদ্যে সমাবেশে প্রধান আলোচক ছিলেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী। স্বাগত বক্তব্য দেন, চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম। বক্তব্য দেন, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন।
মীর হেলাল বলেন, বাংলাদেশে যতগুলো সামাজিক অপরাধ হচ্ছে, যতগুলো অত্যন্ত নৃশংস ঘটনা ঘটছে তার অধিকাংশের পিছনে মাদকের সংশ্লিষ্টতা আছে। ইদানিং একটি গোষ্ঠীর কথা খুব আলোচিত হয় এবং এই শব্দটিও খুব বিব্রতকর– কিশোর গ্যাং। এটার পেছনেও সবচেয়ে বড় ভূমিকা মাদকের। যারা মাদকের ব্যবহার করছে তারা নিজেকে এবং সমাজকে একটি বিকৃত মনস্তত্ত্বের জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে। মাদক মানুষের স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি ও মন–মানসিকতাকে বিকৃত করে এবং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কে নেবে? পুলিশ নেবে? এটা সম্ভব না। আইনজীবীরা নেবে? বিচারকরা নেবে? এটাও সম্ভব না। এটার জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা। পুলিশ, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইনজীবী, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিকসহ সমাজের সকল শ্রেণি–পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করতে হবে।
মীর হেলাল বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে একে অপরের উপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে চলবে না। প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। মাদকসংক্রান্ত মামলাগুলো আইন ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসা, পরিবহন ও সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কোনো ধরনের অন্যায় সুবিধা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে তাদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি মাদকের কুফল ও ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত সচেতনতামূলক বক্তব্য দেয়ার জন্য ধর্মীয় নেতা ও আলেম–ওলামাদের প্রতি আহ্বান জানান। প্রতিমন্ত্রী বলেন, শিক্ষকদেরও শিক্ষার্থীদের মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে এবং সংবাদকর্মীদেরও মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন জোরদারে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখাতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কিশোর ও তরুণ সমাজকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে দূরে রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের জন্য তৃতীয় ও চর্তুথ ভাষা শেখার সুযোগ, খেলাধুলাকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। পাশাপাশি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে শিক্ষার্থী, কিশোর ও তরুণদের মাদকের ভয়াবহ পরিণতি থেকে দূরে রাখা যায়।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী মাদকবিরোধী কার্যক্রমে আইনশৃক্সখলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে মাদক ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি মাদকের চাহিদা সৃষ্টির কারণগুলোও মোকাবিলা করতে হবে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, মাদক একটি ব্যক্তি বা পরিবারের সমস্যা নয়, এটি সমাজ, আইনশৃক্সখলা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বড় হুমকি। মাদক নিয়ন্ত্রণে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম এবং সর্বস্তরের জনগণের সম্মিলিত ভূমিকা অপরিহার্য।












