মহেশখালের স্লুইচ গেট চালু হচ্ছে আগামী মাসে

মোবাইল অ্যাপসেও অপারেট হবে গেট ।। জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পাবে আগ্রাবাদ ।। হালিশহরসহ সন্নিহিত এলাকা

আজাদী প্রতিবেদন | বৃহস্পতিবার , ২৩ জুন, ২০২২ at ৬:৩৬ পূর্বাহ্ণ

ঘরে বসে খোলা যাবে মহেশখালের স্লুুইচ গেট। তুমুল বৃষ্টির মাঝে খালের পানি বৃদ্ধি পেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যাবে গেট। বিদ্যুৎ চলে গেলে অটোমেটিক চালু হয়ে যাবে জেনারেটর। অপারেটর বৃষ্টিতে আটকা পড়লেও সমস্যা নেই, মোবাইল অ্যাপস থেকে চালু করা যাবে তিনটি পাম্প, যেগুলো প্রতি সেকেন্ডে সাড়ে পাঁচ হাজার লিটার পানি পাম্প করে গেটের অপর পাশে নদীতে ফেলবে। ১৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে পৃথিবীর অন্যতম সর্বাধুনিক এই স্লুইচ গেট আগামী মাসেই চালু হচ্ছে নগরীর মহেশখালে। নেদারল্যান্ডস থেকে আনা ১২টি গেট ইতোমধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় স্থাপিত স্লুইচ গেটটি চালু হওয়ার ফলে শহরের আগ্রাবাদ হালিশহরসহ সন্নিহিত এলাকা আগামী মাস থেকে ভয়াবহ রকমের জলাবদ্ধতা থেকে নিস্তার পাবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, নগরীর আগ্রাবাদ এবং হালিশহরসহ সন্নিহিত এলাকার লাখ লাখ মানুষের দুঃখ হিসেবে খ্যাত মহেশখাল। নগরীর বিস্তৃত এলাকার পানি এই খালের মাধ্যমে কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে পড়ে। জোয়ার ভাটা নির্ভর নগরীর বৃহত্তম এই খালটি নিয়ে মানুষের দুঃখের অন্ত নেই। খালটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন প্রায় মুখ থুবড়ে পড়েছিল। বিভিন্ন সময় খালটি খনন করেও পুরো সুফল মিলছিল না। অপরদিকে জোয়ারের সময় এই খাল দিয়ে আসা পানি নগরীর আগ্রাবাদ, বড়ুপুল, ছোটপুল, হালিশহরসহ পুরো এলাকা সয়লাব করে দেয়। খাঁ খাঁ করা রোদের মাঝেও কর্ণফুলীর জোয়ারের পানিতে নগরীর বিস্তৃত এলাকা প্লাবিত হয়। লাখো মানুষের ভোগান্তির কারণ হয়ে উঠা এই খাল দিয়ে জোয়ারের পানি ঠেকাতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি বাঁধও নির্মাণ করেছিল। প্রায় দুই কোটি টাকা খরচ করে বাঁধটি নির্মাণ করা হলে শুরুতে কিছুটা সুফল মিললেও পরবর্তীতে তা মরণ ফাঁদে পরিণত হয়। আগ্রাবাদ সরকারি কলোনিতে ঘরের সিঁড়ির নিচে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় নড়ে চড়ে বসে প্রশাসন। পরবর্তীতে এক কোটি টাকারও বেশি খরচ করে ওই বাঁধটি আবারো কেটে ফেলা হয়। কিন্তু অবসান ঘটেনি মানুষের দুর্ভোগের। মহেশখালের জোয়ারের পানিতে আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালসহ পুরো এলাকার নিয়তি হয়ে উঠেছিল ডোবাডুবি।

ভয়াল এই দুর্গতি থেকে নগরীর বিশ লাখেরও বেশি মানুষকে রক্ষা করতে মহেশখালের উপর একটি স্লুইচ গেট নির্মাণের দাবি জানানো হচ্ছিল বহুদিন থেকে। মহেশখাল এবং এর প্রভাবে ডুবে যাওয়া এলাকার উপর সমীক্ষা করে বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত হন যে, জোয়ারের পানি এই এলাকার জন্য বড় কাল হয়ে উঠেছে। জোয়ারের পানি ঠেকানো এবং বৃষ্টির সময় পানি নিষ্কাশন ঠিকঠাকভাবে করা গেলে এই এলাকার দুর্ভোগ বহুলাংশে কমে যাবে। বৃষ্টি এবং জোয়ারের পানি মিলে যে ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে তা হবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতামতের প্রেক্ষিতে মহেশখালের উপর একটি স্লুইচ গেট নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনের সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের অংশ হিসেবে ১৩৫ কোটি টাকা খরচ করে স্লুইচ গেট নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করা হয়। এই স্লুইচ গেটটি চট্টগ্রামের একটি অন্যতম বৃহত্তম স্লুইচ গেট। এই স্লুইচ গেটের ভিতর দিয়ে নৌকা চলাচলের পথ রাখতে হবে। প্রকল্পের শুরুতে সাধারণ স্টিল দিয়ে গেট তৈরির কথা থাকলেও পরবর্তীতে মরিচা প্রতিরোধক কম্পোজিট আয়রণ দিয়ে গেট তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যে গেট একশ’ বছরেও মরিচা ধরবে না, নষ্ট হবে না। নেদারল্যান্ডস থেকে এই গেট তৈরি করে আনা হয়। সম্প্রতি গেটগুলো স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। আরসিসি স্ট্রাকচারে বিদেশ থেকে আনা গেটগুলো স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ২৪টি গেট থাকবে আপ এন্ড ডাউন। ৪টি গেট থাকবে নৌকা পারাপারের জন্য। মোট ১২টি ব্যান্ডে এসব গেট স্থাপন করা হয়েছে। গেটের ভিতরে বসানো হয়েছে তিনটি পাম্প। প্রতিটি পাম্প প্রতি সেকেন্ডে সাড়ে পাঁচ হাজার লিটার পানি পাম্পআউট করে নদীতে ফেলবে। সবগুলো গেট এবং পাম্প চালানোর মতো অতি শক্তিশালী একটি জেনারেটরও ইতোমধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। ম্যানুয়েলি পরিচালনার পাশাপাশি অটোমেটিকেলি পরিচালনার প্রযুক্তিও এই স্লুইচ গেটে স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে স্লুইচ গেটের অপারেটর
যে কোনো স্থান থেকে মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে এই গেট অপারেট করে পানি পাম্প আউট কিংবা গেট খোলা বাঁধা করতে পারবেন। আগামী মাসেই বিশ্বের সর্বাধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত এই স্লুইচ গেট চালু করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক লেঃ কর্নেল শাহ আলী দৈনিক আজাদীকে বলেন, আগামী মাসেই আমরা স্লুইচ গেট চালু করবো। এটি চালু হলে নগরীর বিস্তৃত এলাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার অবসান ঘটবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, এটি পৃথিবীর সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সম্বলিত স্লুইচ গেট। অপারেটর ঘরে বসেও এই স্লুইচ গেট খোলা বাঁধা থেকে শুরু করে সব কাজই করতে পারবেন। খালের পানি একটি লেভেল পর্যন্ত গেলেই মনিটরে সিগন্যাল পাওয়া যাবে। তখন অপারেটর তার ডিভাইজে গেট খোলার সংকেত দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে গেট খুলে যাবে, আবার একইভাবে বন্ধও করে দেয়া যাবে। একইভাবে ডিভাইজ থেকে সিগন্যালের মাধ্যমে চালু করা যাবে পাম্প, শুরু হবে সেকেন্ডে সাড়ে পাঁচ হাজার লিটার পানি নিষ্কাশন। বিদ্যুৎ চালিত এই গেটে কোনো কারণে বিদ্যুৎ চলে গেলে সাথে সাথেই জেনারেটর স্টার্ট হয়ে যাবে। তুমুল বর্ষণ কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগেও গেট সচল রাখা সম্ভব হবে বলেও লেঃ কর্ণেল শাহ আলী দৈনিক আজাদীকে জানান।