মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ও তাঁর অবদান

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান

বৃহস্পতিবার , ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৩:৫৯ পূর্বাহ্ণ
113

মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ছিলেন ইসলামী চিন্তাবিদ, শ্রেষ্ঠ আলেম, বিশিষ্ট আরবি ভাষাবিদ, মহান পণ্ডিত, গ্রন্থকার, প্রবন্ধকার, অতুলনীয় বাগ্মী, ধর্মপ্রচারক, শিক্ষাদরদী, বাংলার প্রখ্যাত রাজনীতিক, আযাদী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ, দূরদর্শী রাজনীতিবিদ, বাংলা সাংবাদিকতার অন্যতম দিশারী, একনিষ্ঠ সমাজ-সেবক, সমাজ সংস্কারক, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা এবং দেশ ও জাতির কল্যাণকামী আপসহীন ব্যক্তিত্ব। আধুনিক শিক্ষায় স্বল্প শিক্ষিত হলেও তিনি ছিলেন প্রবল আত্মোপলব্ধি ও দূরদৃষ্টি সমপন্ন ছিলেন। তিনি অনেক ঐতিহ্যবাহী মাদ্‌রাসার শিক্ষক ছিলেন। মুসলিম পুনর্জাগরণবাদী হিসেবে তাঁর কর্মকাণ্ডের জন্যই তিনি মূলত খ্যাতি লাভ করেন। অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি সাংবাদিকতা এবং জনসাধারণের মধ্যে বক্তৃতাদানকে গণযোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন। মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর বহুমুখী অবদান রেখে গেছেন।
জন্ম ও নাম
মনিরুজ্জামান ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দের ২২ আগস্ট চট্টগ্রাম জেলার বর্তমান চান্দনাইশ উপজেলার বরমা ইউনিয়ানের আড়ালিয়া গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার নাম মনিরুজ্জাম। ইসলামাবাদের অধিবাসী হওয়ায় সমসাময়িকদের অনেকের ন্যায় তিনিও ‘ইসলামাবাদী’ নাম গ্রহণ করেন। ইসলামাবাদ মুসলিম যুগের চট্টগ্রামের সরকারি নাম। তার পিতার নাম মুনশী মুতিউল্লাহ্‌।
শিক্ষাগ্রহণ
মনিরুজ্জামান চতর গ্রামের জনৈক মৌলভীর নিকট প্রাথমিক শিক্ষাগ্রহণ করেন। তার পিতা-মাতার আগ্রহে উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি কলকাতার হুগলী সিনিয়ার মাদ্‌রাসায় ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে শশম (৬ষ্ঠ) শ্রেণিতে ভর্তি হন। সেখান থেকে ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে এফ.এম ফাইনাল পরীক্ষা পাস করেন। (সৈয়দ মোস্তফা জামাল (সম্পাদিত), মাওলানা ইসলামাদী, পৃ. ৮৯)। আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় শিক্ষা শেষ করে তিনি স্বাধীনভাবে জীবিকা নির্বাহের উদ্দেশ্যে রেভিনিউ আইন অধ্যয়ন করতে মনস্থ করেন। তিনি একদিকে মোক্তারি পরীক্ষা পাসের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন, আবার অন্যদিকে এ উপলক্ষে মাতৃভাষা (বাংলা) শেখার প্রচেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি নিজের আগ্রহে ইংরেজি, বাংলা, আরবি, ফার্সী ও উর্দু ভাষায় পড়াশোনা করে অসাধারণ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন এবং জবরদস্ত আলেম হয়ে ওঠেন। তিনি আধুনিক শিক্ষায় স্বল্প শিক্ষিত হলেও তিনি ছিলেন প্রবল আ্তোপলব্ধি ও দূরদৃষ্টি সমপন্ন ব্যক্তি। (মুহাম্মদ এনামুল হক, মুসলিম বাংলা সাহিত্য, পৃ. ৩১২-৩১৫)।
কর্মজীবন
শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করার সাথে সাথে তিনি হুগলী সরকারি মাদ্‌রাসায় চাকুরির প্রস্তাব পান, কিন্তু সরকারি চাকুরির প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল না। বিধায় তিনি উক্ত চাকুরি গ্রহণ করলেন না। তিনি সেখান থেকে রংপুরে আগমন করে রংপুর শহরের মুনশীপাড়া জুনিয়র মাদ্‌রাসায় হেড মৌলভী পদে যোগদান করে সেখানে ১৮৯৬-১৮৯৭ খ্রি. পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। এরপর তিনি রংপুরের জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার কুমেদপুর মাদ্‌রাসায় হেড মৌলভী পদে ১৯৯৮-১৯০০ খ্রি. পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন। মাদ্‌রাসাটি বন্ধ হয়ে গেলে তিনি চট্টগ্রাম ফিরে এসে সেখানে মৌলভী আবদুল আজিজ প্রতিষ্ঠিত মুসলিম বোডিংয়ে সুপারিন্টেনডেন্ট পদে ১৯০০ খ্রি. ৬ মাস কাজ করেন। এরপর সিতাকুণ্ড সিনিয়র মাদ্‌রাসার প্রধান শিক্ষক পদে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। (ড. মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ্‌, পূর্ব বঙ্গীয় রাজনীতিক উলামার জীবনী, পৃ. ১৭২-১৭৩)।
ইসলামাবাদীর স্বপ্ন ছিল মানুষ, সুন্দর-শিক্ষিত, উজ্জীবিত, কুসংস্কারবিহীন এক স্বাধীন সত্য মানুষ। সেই অনাগত মানুষের স্বপ্নে তিনি বিভোর থাকতেন। তার জন্য কেবলমাত্র বিতর্ক, বক্তৃতা ও প্রচার মিশনের কাজ করেই তিন ক্ষান্ত হতে না, আদর্শ প্রতিষ্ঠান, তার মধ্যে সুষ্ঠু পরিবেশ যাতে গড়ে ওঠে সে জন্যেও তিনি চেষ্টিত থাকতেন।
তাঁর চেষ্টা ও প্রেরণায় উত্তরবঙ্গে কয়েকটি স্কুল, মাদ্‌রাসা গড়ে ওঠে। শিক্ষাও যাতে বৈজ্ঞানিক তথা ব্যবহারিক জ্ঞানের ভিত্তিতে হতে পারে সে জন্যও তিনি নানা পরিকল্পনা ও ব্যবস্থার উদ্ভাবন করে তাকে কার্যকরি করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ইসলামাবাদী রংপুর থাকাকালেই মাদ্‌রাসা শিক্ষায় ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি ইংরেজি, বাংলা, গণিত এবং ইতিহাস ও ভূগোলের কিছু কিছু জ্ঞান শিক্ষা দেবার বিষয়ে সোচ্চার হয়েছিলেন।
মওলানা ইসলামাবাদীর শিক্ষকতা জীবন খুব দীর্ঘ নয়, রংপুর ও সীতাকুণ্ড মিলিয়ে দশ বছরের মত। রংপুরে করেছেন শিক্ষা-আন্দোলন, রাজনীতি, সমাজসেবা ও ধর্মপ্রচারের কাজ। সীতাকুণ্ডে নানা সামাজিক উন্নয়নূলক কাজ ও ইসলাম মিশন প্রভৃতির সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। এসময় তিনি যুগোপযোগী শিক্ষা গ্রহণের জন্য বাঙালি মুসলিমদের অনুপ্রাণিত করেন। রংপুর থেকে চট্টগ্রামে ফিরে তিনি পরিচিত হন শিক্ষাদরদী ব্যক্তি ও এ বিভাগের সরকারি কর্মকর্তা খান বাহাদুর আবদুল আজিজের সাথে। খান বাহাদুরের আহব্বানে যোগ দেন ভিক্টোরিয়া ইসলাম হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট পদে। এখানে থাকাকালে পরিচিত হন সীতাকুণ্ডের মাওলানা ওবায়দুল হকের সাথে। তাঁর আহবানে মওলানা ইসলামাবাদী এসে যোগ দেন, আত্মনিয়োগ করে মাদ্‌রাসা ও স্কুল প্রতিষ্ঠার কাজে। সীতাকুণ্ডে অবস্থানকালে মাওলানা ওবায়দুল হক ও মাওলানা জামালউল্লাহর সান্নিধ্যে থেকে তিনি অধিক কর্মমুখী হন এবং বার্মা থেকে কলকাতা-আসাম পর্যন্ত তাঁর প্রভাব ও পরিচিতি বিস্তার লাভ করে। অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম শিক্ষা কনফারেন্স আহব্বান, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি, প্রাদেশিক মোছলেম শিক্ষা সমিতি গঠন ও পরিবর্তীকালের আঞ্জুমান প্রতিষ্ঠার গোড়াপত্তন হয় এই সীতাকুণ্ডে থাকাকালে।
সাংবাদিকতা ও পত্রিকার সম্পাদক
সীতাকুণ্ড মাদ্‌রাসায় থাকাবস্থায় তিনি মিসরের ‘আল-মানার’ ও ‘আল-আহ্‌রাম’ নামক প্রসিদ্ধ পত্রিকায় আরবিতে প্রবন্ধ লিখতেন। অপরদিকে ভারতের দিল্লী ও লক্ষ্নৌর পত্র-পত্রিকায় উর্দু ভাষায় বহু সংখ্যক মূল্যবান প্রবন্ধ প্রকাশ হতে থাকে। পরবর্তীতে মাওলানা আকরম খাঁ সম্পাদিক কলকাতার উর্দু দৈনিক পত্রিকা যামানায়ও (১৯২০-১৯২৪ খ্রি.) তিনি বেশ কিছু সংখ্যক প্রবন্ধ লিখেছেন। এসব প্রবন্ধগুলোর মধ্যে কিছু প্রবন্ধ মাদ্‌রাসা শিক্ষা সংস্কারের পরামর্শ দেন। যেহেতু মাদ্‌রাসায় তখন কোনো প্রকার বাংলা পড়ানো হতো না, তাই তিনি দ্রুত বাংলা চর্চা করে স্বল্প সময়ের মধ্যে বাংলা ভাষায় সুন্দর প্রবন্ধ লেখার যোগ্যতা অর্জন করেন। (জুলফিকার আহগমদ কিসমতী, বাংলাদেশের কতিপয় আলেম ও পীর মাশায়েখ, পৃ. ৪৬)।
মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী বিশ্বাস করতেন যে, সংবাদপত্র হচ্ছে এ যুগের বড় প্রচার মাধ্যম, একটা জাতিকে জাগানোর জন্যে সংবাদপত্রের ভূমিকা অপরিসীম। সংবাদপত্র ছাড়া জাতিকে ঐক্যবদ্ধ এবং অগ্রসর করানোরও যায় না। স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্যে সংবাদপত্রের কোনো বিকল্প নেই। (মোশাররফ হোসেন খান, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, পৃ. ২৭)। এজন্যে তিনি দেশবাসীর মধ্যে আগে অধিকার সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সংবাদপত্র প্রকাশের সংকল্প মাদ্‌রাসায় বসেই গ্রহণ করেন। এজন্যই তিনি মাদ্‌রাসার শিক্ষকতা ছেড়ে সাংবাদিকতাপেশা গ্রহণ করার জন্য কলকাতায় গমন করেন। মুসলিম পুনর্জাগরণবাদী হিসেবে তাঁর কর্মকাণ্ডের জন্যই তিনি মূলত খ্যাতি লাভ করেন।
মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী কলকাতায় গমন করে রাজশাহীর বিশিষ্ট পণ্ডিত মির্জা ইউসুফ আলী প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘ছোলতান’ (১৯০৩ খ্রি.)-এর সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার যথাযোগ্য সম্পাদনায় পত্রিকাটি বাংলা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে। ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে বগুড়ার বানিয়ায় আঞ্জুমান-এ-ওলামা-এ-বাঙ্গালা প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তিনি উক্ত প্রতিষ্ঠানের জয়েন্ট সেক্রেটারি ছিলেন। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল-মে মুতাবিক ১৩২২ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে কলকাতায় ‘আঞ্জুমানের’ মুখপাত্র ‘আল-ইসলাম’ প্রকাশিত হয়। মনিরুজ্জামান বহুদিন পর্যন্ত এ পত্রিকাটির সম্পাদনা করে মুসলিম সাহিত্যের দুর্ভিক্ষের যুগে খ্যাতিমান মুসলিম লেখক গোষ্ঠী গঠন এবং ইসলামী সাহিত্য প্রণয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ‘বঙ্গীয় মুসলমান শিক্ষাসমিতি’ (১৯০৩ খ্রি.) এবং ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’ (১৯১১ খ্রি.)-এরও অন্যতমন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও উভয় সমিতির কার্যনির্বাহক কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মদী’র সম্পাদনা পরিষদে যোগদান করেন এবং এর পরিচালনায় মাওলানা আকরম খাঁর সহযোগিতা গ্রহণ করেন। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার ফার্সী পত্রিকা ‘হাবলুল মতিন’-এর বাংলা সংস্করণের সম্পাদন করে কিছুদিন। (আবদুল হক চৌধুরী, চট্টগ্রামের চরিতাভিধান, পৃ. ৬৮; ড. মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ্‌, পূর্ব বঙ্গীয় রাজনীতিক উলামার জীবনী, পৃ. ১৭৫)।
এছাড়া আঞ্জুমানে ওলামায়ে বাংলার মুখপত্র মাসিক ‘আল-ইসলাম’ পত্রিকারও তিনি সম্পাদক ছিলেন। এর বাইরেও তিনি একাধিক পত্রিকার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি নিজ দায়িত্বে দৈনিক ‘আম্বর’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে ইসলামাবাদী চট্টগ্রামে গমন করেন এবং সেখানে ইয়াতীমখানা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি চট্টগ্রাম থেকে ‘ইসলামাবাদ’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা কিছুদিন পরিচালনা করেন। (ড. মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ্‌, বাংলাদেশে খ্যাতনামা আরবিবিদ, পৃ. ১৪৬)।
আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা
চট্টগ্রামের দক্ষিণ মহকুমার কর্ণফুলীর তীরবর্তী দেয়াং পাহাড়ে আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ছিল তার আজীবন। ১৯১৫ সালে তিনি সেই লক্ষ্যে সরকার থেকে ৬০০ বিঘা জমি ও ওই এলাকার জমিদার আলী খান থেকে ৫০০ কানি ভূমি রেজিস্ট্রিমূলে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গ্রহণ করেছিলেন।
বিখ্যাত নেতা ও শিক্ষাবিদ শেরেহিন্দ মাওলানা শওকত আলী এ আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তি স্থাপন করেন। জঙ্গে জিহাদ, শাহ বদিউল আলম, শাহ জুলফিকার এ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রবল সমর্থক হন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সেক্রেটারি হিসেবে কাজ করার লক্ষ্যে ঐ সময় চট্টগ্রামে থাকতে রাজি হন। দেয়াং পাহাড়ের বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐ স্থান পরিদর্শনে এসে মুগ্ধ হন ভারতীয় সেরা রাজনীতিক মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা আকরম খাঁ, মুন্সী রিয়াজ উদ্দিন আহমদ, মাওলানা মোহাম্মদ আলী, মাওলানা শওকত আলী।
তিনি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি সত্য কিন্তু তবে বর্তমান বাংলাদেশ সরকার হাজারো আলেমের মনের ঐকান্তিক ইচ্ছার ফল স্বরূপ ‘ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। যাদ্বারা হয়তো আলেম সমাজের মনের বাসনা পূরণ লাভ করেছে বলে আমাদের বিশ্বাস।
রাজনীতিতে অংশগ্রহণ
মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে অন্যান্য জাতীয় নেতার মতই সর্বভারতীয় রাজনৈতিক সংগঠন কংগ্রেসে জড়িত ছিলেন। তিনি অসহযোগ, বঙ্গভঙ্গ রদ ও খিলাফত আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। তিনি প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সদস্য ছিলেন (১৯০৬)। ইসলামাবাদী ১৯২৩ সালের বেঙ্গল প্যাক্ট এর অন্যতম স্থপতি। বিশ শতকের ত্রিশের দশকে তিনি কংগ্রেসের রাজনীতি ছেড়ে কৃষক প্রজা পাটিতে যোগদান করেন। এই দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে তিনি ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামের সদর দক্ষিণ মহকুমা থেকে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। মাওলানা ইসলামাবাদী আঞ্জুমান-ই-উলামা-ই-বাঙ্গালার (১৯১৩) অন্যতম সংগঠক ছিলেন। এটি পরবর্তীকালে জামিয়াত-ই-উলামা-ই-বাঙ্গালাহ হিসেবে পরিচিত লাভ করে। আঞ্জুমানের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে বাংলা ভাষাকে জনপ্রিয় করে তোলা। তিনি জামিয়াত-ই-উলামা-ই-হিন্দ এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম টাউন ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে কংগ্রেস নীতির প্রতি ইসলামাবাদী আস্থা হারান এবং সুভাষ বসুর রাজনৈতিক আদর্শে আকৃষ্ট হন। তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের আগস্টে কংগ্রেসের ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে যোগদান করেন এবং ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে অক্টোবরে ‘আযাদ হিন্দ ফৌজ’-এর কার্যক্রমের প্রতি সক্রিয় সমর্থন জ্ঞাপন করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি চট্টগ্রাম-ঢাকায় বিপ্লবী কেন্দ্র স্থাপন করেন। ঐ দল গঠনের দায়ে ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের ১৩ অক্টোবর ইংরেজ সরকার অন্যান্য নেতার সাথে মাওলানা মনিরুজ্জামকে গ্রেফতার করা হয়। মিস্টার গান্ধী, জওহর লাল নেহ্‌রু নেতার সাথে তাঁকে দিল্লীর লালকিল্লায় বন্দি করে রাখেন। অতঃপর সেখান থেকে তাঁকে পাঞ্জাবে মিয়াওয়ালীর কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি জেল থেকে মুক্তি লাভ করেন। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী জমিয়ত-এ-উলামা-এ-হিন্দ-এর প্রাথীরূপে চট্টগ্রাম থেকে বঙ্গীয় আইন পরিষদের নির্বাচনে প্রার্থী হন।
সাহিত্যে তাঁর অবদান
সাংবাদিকতা, রাজনীতি ও সমাজ সেবায় তাঁর অবদানের কারণে সাহিত্যখ্যাতি অনেক চাপা পড়ে যায়। মুসলমানদের মধ্যে ইতিহাস-ঐতিহ্য চেতনা বৃদ্ধি, তাদের মধ্যে ঈমানী দৃঢ়তা সৃষ্টি এবং নিজেদের মধ্যে বৈষয়িক উন্নতি ও স্বাবলম্বিতার ভাবকে জাগ্রত করার জন্যে মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর চেষ্টার অভাব ছিল না। খ্রিস্টান মিশনারীদের হাত থেকে মুসলমানদের ঈমান রক্ষা করা এবং দুঃস্থ মানুষের সেবা করা, শিরক্‌, বিদআত ও সংস্কারমুক্ত খাঁটি ইসলাম জনগণের সামনে তুলে ধরা উদ্দেশ্যে তিনি বহু সংখ্যক গ্রন্থ রচনা করেন।
মুসলমানদের অধঃপতন এবং সীমাহীন দুঃখ-কষ্ট তাঁকে জর্জরিত করতো। মুসলমানের এসব লজ্জা ঢাকবার জন্যে মনিরুজ্জামান বলিষ্ঠ হাতে কলম ধারেন। তিনি সেই সময়ের বিখ্যাত পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত প্রবন্ধাদি লিখতেন। তিনি িছলেন তার সময়ের একজন শক্তিশালী লেখক। সম্পাদনা ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তিনি যেমন ছিলেন একজন বিখ্যাত, তেমনি লেখালেখির জগতেও মাওলানা মনিরুজ্জামান ছিলেন এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি বাংলা, উর্দু ও আরবি ভাষায় একজন সুপণ্ডিত ছিলেন। যার কারণে এ তিনটি ভাষাতেই লিখতেন। তাঁর লেখার পরিমাণও ছিল অনেক। তাঁর সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলমানের জাগরণ। সমসাময়িক কালে সকল রাজনৈতিক ঘটনার সাথে সংযোগ রেখেই লেখাকে তিনি সেভাবে উপস্থিত করেছেন। সমাজ চিন্তা ও রাজনীতির ক্ষেত্রে আত্মদানের তাকিদেই সাহিত্যিক মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। বস্তুত সাংবাদিকতার করার মাধ্যমেই তাঁর মধ্যে সাহিত্যের স্ফুরুন ঘটে।
রচনাবলী
মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর রচিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে মুসলমান জাতিকে নবরূপে নব উদ্দীপনায় অঙ্কুরিত করেছি। মুসলিম জাতিকে জাগিয়ে তোলার জন্য এবং তাদের মধ্যে আত্মসচেতনাবোধ সৃষ্টির মানসে তিনি ব্যাপক লেখালেখি শুরু করেন। জীবনের দীর্ঘ পরিক্রমায় তিনি ৪২ টির মত গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর লিখিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ১. কোরআনের স্বাধীনতার বাণী (কলকাতা প্রথম মুদ্রণ, ১৯৩৯ খ্রি., দ্বিতীয় মুদ্রণ চট্টগ্রাম ১৯৮০ খ্রি.), ২. কনষ্ট্যাণ্টিনোপোল কনস্টান্টিনোপল অর্থাৎ তুরস্ক রাজধানী মহানগরী কনস্টান্টিনোপলের বিশেষ বিবরণ (ইতিহাস, ১৯১২ খ্রি./১৩১৯ বঙ্গাব্দ), ৩. ভারতের মুসলমান সভ্যতা, (১ম খণ্ড, ইতিহাস, ১৫ জানুয়ারি ১৯১৪ খ্রি., কলকাতা), ৪. ভারতে ইসলাম প্রচার (ইতিহাস, ১৫ এপ্রিল ১৯১৫ খ্রি.), ৫. সমাজ সংস্কার (প্রবন্ধ, ১৯২৩ খ্রি./২৪ চৈত্র ১৩২৫ বঙ্গাব্দ), ৬. মহামান্য তুরস্কের সুলতান জীবনী (প্রথম সংস্করণ, ২৯ মে ১৯০১ খ্রি.), ৭. খাজা নেজামুদ্দীন আউলিয়া (জীবনী, প্রথম সংস্কর, ১৯৬১ খ্রি./১৩২৩ বঙ্গাব্দ), ৮. মুসলমানদের সুদ সমস্যা ও অর্থনীতির মৌলিক সমাধান (১৩১৫ বঙ্গাব্দ), ৯. নিুশিক্ষা ও শিক্ষাকর (প্রবন্ধ পুস্তিকা, জানুয়ারি ১৯৪০ খ্রি.) ১০. খগোল শাস্ত্রে মুসলমান, ১১. ভূগোল শাস্ত্রে মুসলমান (১৯১১-১২ খ্রি.), ১২. আওরঙ্গজেব, ১৩. মোসলেম বীরাঙ্গনা, ১৪. ইসলামের শিক্ষা (ধর্মীয় উপদেশমূলক প্রবন্ধ), ১৫. হযরতের জীবনী, ১৬. রোজনামচা, ১৭. পৌরাণিক ও বৈদিক যুগ, ১৮. ইসলাম ও রাজনীতি, ১৯. তাপসকাহিনী, ২০. শিল্পক্ষেত্রে মুসলমান (১৯১৫ খ্রি.), ২১. সামাজ সংস্কার (১৩২৬ বঙ্গাব্দ/অপর মতে ১৯২১ খ্রি.), ২২. রাজনীতির ক্ষেত্রে আলেম সমাজের দান, ২৩. শুভ সমাচার, ২৪. স্পেনের ইতিহাস, ২৫. বঙ্গীয় মুসলমান সমাজের জাতীয় উন্নতির উপায় (প্রবন্ধ), ২৬. আত্মজীবনী পরিশিষ্ট, ২৭. একটি ইংরেজি প্রবন্ধ, ২৮. উর্দু বাংলা প্রবন্ধ উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।
তাঁর সাহিত্য সময়োপযোগী ও ইসলামের মহিমা উদ্‌ঘাটনে তৎপর। তাঁর রচিত গ্রন্থাবলীতে ইসলাম ও মুসলমানদের জ্ঞান-গরীমা, কর্ম ও কীর্তির পরিচয় তুলে ধরারই চেষ্টা প্রত্যক্ষ করা যায়।
অসুস্থতা ও ইন্তিকাল
মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় পক্ষাঘাত রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। ১৯৫০ সালের ২৪ অক্টোবর ৭৫ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। শেষ ইচ্ছানুয়ায়ী তাঁর প্রতিষ্ঠিত ইয়াতিমখানা সংলগ্ন কদমমোবারক মসজিদের সামনের প্রাচীন কবরস্থানে তিনি সমাহিত হন। মৃত্যুর পূর্বে রচনা করেন নিম্নলিখিত কবিতাটি-
“পথিক, ক্ষণিকের তরে বস মোর শিরে,
ফাতেহা পড়িয়া যাও, নিজ নিজ ঘরে।
যে সব আসিবে মোর সমাধির পাশে,
ফাতেহা পড়ে যাবে। মম মুক্তির আশে।
অধম মনিরুজ্জামান নাম আমার;
ইসলামাবাদী বলে সর্বত্র প্রচার।”
পরিশেষে বলা যায়, মাওলানা ইসলামাবাদীর সমগ্র জীবন ছিল সংগ্রামী ও কর্মময়। শিক্ষকতা-সাংবাদিকতা, ধর্মপ্রচার ও রাজনীতিতে, সমাজসেবা ও শিক্ষা আন্দোলনে, নারী-শিক্ষায়, সাহিত্যকর্ম এবং একটি শিক্ষিত জ্ঞাননির্ভর ও উদারপন্থী জাতি প্রতিষ্ঠায় তাঁর সারাজীবনের ত্যাগ-তিতিক্ষা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বাঙালি চিরকাল স্মরণ করবে। জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সংস্কারমুক্ত ও উদারপন্থী। বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তনের তিনি ছিলেন প্রধান উদ্যোক্তা। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি সমাজসংস্কার ও শিক্ষা বিস্তারে ব্রতী হন। যা তৎকালীন প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় সম্ভব ছিল না। প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি প্রাচীন ও আধুনিক জাতির ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজনীতি, দর্শন, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, ভুগোল, ধর্মতত্ত্ব একই সাথে কৃষি-ব্যবসায় নীতি প্রভৃতি বিষয় প্রবর্তনের কথা তিনি ভেবেছিলেন। তিনি নারী শিক্ষাকে গুরুত্বের সাথে দেখেছিলেন। তাই বলা যায় বাংলা ভাষার ইতিহাসে ও জাতীয় জাগরণে মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর অবদান অপরিসীম। তাঁর জীবনকে সমাজ সেবা ও দেশ সেবায় উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি ছিলেন মুসলিম জাগরণের অগ্রদূত ও মুসলিম বাংলা সাংবাদিকতার অন্যতম পথ প্রর্দশক।

লেখক : প্রফেসর ও সভাপতি, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী।

x